

রাজধানীর সড়কে এখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা, যাকে অনেকে রসিকতা করে ডাকেন ‘টেসলা’! সহজলভ্য ও সস্তা হওয়ায় এটি এখন নগরবাসীর নিত্যসঙ্গী, কিন্তু তার দাপটে অতিষ্ঠ পথচারী থেকে যাত্রী—সবাই! বৃষ্টি নামলেই ভাড়া বেড়ে যায় দ্বিগুণ-তিনগুণ, আর প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা। নিয়ন্ত্রণে সরকারি উদ্যোগ থাকলেও বাস্তবায়ন এখনো থমকে আছে।
“টেসলা” রাজত্ব করছে সড়কে
ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই তীব্র চাপে। প্রতিদিন প্রায় ৮০ থেকে ৯০ লাখ মানুষ রাজধানীতে চলাচল করে, অথচ রাস্তার পরিমাণ মোট আয়তনের মাত্র ৭-৮ শতাংশ। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির হিসাবে সারা দেশে এখন প্রায় ৬০ লাখ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলছে, যার প্রায় ৯০ শতাংশ দেশেই তৈরি; শুধু ঢাকাতেই সংখ্যাটা ১৫ থেকে ২০ লাখের মতো, যা প্রতিদিন ব্যবহার করেন ১ কোটি ১০ লাখের বেশি মানুষ। যত্রতত্র পার্কিং, নির্ধারিত স্ট্যান্ড ছাড়াই যাত্রী ওঠানামা আর ঘণ্টায় ৩০-৪০ কিলোমিটার বেপরোয়া গতিতে বড় গাড়ির সঙ্গে পাল্লা দেওয়াই এই বাহনের সবচেয়ে বড় বিপদ বলে লিখেছেন সিআইডির অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার ড. মো. রুহুল আমিন সরকার।
বৃষ্টি এলেই ভাড়ার ‘প্রতিযোগিতা’
গত ১২ জুলাই ভারী বর্ষণে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা জলমগ্ন হলে ভাড়া বেড়ে যায় দ্বিগুণ-তিনগুণ। মতিঝিলগামী এক ব্যাংক কর্মকর্তা সুমাইয়া জানান, অফিসে দেরি হওয়ার ভয়ে বাধ্য হয়েই বাড়তি ভাড়া দিয়ে রিকশায় উঠতে হয়েছিল তাকে। আরেক কর্মকর্তা নাহিদের ভাষ্য, নিয়মিত ৬০ টাকার পথে সেদিন ১০০ টাকা চাওয়া হয়েছিল। তবে চালকদেরও যুক্তি আছে—রিকশাচালক হাসান বলেন, জলাবদ্ধ পথে ট্রিপ কমে যায় ও কষ্ট বেশি হয় বলেই কিছুটা বাড়তি ভাড়া নিতে হয়। আরেক চালক মনিরুলের ভাষ্য, হাঁটু পানিতে রিকশা টানা কঠিন বলেই মাঝেমধ্যে ভাড়া বাড়াতে হয়।
টেসলা দুর্ঘটনার মিছিল যেন থামছেই না
১৪ জুলাই তেজগাঁওয়ের বেগুনবাড়িতে বাবার হাত ছুটে রাস্তা পার হতে গিয়ে ব্যাটারি রিকশার ধাক্কায় প্রাণ হারায় তিন বছরের শিশু নওরীন। এর চার দিন পর দক্ষিণখানে মোটরসাইকেল আরোহী কিশোর শিশির (১৭) নিহত হয় পেছন থেকে আসা অটোরিকশার ধাক্কায়। ২১ জুলাই ময়মনসিংহে ট্রাক ও অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ যায় দুই নারীসহ তিনজনের। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, শুধু মার্চ মাসেই সারা দেশে ৫৭৬টি দুর্ঘটনায় নিহত হন ৫৩২ জন, যার মধ্যে থ্রি-হুইলার শ্রেণির যানবাহন—অটোরিকশা, ইজিবাইক, সিএনজি—জড়িত ছিল প্রায় ২০ শতাংশ দুর্ঘটনায়।
নিয়ন্ত্রণ উদ্যোগ, তবে গতি থমকে
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আবদুস সালাম জানিয়েছেন, রিকশা-অটোরিকশা বন্ধ নয়, বরং নিবন্ধন, নম্বরপ্লেট ও লাইসেন্সের আওতায় এনে শৃঙ্খলা ফেরানোই লক্ষ্য। ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও প্রধান সড়ক থেকে অটোরিকশা সরানো নিয়ে একাধিকবার আলোচনা করেছে, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। বুয়েটের পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. শামছুল হক বলছেন, পর্যাপ্ত গণপরিবহনের অভাবেই অবৈধ অটোরিকশা এত বেড়েছে, তাই শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়, বিকল্প ব্যবস্থাও জরুরি।
সমাধান কোন পথে
বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার জন্য জাতীয় নীতিমালা প্রণয়ন, বাধ্যতামূলক নিবন্ধন ও কেন্দ্রীয় ডেটাবেজ তৈরি, নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড ছাড়া পার্কিং নিষিদ্ধ করা, চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা, বৈধ চার্জিং স্টেশন স্থাপন এবং প্রধান ও ভিআইপি সড়কে কড়া নিয়ন্ত্রণ আরোপ—এই পদক্ষেপগুলো একসঙ্গে নেওয়া গেলেই রাজধানীর সড়ক তুলনামূলক নিরাপদ হতে পারে। ততদিন পর্যন্ত রাজধানীর “টেসলা”-নির্ভরতা আর তার সঙ্গে জড়ানো ঝুঁকি—দুটোই থেকে যাচ্ছে নগরবাসীর নিত্যসঙ্গী হয়ে।
তথ্যসূত্র
দৈনিক ঢাকা মেইল (২০২৬)। জলাবদ্ধ ঢাকায় রিকশা-অটোরিকশার পোয়াবারো।
সারাবাংলা (২০২৬)। রাজধানীতে ব্যাটারিচালিত রিকশার ধাক্কায় শিশু নিহত।
সারাবাংলা (২০২৬)। রাজধানীতে অটোরিকশার ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী নিহত।
ঢাকা টাইমস (২০২৬)। ময়মনসিংহে ট্রাক-অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে নারীসহ নিহত ৩।
বাংলা ট্রিবিউন (২০২৬)। ঢাকার সড়ক কার নিয়ন্ত্রণে—ট্রাফিক পুলিশ নাকি অটোরিকশার।
দৈনিক ভোরের ডাক (২০২৬)। আবদুর রহমান মল্লিক। সারা দেশে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে অনুমোদনহীন অটোরিকশা।
যুগান্তর (২০২৬)। ড. মো. রুহুল আমিন সরকার। ঢাকার ট্রাফিকে ব্যাটারি অটোরিকশা: সমস্যা, পরিসংখ্যান ও সমাধান।
মন্তব্য করুন