

যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বসেছিল বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসর ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের ফাইনাল। ৮০,০০০ হাজারেরও বেশি দর্শকের উন্মাদনায় ঠাসা গ্যালারির সামনে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে অতিরিক্ত সময়ের নাটকীয় লড়াইয়ে ১-০ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ ট্রফি নিজেদের করে নিল ইউরোপীয় পরাশক্তি স্পেন। ২০১০ সালের পর দীর্ঘ ১৬ বছরের আক্ষেপ ঘুচিয়ে বিশ্বমঞ্চে স্প্যানিশ জয়জয়কার পুনপ্রতিষ্ঠিত হলো।
বিপরীতে, নিজের শেষ বিশ্বকাপে আরও একবার ট্রফি উঁচিয়ে ধরার এবং টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বজয়ের যে স্বপ্ন লিওনেল মেসি দেখেছিলেন, তা শেষ হলো এক বুক বিষাদ আর শূন্য হাতে। ম্যাচজুড়ে আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগকে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় করে রাখা স্পেনের মাঝমাঠের জেনারেল রদ্রি টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে উঁচিয়ে ধরেছেন গোল্ডেন বল, আর ম্যাচ শেষে স্প্যানিশ অধিনায়ক হিসেবে তার হাতেই উঠেছে পরম আরাধ্য সোনালী ট্রফি।
ম্যাচ বিশ্লেষণ: শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত লা রোখাদের দাপট
খেলার শুরু থেকেই বল পজেশন ধরে রেখে ছোট ছোট পাসে আক্রমণ গড়ার চেনা ছন্দে মাঠে নামে লুইস দে লা ফুয়েন্তের শিষ্যরা। ম্যাচের পুরো বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:
প্রথমার্ধ (স্পেনের আক্রমণ বনাম আর্জেন্টিনার রক্ষণ): ম্যাচের মাত্র ৫ মিনিটেই প্রথম নিশ্চিত সুযোগ তৈরি করে স্পেন। দানি ওলমোর পাস থেকে ডি-বক্সের ডানপ্রান্তে বল পান ১৯ বছর বয়সী তরুণ উইঙ্গার লামিন ইয়ামাল। তার নেওয়া নিচু শটটি চমৎকার দক্ষতায় রুখে দেন আলবিসেলেস্তে গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্তিনেস। প্রথমার্ধের বাকিটা সময় স্পেনের বল নিয়ন্ত্রণের সামনে আর্জেন্টিনা কেবল রক্ষণভাগ সামলাতেই ব্যস্ত ছিল। বিরতির ঠিক আগে মিকেল ওয়ারজাবাল ও মার্ক কুকুরেয়ার দুটি জোরালো আক্রমণ অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।
দ্বিতীয়ার্ধ (শারীরিক ফুটবল ও লাল কার্ডের ধাক্কা): দ্বিতীয়ার্ধে খেলা কিছুটা আক্রমণাত্মক রূপ নেয়। আর্জেন্টিনা স্পেনের ছন্দ নষ্ট করতে শারীরিক শক্তির খেলা শুরু করে। নির্ধারিত ৯০ মিনিটে আর্জেন্টিনা স্পেনের গোলমুখে একটি শটও নিতে পারেনি, যা স্প্যানিশ ডিফেন্সের কার্যকারিতা প্রমাণ করে। নির্ধারিত সময়ের একদম শেষ মুহূর্তে (৯০+৩ মিনিট) স্পেনের তরুণ ডিফেন্ডার পাউ কুবার্সিকে ফাউল করে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড (লাল কার্ড) দেখে মাঠ ছাড়েন আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার এনসো ফের্নান্দেস।
১০ জনের দলে পরিণত হওয়া আর্জেন্টিনাকে নিয়ে অতিরিক্ত সময়ে নতুন কৌশলে ঝাঁপিয়ে পড়ে স্পেন।
অতিরিক্ত সময়: তোরেসের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ
