ঢাকা রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১০ ফাল্গুন ১৪৩৩
মুক্ত মনমুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

একুশের চেতনা: বাঙালির আত্মপরিচয়ের সংগ্রাম

একুশের চেতনা: বাঙালির আত্মপরিচয়ের সংগ্রাম

একুশে ফেব্রুয়ারিটা ঠিক বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারিতেই সৃষ্টি হয়নি এবং সেদিন এটার সমাপ্তিও ছিল না। ২১শে ফেব্রুয়ারি হচ্ছে ১৯৪৭ সনের ১৪ আগস্টের পরদিন থেকে ১৯৭১ সনের ২৬ মার্চ পর্যন্ত বাঙালির পথপরিক্রমার মধ্যে উজ্জ্বলতম দিনটি। এই সংগ্রামটা ছিল বাঙালির জন্য জাতি হিসাবে নিজেকে চিহ্নিত করার সংগ্রাম, নিজের আত্মপরিচয় খুঁজে পাওয়ার সংগ্রাম, আত্মপরিচয়ে গর্বিত হওয়ার সংগ্রাম এবং সবশেষে নিজের বাঙালি পরিচয়ে একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। এই সময়কালে বাঙালির কোনো রাজনৈতিক সামাজিক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড থেকেই আপনি একুশকে আলাদা করতে পারবেন না।

সূচনাটার আগে একটা বিভ্রান্তি হয়ে গিয়েছিল। একটা ভুল করেছিলাম আমরা, আমাদের মুরুব্বিরা ভুলটা করেছিলেন। ওরা ভেবেছিলেন যে ইংরেজরা চলে যাওয়ার পর ভারত বিভক্ত হলে মুসলমানদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র হলে ভালো হয়। ভেবেছিলেন, তাহলে মুসলমানের ছেলেমেয়েরা চাকরিবাকরি পাবে, ব্যবসাবাণিজ্য করবে, মন্ত্রী এমপি হবে। এমনিতে দেখলে ঠিক আছে- খুব ভুল কথা নয়। ভুলটা ছিল লুকিয়ে, কেবল ধর্মীয় পরিচয়ে মানুষ ভাই ভাই হয় না এই কথাটা তখন বড়দের মাথায় আসেনি। তখন আমাদের নেতারা ভেবেছে উত্তর প্রদেশের লিয়াকত আলী খান আমার ভাই আর কুমিল্লার ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত আমার কেউ না। এই চিন্তাটা ভুল ছিল।

ভুলটা টের পেতে কিন্তু আমাদের বেশি দিন অপেক্ষা করতে হয়নি। ১৯৪৭-এর আগস্টে পাকিস্তান রাষ্ট্র হলো, আর তার ছয় মাসের মধ্যেই ২৩শে ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার প্রস্তাব করে ওর সেই ঐতিহাসিক বক্তৃতাটা দিলেন। দত্তবাবুর উত্থাপিত বিলটা ছিল খুবই সহজ ও সরল। তিনি প্রস্তাব করেছিলেন যে এই নয়া রাষ্ট্র পাকিস্তানে যেহেতু বাঙালিরাই সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি, তাহলে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে বাংলা ভাষাটাকেই আমরা বেছে নিই। কিন্তু সেসময়ের গণপরিষদে মুসলিম লীগের নেতারা গর্জে উঠলেন, না, এটা হতে পারে না, বাংলা কেন? হবে না।

(২)

এইটাই ছিল আমাদের জন্য চোখ খুলে দেওয়ার অধ্যায়। পাকিস্তানের কমবেশি প্রায় সকল বড় নেতারা- ওদের মধ্যে বাঙালি নেতারাও অনেকে ছিলেন- ওরা ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে গালাগালি শুরু করলো। কেউ বলে তাঁর কথাটি নাকি ‘এন্টি-পাকিস্তান’ প্রস্তাব, কেউ বলে এটা মুসলিমবিরোধী প্রস্তাব, কেউ বলে ইসলামবিরোধী প্রস্তাব ইত্যাদি। বাঙালি বিস্ময়ে হতবাক। এরা এটা কী বলে! বাংলার কথা বললে পাকিস্তানবিরোধী? ইসলামবিরোধী? কিন্তু পাকিস্তানের সবচেয়ে বেশি মানুষ তো বাংলায়ই কথা বলে। অন্য যেসব ভাষা আছে সেগুলিতে কথা বলার লোক তো অতি অল্প। তাহলে ওদের সমস্যাটা কী? তবে কি পাকিস্তান আমাদের রাষ্ট্র নয়?

