ঢাকা মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩
মুক্ত ভাবনামুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

ভাঙছে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য, অন্ধকারে প্রশাসন ও সওজ!

“কারা ভাঙছে আমরা জানি না”— ঝিনাইদহ শহরের প্রবেশদ্বারে বীরশ্রেষ্ঠের নামাঙ্কিত স্থাপনা অপসারণে চরম সমন্বয়হীনতা ও রহস্য
প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১৭ জুলাই ২০২৬, ০৫:৩৯ পিএম
ভাঙছে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ভাস্কর্য, অন্ধকারে প্রশাসন ও সওজ!

ঝিনাইদহ জেলা শহরের প্রবেশদ্বারে নির্মিত দেশের সূর্যসন্তান বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহী হামিদুর রহমানের স্মৃতিবিজড়িত চত্বর ও ভাস্কর্যটি গত কয়েক দিন ধরে ভেঙে ফেলা হচ্ছে। তবে অত্যন্ত আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, রাষ্ট্রীয় এই স্থাপনাটি ঠিক কে বা কোন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ভাঙা হচ্ছে, সে বিষয়ে স্থানীয় প্রশাসন বা সংশ্লিষ্ট কোনো সংস্থাই স্পষ্ট কিছু বলতে পারছে না। শহরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি তোরণ এভাবে ভেঙে ফেলায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মনে চরম ক্ষোভ ও বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বেশ কয়েকজন শ্রমিক হাতুড়ি ও অন্যান্য সরঞ্জাম দিয়ে চত্বরটি ভাঙার কাজ চালাচ্ছেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে শ্রমিকরা বিস্তারিত কিছু না জানিয়ে ঝিনাইদহ পৌরসভার সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।

‘আমরা জানি না’— দায় এড়াচ্ছে সব পক্ষ

ভাস্কর্য ভাঙার পেছনে কোন মহলের হাত রয়েছে, তা নিয়ে ঝিনাইদহের দায়িত্বশীল বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের মধ্যে চরম কাদা-ছোড়াছুড়ি ও দায় এড়ানোর প্রবণতা লক্ষ করা গেছে:

পৌরসভা: ঝিনাইদহ পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাশেদ আলী খান সরাসরি দায় এড়িয়ে বলেন, “পৌরসভা এটি কেন ভাঙছে তা আমার জানা নেই। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে জেলা প্রশাসকের সাথে কথা বলুন।”

জেলা প্রশাসন: জেলা প্রশাসক মো. নোমান হোসেন জানান, জেলা প্রশাসন এই ভাঙার কাজের সাথে যুক্ত নয়। তবে তিনি যোগ করেন, “আমি দায়িত্ব নেওয়ার আগেই ভাস্কর্যটি সেখান থেকে সরানোর সিদ্ধান্ত হয়েছিল। সম্ভবত সড়ক বিভাগ ও পৌরসভা সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করছে। তবে আমরা জেলা পুলিশ লাইন্সের সামনে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের একটি নতুন প্রতিকৃতি স্থাপনের পরিকল্পনা করছি।”

সড়ক ও জনপথ বিভাগ: সড়ক বিভাগের ওপর দায় চাপানো হলেও ঝিনাইদহ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হাফিজুর রহমান স্পষ্ট জানিয়ে দেন, “কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল এলাকার ওই ভাস্কর্য ও চত্বরটি কারা অপসারণ করছে, সে ব্যাপারে আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই।”

জেলা পরিষদ: জেলা পরিষদের প্রশাসক এম মাজিদ জানান, স্থাপনাটি আসলে কী বোঝাতে চেয়েছিল, তা স্পষ্ট ছিল না। তাছাড়া ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর শিক্ষার্থীরা দুই দফায় এটি ভাঙচুর করে। মোড়ে স্থাপনাটি থাকার কারণে দুর্ঘটনাও ঘটছিল। তিনি বলেন, “কয়েকটি সভায় এটি সরানোর সিদ্ধান্ত হলেও ভাঙার দায়িত্ব নিতে কেউ রাজি হয়নি। এখন এটি কারা ভাঙছে, আমি জানি না।”

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি: ঝিনাইদহ-২ আসনের সংসদ সদস্য আলী আজম মো. আবু বকর মুঠোফোনে জানান, সংসদ অধিবেশন চলায় তিনি ঢাকায় অবস্থান করছেন এবং এই ভাঙার বিষয়ে তিনি সম্পূর্ণ অন্ধকারে রয়েছেন।

নতুন স্থানে পূর্ণাঙ্গ ভাস্কর্যের আশ্বাস

স্থাপনাটি ভেঙে ফেলা হলেও স্থান পরিবর্তনের একটি ইঙ্গিত দিয়েছেন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ। জেলা বিএনপির সভাপতি এম এ মজিদ বলেন, “শহরের চুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ডের নিকটবর্তী গোলচত্বরে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের একটি পূর্ণাঙ্গ ভাস্কর্য নতুন করে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।”

