

কাগজে-কলমে ফরাসি দলটি হয়তো তারকাখচিত। উসমান দেম্বেলে, মাইকেল ওলিসে কিংবা কিলিয়ান এমবাপ্পের মতো বিশ্বসেরা তারকাদের পাশে স্পেনের অ্যালেক্স বায়েনা, দানি ওলমো কিংবা মিকেল ওইয়ারসাবালদের কিছুটা ফিকেই মনে হতে পারে। তবে ডালাসে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের রোমাঞ্চকর সেমিফাইনালে ব্যক্তিগত প্রতিভাকে আড়াল করে দিল স্পেনের নিখুঁত দলীয় ফুটবল দর্শন। দুর্দান্ত দলীয় বোঝাপড়া, অবিশ্বাস্য সমন্বয় আর গতির ছন্দে পরাক্রমশালী ফ্রান্সকে মাঠে দাঁড়াতেই দেয়নি ২০১০ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। ফরাসিদের ২-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপের ফাইনাল নিশ্চিত করেছে লুইস দে লা ফুয়েন্তের শিষ্যরা।
ম্যাচজুড়ে স্পেনের আধিপত্য এতটাই স্পষ্ট ছিল যে, প্রতিটি পজিশনেই তারা ফ্রান্সের চেয়ে এক ধাপ এগিয়ে ছিল। একজনের দুর্বলতা অন্যজন ঢেকে দিয়ে যেভাবে পুরো দল এক সুতোয় বেঁধেছিল, তা ছিল দেখার মতো। বিপরীতে, ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের ওপর ভরসা করা ফ্রান্সকে দলগতভাবে অনেকটাই ছন্নছাড়া লেগেছে।
স্পেনের ‘অ্যানাকোন্ডা গ্রিপ’ এবং ফরাসিদের অসহায়ত্ব
স্পেনের ডিফেন্স ও মিডফিল্ডের কৌশলকে বিশ্বখ্যাত বার্তা সংস্থা রয়টার্স তুলনা করেছে ‘অ্যানাকোন্ডা গ্রিপ’ বা অ্যানাকোন্ডা সাপের আষ্ঠেপৃষ্ঠে কুণ্ডলী পাকিয়ে ধরার সঙ্গে। সাপের সেই বাঁধনে শিকার যেভাবে শ্বাস রোধ হয়ে মারা যায়, ঠিক তেমনি স্প্যানিশ মিডফিল্ডের সাঁড়াশি চাপে পিষ্ট হয়েছে ফ্রান্সের আক্রমণভাগ।
রদ্রি, পাউ কুবারসি এবং মার্ক কুকুরেয়ারা মাঝমাঠে ফরাসিদের পাস দেওয়ার সব পথ বন্ধ করে দেন। ফলে বলের নাগাল না পেয়ে হাঁসফাঁস করতে দেখা গেছে কিলিয়ান এমবাপ্পে ও উসমান দেম্বেলেদের। হারের পর হতাশা প্রকাশ করে এমবাপ্পে বলেন,
“কৌশলগত বা সামগ্রিক কোনো দিক থেকেই আমরা নিজেদের পরিকল্পনা কাজে লাগাতে পারিনি। মাঝমাঠে আমরা বারবার ওদের দুজনের বিপরীতে তিনজন হয়ে পড়ছিলাম। স্পেনের মতো দলের বিপক্ষে এটি বড় ধরনের বিপর্যয়।”
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ফসল
স্প্যানিশ ফুটবল বিশ্লেষক গিলেম বালাগ জানিয়েছেন, এই বিজয় কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। প্রায় ১০ বছর আগে কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তের অধীনে অনূর্ধ্ব-১৯ ও অনূর্ধ্ব-২১ দলের হয়ে যে অভিযাত্রা শুরু হয়েছিল, আজকের স্পেন দল তারই পরিণত রূপ। কোচ দে লা ফুয়েন্তে নিজেই ম্যাচ শেষে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে বলেন,
"প্রায় চার বছর আগে আমরা একটি নির্দিষ্ট দর্শন নিয়ে পথচলা শুরু করেছিলাম। আজ সেই দর্শনে অবিচল থাকার সুফল পাচ্ছি। আমার এই খেলোয়াড়েরা বিশ্বের সেরা দলের মুখোমুখি হয়ে প্রমাণ করেছে যে আমরা অজেয়।"
পেদ্রো পোরোর স্বপ্নপূরণ
স্পেনের এই অবিস্মরণীয় জয়ের অন্যতম নায়ক ডিফেন্ডার পেদ্রো পোরো। ম্যাচজুড়ে দুর্দান্তভাবে রক্ষণ সামলানোর পাশাপাশি দ্বিতীয়ার্ধে দলের হয়ে গুরুত্বপূর্ণ জয়সূচক গোলটি করেন ২৬ বছর বয়সী এই টটেনহাম তারকা। চলতি বিশ্বকাপের আগে জাতীয় দলের হয়ে কোনো গোল না থাকলেও, এই আসরেই এটি তাঁর দ্বিতীয় গোল।
ম্যাচসেরা পোরো তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, “সত্যি বলতে, এটাই ছিল আমার সবচেয়ে বড় স্বপ্ন। আমরা জানতাম ম্যাচটি কঠিন হবে, তবে আমাদের পরিকল্পনা নিখুঁত ছিল। এই জয় আমাদের ২৬ জন খেলোয়াড়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল।”
ফাইনালে স্পেনের প্রতিপক্ষ কে?
সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে বিদায় করে দিয়ে ফাইনালের মঞ্চে পা রাখা স্পেনের সামনে এখন বিশ্বজয়ের শেষ বাধা। আগামী রোববার রাতে নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিতব্য ফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ হতে যাচ্ছে আর্জেন্টিনা অথবা ইংল্যান্ডের মধ্যকার বিজয়ী দল। এখন দেখার বিষয়, স্পেনের এই দৃষ্টিনন্দন ‘দলীয় ফুটবলের মহাকাব্য’ ট্রফি জয়ের মাধ্যমে পূর্ণতা পায় কি না।
মন্তব্য করুন