১৯৪৮ সনের সেই বসন্ত পাকিস্তান নামক গ্লেসিয়ারে প্রথম ফাটলটা তৈরি করেছে। না, এই দেশের সাথে বাঙালিদের তো থাকা হবে না- আপনারা তো জানেনই, প্রথম ছিট একটা ফাটল বিশাল মহীরুহকে ভেঙে দুই টুকরা করে ফেলতে পারে- সেটাতে যে অন্তর্নিহিত বৈষম্য থাকে সেই বৈষম্য ধরে চিড় চিড় করে ভেঙে পড়ে। আমাদের বুদ্ধিজীবীরা এবং অল্প কয়েকজন নেতা সেই সময়ই টের পেয়েছেন, না, পাকিস্তানের সাথে তো আমাদের থাকা হবে না। সেসব নেতাদের মধ্যে একজন ছিলেন ছয়ফুট লম্বা ঢ্যাঙা ধরনের এক সাতাশ বছরের যুবক- ঢলঢলে ঢিলে পাজামার ওপর সস্তার সুতি কাপড়ের সাদা পাঞ্জাবি, সাথে নেহরুর মতো কালো কোট।

চোখে পুরো কাঁচের চশমা পরা সেই যুবকের কথা আজ আর বলব না। ওর কথা তো আপনারা জানেন।

(৩)

১৯৪৮ সনের ফেব্রুয়ারিতে ধীরেন দত্তের সেই প্রস্তাবটাই ছিল ভাষা আন্দোলনের সূচনা। চার বছর পর ২১ ফেব্রুয়ারি হচ্ছে এটার চূড়ান্ত পর্যায়। কিন্তু ততদিনে আন্দোলন আর রাষ্ট্রভাষায় সীমিত থাকেনি। ততদিনে আমাদের তরুণ যুবকরা লেখক কবি শিল্পী সুরকার আঁকিয়ে সিনেমাওয়ালা সকলের মধ্যে আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধানটা শুরু হয়ে গেছে পুরোদমে। আপনি দেখবেন, আমাদের শ্রেষ্ঠ কবিতাগুলি লেখা হয়েছে এই সময়ে বায়ান্ন থেকে একাত্তর, আমাদের সেরা সুরগুলি সৃষ্টি হয়েছে সেই সময়, আমাদের সিনেমার গোড়াপত্তন হয়েছে সেই সময়টাতেই এবং সেই মান আমরা এখনো অতিক্রম করতে পারিনি।

পাকিস্তানিরা এইটা ঠিকই উপলব্ধি করেছে। ওরা দিশেহারা, কী করা যায়! এরা তো বাংলা ভাষার ভিত্তিতে রীতিমতো জাতীয় পরিচয় দাঁড় করিয়ে ফেললো, তাহলে তো পাকিস্তান অর্থহীন একটা রাষ্ট্র হয়ে যায়। ওরা তখন ভাষাকে দূষিত করার চেষ্টা করেছে আরবি ফারসি শব্দ ঢুকিয়ে, একবার বলল বর্ণমালা বদলে দেবে, বাংলা বর্ণমালার পরিবর্তে রোমান হরফ বা আরবি হরফে বাংলা লিখবে। এরকম কত কী। কাজী নজরুলের কবিতা সম্পাদনা করতে বসে গেল একদল। (ভাবুন তো কত বড় ছাগল এরা! কবি তখনই জীবিত, ওরা বসেছে তাঁর কবিতার মুসলমানি করতে!) এবং সবশেষে ওরা বলল, রবীন্দ্রনাথ চলবে না, তোমরা বাঙালিরা বড় বেশি রবীন্দ্রসঙ্গীত গাও, রবীন্দ্রনাথ হিন্দু, এটা বন্ধ করতে হবে।