পরিকল্পনাহীন উদ্যোগ ও চরম অবহেলা

জানা গেছে, ২০১৯ সালে ঝিনাইদহ পৌরসভা শহরের প্রবেশদ্বারে ৩০ ফুট উচ্চতা ও ১০ ফুট প্রস্থের এই বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান চত্বরটি নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে দীর্ঘদিনের অবহেলা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে স্থাপনাটি কখনো পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি। উল্টো অযত্নে এটি আগাছায় ঢেকে গিয়ে শ্রীহীন হয়ে পড়েছিল।

স্থানীয় বাসিন্দা আজিজুল হক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “যেকোনো জেলার প্রবেশপথে সেই অঞ্চলের ঐতিহ্য ও কীর্তিমান মানুষদের স্মৃতিস্তম্ভ থাকে। এই চত্বরটি ছিল আমাদের জেলার গর্ব বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের নামে। এখন কোনো ঘোষণা ছাড়া এটি ভেঙে ফেলা হচ্ছে, অথচ কেউ দায় নিচ্ছে না— এটি অত্যন্ত দুঃখজনক।”

বীর মুক্তিযোদ্ধা সিদ্দিকুর রহমান বলেন, “হামিদুর রহমান শুধু ঝিনাইদহের নন, গোটা বাংলাদেশের অহংকার। মাতৃভূমির জন্য নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়ে তিনি অনন্য ইতিহাস গড়েছেন। জেলা শহরের প্রবেশমুখে তার স্মৃতি থাকাটা জরুরি, যাতে নতুন প্রজন্ম ও বাইরে থেকে আসা দর্শনার্থীরা দেশের এই শ্রেষ্ঠ সন্তানের অবদান সম্পর্কে জানতে পারে।”

এক নজরে বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান

জন্ম: ১৯৫৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি, ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার খর্দ্দ খালিশপুর গ্রামে।

মুক্তিযুদ্ধে অবদান: ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি ১ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সিপাহী হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

শাহাদাত বরণ: ১৯৭১ সালের ২৮ অক্টোবর মৌলভীবাজারের ধলাই সীমান্তঘাঁটি দখলের চূড়ান্ত লড়াইয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গোলার আঘাতে তিনি শহীদ হন।

খেতাব: মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্ব ও আত্মত্যাগের সর্বোচ্চ স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মাননা ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ খেতাবে ভূষিত করা হয়। তিনি দেশের সাতজন বীরশ্রেষ্ঠের অন্যতম।

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

‘অসৎ মানুষের হাতে এআই গেলে ১০০ কোটি মানুষের মৃত্যু হতে পারে’

১

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র / বাংলাদেশে জ্বালানি নিয়ে আসা বিমানকে আকাশসীমায় ঢুকতে দেয়নি পাকিস্তান

২

শহীদ তাজুলের স্মৃতিতে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তরুণ প্রজন্ম

৩

ফুলেল শ্রদ্ধায় শহীদ মিনারে আখতার হুসেনকে শেষবিদায়

৪

রাশিয়ার পার্লামেন্ট নির্বাচনে এগিয়ে পুতিনের ইউনাইটেড রাশিয়া

৫

জামায়াত এমপি নজরুলের বাসায় উদ্ধারকৃত চিঠিতে মরিয়মের যা লেখা

৬

জামায়াত এমপি নজরুলের বিরুদ্ধে নির্যাতন ও প্ররোচনার মামলা

৭

সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড: কবিতা, গান ও ক্যানভাসে শরণার্থী জীবনের করুণ আখ্যান

৮

যুক্তরাষ্ট্রকে ৭ শর্ত দিল ইরান, না মানলে ‘চূড়ান্ত যুদ্ধ’

৯

নজিরবিহীন জালিয়াতি / বাংলাদেশ ব্যাংকে পদ ছাড়াই ৩৬৫ জনের নিয়োগ ও পদোন্নতি

১০

অপ্রতিম হত্যা: কিশোর গ্যাং, অপরাধ চক্র ও পুলিশের ভূমিকা

১১

আজ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’

১২

‘বারবার মামলা না দিয়ে গুলি করে মেরে ফেলেন’

১৩

আসিফের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ, অনুসন্ধানে দুদক

১৪

সিঙ্গাপুরেও মিলল বাড়ি ও ব্যাংক হিসাব / সাবেক ভূমিমন্ত্রী জাবেদের ১০ হাজার কোটি টাকার বিদেশি সম্পদ জব্দ

১৫

​​​​​​​শীতলক্ষ্যায় নিখোঁজ চারজনের মধ্যে ৩ জনের লাশ উদ্ধার

১৬

মোদী-পেজেশকিয়ান বৈঠক: মধ্যপ্রাচ্য সংকটে সংলাপ ও নিরাপদ সমুদ্রপথের তাগিদ

১৭

গুলশানে আ’লীগের মিছিল, গ্রেপ্তার ৩২

১৮

সমকাল কার্যালয়ে সাবেক ব্যুরো প্রধানের লাশ উদ্ধার

১৯

রংপুরে চার খুন: নেপথ্যে স্থানীয় বিএনপি নেতা, গৃহশিক্ষিকা ও পুলিশ কর্মকর্তা

২০