অতিরিক্ত সময়ের শুরু থেকেই ১০ জনের আর্জেন্টিনার ওপর চেপে বসে স্প্যানিশ আক্রমণভাগ। মার্তিনেস একের পর এক দুর্দান্ত সেভ করে ম্যাচ টাইব্রেকারের দিকে নিয়ে যাচ্ছিলেন। নিকো উইলিয়ামসের একটি গোল অফসাইডের কারণে বাতিলও হয়।
অবশেষে ম্যাচের ১০৬তম মিনিটে আসে সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত। ডান প্রান্ত থেকে পেদ্রো পোরোর বাড়ানো লফটেড ক্রস ডি-বক্সের ভেতরে খুঁজে নেয় নিকো উইলিয়ামসকে। উইলিয়ামস দারুণ বুদ্ধিমত্তায় হেড করে বল নামিয়ে দেন বদলি হিসেবে নামা উইঙ্গার ফেরান তোরেসের পায়ে। ফার্স্ট-টাইম ফিনিশে বল জালে জড়াতে ভুল করেননি তোরেস। উল্লাসে ফেটে পড়ে পুরো মেটলাইফ স্টেডিয়াম। এর কিছুক্ষণ পর তোরেসের আরও একটি গোল অফসাইডের কারণে বাতিল হয়।
শেষ মুহূর্তের উত্তেজনা ও মেসির কান্না
১-০ গোলে পিছিয়ে পড়ে ১০ জনের দল নিয়েই অল-আউট আক্রমণে যায় আর্জেন্টিনা। ৩৯ বছর বয়সী লিওনেল মেসি নিজের শেষ সম্বলটুকু দিয়ে চেষ্টা করছিলেন সমতা ফেরাতে। একটি শর্ট কর্নার থেকে মেসির বাঁকানো ক্রস পোস্ট ঘেঁষে প্রায় ঢুকেই যাচ্ছিল, কিন্তু স্প্যানিশ রক্ষণ তা প্রতিহত করে। শেষ মিনিটে হুলিয়ান আলভারেসের ভাই জুলিয়ানো সিমিওনের একটি শট গোলবারের ওপর দিয়ে চলে গেলে আর্জেন্টিনার শেষ আশাটুকুও শেষ হয়ে যায়।
রেফারির শেষ বাঁশি বাজার সাথে সাথে মাঠে হাঁটু গেড়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন লিওনেল মেসি। অন্যদিকে স্প্যানিশ শিবির মেতে ওঠে বিশ্বজয়ের বাঁধভাঙা উল্লাসে।
রদ্রি: স্পেনের ট্রফি জয়ের আসল নায়ক
ফাইনালে ম্যানচেস্টার সিটির মিডফিল্ডার রদ্রি যেভাবে স্পেনের মাঝমাঠ পরিচালনা করেছেন, তা ফুটবল ইতিহাসে অন্যতম সেরা মিডফিল্ড পারফরম্যান্স হিসেবে গণ্য হবে। ৯৯তম মিনিটে যখন তিনি মাঠ ছাড়েন, ততক্ষণে তিনি ম্যাচের গতিপথ ঠিক করে দিয়েছেন।
| রদ্রি'র ফাইনাল ম্যাচ পরিসংখ্যান | সংখ্যা/শতকরা |
| মোট বল টাচ (Touches) | ১১৬ বার |
| সফল পাস (Accurate Passes) | ১০১ / ১০৬ (৯৫%) |
| ফাইনাল থার্ডে পাস | ১৬ টি (ম্যাচে সর্বোচ্চ) |
| গ্রাউন্ড ডুয়েল জয় | ৮ / ১০ টি |
| প্রতিপক্ষ লিওনেল মেসির টাচ সংখ্যা (৯৯ মিনিট পর্যন্ত) | মাত্র ২৯ বার |
মেসিকে পুরো ম্যাচে বোতলবন্দী করে রাখার মূল কৃতিত্ব ছিল রদ্রি’র। পুরো টুর্নামেন্টে রেকর্ড ৬৯৪টি পাস সম্পন্ন করে তিনি ন্যায়সংগতভাবেই টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার ‘গোল্ডেন বল’ জিতে নেন।
লুইস দে লা ফুয়েন্তে (স্পেন কোচ): “আমরা আজ যা অর্জন করেছি তা অবিশ্বাস্য। এই দলটি স্পেনের গর্ব। পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র ১টি গোল হজম করে চ্যাম্পিয়ন হওয়া আমাদের ডিফেন্স ও ট্যাকটিকসের শক্তির প্রমাণ দেয়।”
লিওনেল স্কালোনি (আর্জেন্টিনা কোচ): “হৃদয় ভাঙার মতো পরাজয়, তবে ছেলেরা তাদের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই করেছে। ১০ জন নিয়ে স্পেনের মতো দলের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত সময় খেলা সবসময়ই কঠিন। স্পেনের জয়টা প্রাপ্য ছিল।”
এই জয়ের মধ্য দিয়ে ফুটবলের এক সোনালী প্রজন্মের অবসান ঘটলো বিষাদে, আর নতুন এক স্প্যানিশ প্রজন্মের হাত ধরে শুরু হলো বিশ্ব ফুটবলে লা রোখাদের নতুন রাজত্ব।
মন্তব্য করুন