সেই যে সাতাশ বছরের দীর্ঘকায় যুবকের কথা বলেছি, তাঁকে ওরা নানা ছুতায় সুযোগ পেলেই ওরা জেলে ঢুকিয়ে দেয়। ১৯৪৮ থেকে শুরু করে ২৫শে মার্চ পর্যন্ত ওরা তাঁকে ১৮ বার গ্রেফতার করেছে, সেই তেইশ বছরের মধ্যে কমবেশি ১৩ বছর তাঁর কেটেছে কারাগারে। পাকিস্তান কিন্তু এই সময়ে একটা সুস্থ স্বাভাবিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারেনি- এই দীর্ঘ ২৩ বছরে ওরা একটা সংবিধানও স্থাপন করতে পারেনি। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে এসে মূল আন্দোলনটা রূপ লাভ করলো, বঙ্গবন্ধু ছয় দফা দিলেন, বাঙালির স্লোগান বদলে গেল- তুমি কে আমি কে, বাঙালি বাঙালি, তোমার আমার ঠিকানা- পদ্মা মেঘনা যমুনা ইত্যাদি।

(৪)

জাতি হিসাবে আমরা বাঙালি এবং এই ভিত্তিতেই রাষ্ট্র চাই। স্ফুলিঙ্গটা অনেক আগে থেকেই ছিল। বলতে পারেন যে ১৯৪৭-এর আগেও অনেকে বলেছেন বিচ্ছিন্নভাবে বাঙালি জাতীয়তাবাদের কথা। সেগুলি চাপা পড়ে গিয়েছিল তীব্র ধর্মীয় উন্মাদনা ও সংঘাতের নিচে। হিন্দু মুসলমান একজন আরেকজনকে কাটছে, ওর মাঝখানে ঐ একই বৃন্তে দুটি ফুল হয়তো ঠিক আছে, কিন্তু বাঙালি জাতীয়তাবাদের কথা বলার সুযোগ কোথায়। এই জন্য বলতে পারেন যে কার্যকর স্ফুলিঙ্গটা ১৯৪৮-এ জ্বলে উঠেছিল। ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের কথা বলছি, কেননা তিনি সেই গণপরিষদে বিলটা এনেছিলেন। আরও অনেকেই ছিলেন।

আজকে এইসব কথা প্রাসঙ্গিকতা কী? প্রাসঙ্গিকতা আছে- একটু জরুরি প্রসঙ্গ এটা। ২০১৪-এর আগস্টের পর থেকে আজকে আমাদের দেশকে পাকিস্তানি ধারায় ফেরানোর মতলব করছে একদল লোক। পাকিস্তানি ধারা কথাটার অর্থ কী আর এর সাথে আমাদের কী বিরোধ? বিরোধটা এই জায়গায়- আমরা বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছি একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসাবে, বাঙালি জাতীয়তাবাদ ছিল যার ভিত্তি। সেই উদ্দেশ্যেই আমরা ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছি। এইটাই একুশের চেতনা, এইটাই স্বাধীনতার চেতনা। এখন আমরা এই লড়াইটাতে আছি- একদল চাইছে সংবিধানে রাষ্ট্রধর্ম রেখে ধর্মনিরপেক্ষতাকে সরিয়ে দিতে।

