

নিজের পছন্দের মানুষকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেওয়াই কাল হলো ষোলো বছরের কিশোরী আরফানা হোসেনের। অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের এমন সিদ্ধান্ত মেনে নিতে পারেনি পরিবার। জোর করে ঘরে ফিরিয়ে আনার পরও যখন সে স্বামীর কাছে ফিরে যাওয়ার আকুতি জানায়, তখনই নেমে আসে নৃশংস নির্যাতন। মা-বাবার যৌথ আক্রোশের শিকার হয়ে নির্মমভাবে প্রাণ হারাতে হয়েছে দশম শ্রেণির এই শিক্ষার্থীকে। হত্যার পর প্রমাণ লোপাটের জন্য মেয়ের মরদেহ প্লাস্টিকের বস্তায় পুরে মোটরসাইকেলে করে রাস্তায় ফেলে আসেন বাবা।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ (কেএমপি) সদর দপ্তরে আজ শনিবার সকালে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের রোমহর্ষক বিবরণ দেয় পুলিশ। এ ঘটনায় নিহতের মা আরিফা ইয়াসমিনকে ইতিমধ্যেই গ্রেফতার করা হয়েছে। আদালতে তিনি নিজের অপরাধ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিও দিয়েছেন। তবে ঘটনার পর থেকে পলাতক রয়েছেন ঘাতক বাবা আলিম হোসেন।
দাম্পত্যের টান বনাম পরিবারের বাধা
পুলিশের তদন্ত ও সংবাদ সম্মেলনের তথ্যানুযায়ী, আরফানা স্থানীয় একটি স্কুলের দশম শ্রেণিতে পড়ত। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান হওয়া সত্ত্বেও সম্প্রতি নিজের পছন্দে এক তরুণকে বিয়ে করে সে। বিয়ের পর কিছুদিন স্বামীর ঘরে অবস্থান করলেও বয়স কম হওয়ার অজুহাতে পরিবার তাকে জোরপূর্বক নিজেদের বাড়িতে ফিরিয়ে আনে।
তবে বাবার বাড়িতে আসার পরও আরফানার মন পড়েছিল স্বামীর সংসারে। সে বারবার স্বামীর কাছে ফিরে যাওয়ার জন্য পীড়াপীড়ি করতে থাকে। এ নিয়ে পরিবারের সঙ্গে তার তীব্র মনস্তাত্ত্বিক ও বাদানুবাদ তৈরি হয়। ঘটনার দিন স্বামীর কাছে যাওয়ার জেদ ধরলে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন মা আরিফা ইয়াসমিন। তিনি মেয়েকে উপর্যুপরি মারধর শুরু করেন। মা-মেয়ের এই ঝগড়ার একপর্যায়ে বাবা আলিম হোসেন ঘরে থাকা একটি শক্ত কাঠের ফালি দিয়ে আরফানার মাথায় সজোরে আঘাত করেন। মাথার গুরুতর জখম ও অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় কিশোরীর।
যেভাবে লাশ গুমের চেষ্টা
একমাত্র সন্তানকে নিজ হাতে হত্যার পর আইনি জটিলতা থেকে বাঁচতে লাশ গুমের পরিকল্পনা করেন এই দম্পতি। ঘরে থাকা কবুতরের খাবার আনা-নেওয়ার একটি বড় প্লাস্টিকের বস্তার ভেতর আরফানার নিথর দেহটি ঢুকিয়ে মুখ আটকে দেওয়া হয়। এরপর রাতের আঁধারে সেই বস্তাবন্দী লাশ মোটরবাইকের পেছনে তুলে নেন বাবা আলিম হোসেন।
গত বুধবার রাত আনুমানিক ৯টার দিকে খুলনা সদর থানার অন্তর্গত প্রান্তিকা আবাসিক এলাকার ৩ নম্বর সড়কের নির্জন স্থানে বস্তাটি ফেলে রেখে দ্রুত মোটরবাইক চালিয়ে চম্পট দেন তিনি। পরে স্থানীয় বাসিন্দারা সড়কের পাশে একটি সন্দেহভাজন বস্তা পড়ে থাকতে দেখে পুলিশে খবর দেয়। পুলিশ গিয়ে বস্তাটি খুলে কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।
পুলিশের তদন্ত ও মায়ের স্বীকারোক্তি
মরদেহ উদ্ধারের প্রাথমিক পর্যায়ে পুলিশ কিশোরীর পরিচয় নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে গত ১০ জুলাই খুলনা সদর থানা পুলিশ বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের অভিযুক্ত করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করে। পরে পুলিশের পক্ষ থেকে বিভিন্ন মাধ্যমে খোঁজাখুঁজি করা হলে আরফানার মা নিজেই মর্গে গিয়ে মেয়ের লাশ শনাক্ত করেন।
ঘটনার মোড় ঘোরে যখন তদন্তকারী কর্মকর্তারা আরফানার বাড়িতে গিয়ে তাঁর মাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন। প্রথম দিকে আরিফা ইয়াসমিন পুলিশকে বিভ্রান্ত করতে নানা রকম অসত্য ও সাজানো তথ্য দিতে থাকেন। তবে পুলিশের অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের জেরা এবং ঘরের পারিপার্শ্বিক আলামতের মুখে একপর্যায়ে তিনি ভেঙে পড়েন এবং নিজের মেয়েকে স্বামীসহ মিলে খুন করার কথা স্বীকার করেন। এরপরই পুলিশ তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেফতার দেখায়।
সংবাদ সম্মেলনে কেএমপির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা জানান, ঘাতক বাবাকে আইনের আওতায় আনতে পুলিশের একাধিক টিম অভিযান চালাচ্ছে। এই প্রেস ব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন কেএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এম এম শাকিলুজ্জামান, উপপুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) রেজাউর রহমান, সহকারী পুলিশ কমিশনার (খুলনা জোন) শফিকুল ইসলাম এবং খুলনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শফিকুল ইসলামসহ প্রশাসনের অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
মন্তব্য করুন