এইটা আমাদের রুখতে হবে। আমরা রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ বৈশিষ্ট্য বাদ দিতে পারি না। আর এই লড়াইয়ে আমাদের শক্তি হচ্ছে আমাদের দীর্ঘ দিনের লড়াই-সংগ্রামের উত্তরাধিকার, যার মৌলিক ভিত্তি ছিল অসাম্প্রদায়িকতা, যেটা আজকেও আমাদের সংগ্রামের মূল উপজীব্য। এই লড়াইটা ভাষা আন্দোলনেরই ধারাবাহিকতা। এই জায়গাটায় আমরা আপোষ করতে পারি না। একুশ আমাদের সেই প্রেরণাটা দেয়, এই লড়াইটা আমাদের উত্তরাধিকার, এই লড়াইটা আমরা ছাড়তে পারব না, এই লড়াইটা আমরা হারতেও পারব না। প্রাণ গেলে যাবে, লড়াইটা জিততে হবে। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ আমাদের সাথে।

(৫)

একটা কথা মনে রাখবেন, ভাষা আন্দোলন এবং চলমান রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ একটার থেকে আরেকটা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এটা হচ্ছে জাতি হিসাবে বাঙালির প্রতিষ্ঠা এবং বিশ্বের বুকে আত্মমর্যাদা নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর একেকটা ধাপ মাত্র। আমি আমার বাঙালি পরিচয়, সাংস্কৃতিক বাঙালিয়ানা- এর কোনটাই বিসর্জন দিতে পারি না। বরং ইতিহাস নির্দেশ করে, আমরা আমাদের নিজেদের পরিচয়ে নিজেদের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে যদি দাঁড়াতে পারি, তাহলেই কেবল জাতি হিসাবে সফল হতে পারব, নইলে নয়। আর এই শক্তি আমাদের মধ্যে আছে- ইতিহাস ভুলে যাবেন না।

আপনাদের মনে করিয়ে দিই, রবীন্দ্রসঙ্গীতের জন্য যে জাতি যুদ্ধ করতে প্রস্তুত হয়, আত্মপরিচয় তাঁর জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ, আর এর জন্য দীর্ঘ সংগ্রাম কোনো ব্যাপারই না।

লেখক: আইনজীবী ও এক্টিভিস্ট

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

একুশের চেতনা: বাঙালির আত্মপরিচয়ের সংগ্রাম

দূর্গম পাহাড়ে একুশের গান / ম্রো শিশুদের কণ্ঠে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ (ভিডিও)

শহীদ মিনারে জামায়াত আমিরকে ঘিরে ‘রাজাকার’ ও ‘একাত্তরের দালাল’ স্লোগান (ভিডিও)

অমর একুশে ফেব্রুয়ারি / ভাষার জন্য আত্মোৎসর্গের গৌরবময় ইতিহাস

সবচেয়ে খারাপ রিক্রুটতো ছিলেন ইউনূস: খালেদ মুহিউদ্দীন (ভিডিও)

অস্ত্র উৎপাদন ও সামরিক খাতে পুঁজির প্রবাহ ও ব্যয় উভয়ই বাড়ছে

নারী স্বাধীনতা আর পিতৃতান্ত্রিক অন্ধকার

প্রকৃত পরীক্ষা আসলে খারাপ সময়েই হয়

এইসবের জবাবদিহি হবে না?

মার্কিন স্বার্থের প্রতিনিধি কি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী?

১০

খলিলুর রহমান: নীলক্ষেতের রক্তমাখা ছায়া থেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী

১১

টিআইবির নির্বাচন পর্যবেক্ষণ / আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনের ‘অন্তর্ভুক্তি’ নিয়ে প্রশ্ন

১২

সহিংসতার নতুন উচ্চতা / মব হত্যা দ্বিগুণ, অজ্ঞাত লাশ বেড়েছে, সংখ্যালঘু নির্যাতন তীব্র

১৩

জঙ্গি সংগঠনগুলোর ন্যারেটিভ ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ

১৪

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মুক্তির আহ্বান ও শ্বাশত মুজিব’

১৫

সবচেয়ে উঁচুতে দাঁড়িয়ে ‘বীর’

১৬

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘জয় বাংলা’

১৭

ফরিদপুর স্টেডিয়াম বধ্যভূমি

১৮

ইতিহাসের সাক্ষী ঝিনাইদহের ‘প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ ফলক’

১৯

স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য / রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভ

২০