ঢাকা শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬, ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
মুক্ত ভাবনামুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা
স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভ

প্রিয়ভূমি ডেস্ক
প্রকাশ : ২৭ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:৫২ পিএম
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভ

বাংলাদেশের মানচিত্রে ‘মতিহারের সবুজ চত্বর’ খ্যাত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এক অনন্য গৌরবের নাম। কিন্তু এই সবুজ ঘাসের নিচে মিশে আছে একাত্তরের সহস্র শহীদের রক্ত আর হাহাকার। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস যে ভয়াবহ ও বীভৎস গণহত্যার সাক্ষী হয়েছিল, তার সজল স্মারক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তর-পূর্ব কোণের বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভ।

নির্মমতার সেই দিনগুলো

১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. জোহা হল দখল করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাদের আঞ্চলিক সদর দপ্তর স্থাপন করে। জোহা হলের ঠিক পেছনেই ছিল এক নিচু জলাভূমি। সেই নয় মাস ধরে আশপাশের গ্রাম ও শহর থেকে অগণিত নিরপরাধ মানুষকে ধরে এনে এই হলের টর্চার সেলে চলত অমানুষিক নির্যাতন। তারপর রাতের অন্ধকারে তাঁদের নিয়ে যাওয়া হতো পেছনের সেই নির্জন নিচু এলাকায়। নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে সেখানেই গণকবর দেওয়া হতো অগণিত ছাত্র, শিক্ষক, কর্মচারী ও সাধারণ মানুষকে। বিজয় অর্জনের পর ১৯৭২ সালে যখন ওই এলাকা খনন করা হয়, তখন বেরিয়ে আসে কঙ্কাল আর খুলির স্তূপ। মানুষের হাড়ের সেই পাহাড় দেখে সেদিন শিউরে উঠেছিল বিশ্ববিবেক।

স্থাপত্যের ভাষায় ইতিহাসের কথা

শহীদদের স্মৃতিকে চিরজাগরুক রাখতে এই গণকবরের ওপর নির্মিত হয়েছে এক অনন্য স্থাপত্যশৈলী। স্থপতি সালাউদ্দিন আহমেদ এর নকশায় তৈরি এই স্মৃতিস্তম্ভটি গতানুগতিক নকশা থেকে ভিন্ন এবং গভীর অর্থবহ।

শূন্যতার হাহাকার: স্মৃতিস্তম্ভের মূল অংশে একটি বিশাল দেয়াল রয়েছে, যার মাঝখানে একটি বৃত্তাকার ছিদ্র। এই ছিদ্রটি মূলত বন্দুকের বুলেটের ক্ষতকে নির্দেশ করে, যা দিয়ে শহীদদের বুকের পাঁজরের শূন্যতাকে বোঝানো হয়েছে।

রক্তিম পথ: বধ্যভূমির বেদিতে ওঠার জন্য যে দীর্ঘ লাল ইটের পথ রয়েছে, তা প্রতীকীভাবে রক্তনদী পার হয়ে স্বাধীনতার দিকে যাওয়ার যাত্রাকে ফুটিয়ে তোলে।

উন্মুক্ত আকাশ: স্তম্ভটির চারপাশ উন্মুক্ত, যা দিয়ে বোঝানো হয়েছে শহীদদের আত্মা এই মুক্ত নীল আকাশে বিলীন হয়ে গেছে, কিন্তু তাঁদের ত্যাগ আজও আমাদের ছায়া দিচ্ছে।

বর্তমানের আয়নায় বধ্যভূমি

আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছে এই বধ্যভূমি কেবল ইট-পাথরের কোনো স্থাপত্য নয়, বরং এটি দেশপ্রেমের এক জীবন্ত পাঠশালা। প্রতিদিন বিকেলে যখন গোধূলির আলো এই স্তম্ভের গায়ে পড়ে, তখন মনে হয় এটি যেন নীরব ভাষায় আমাদের বলছে— "তোমরা ভুলে যেও না আমাদের ত্যাগের কথা।" ম্যাগাজিনের পাতায় এই ইতিহাস তুলে ধরার উদ্দেশ্য একটাই— আমাদের শেকড়কে চেনা। যে মাটির ওপর দাঁড়িয়ে আমরা আজ মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিচ্ছি, সেই মাটির ঋণ যেন আমরা ভুলে না যাই। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বধ্যভূমি প্রতিটি বাঙালির কাছে এক পবিত্র তীর্থস্থান, যা যুগ যুগ ধরে বীরত্বের গাঁথা শুনিয়ে যাবে।

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

হামে শিশু মৃত্যু ও মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির প্রতিবাদে মানববন্ধন, ১০ দফা দাবি

কক্সবাজারে হামের ভয়াবহ রূপ / ২০ বেডে ৮৭ শিশু

হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ / গর্ভের শিশুর লিঙ্গ পরিচয় প্রকাশ করা যাবে না

৩ বিভাগে অতি ভারী বর্ষণের সতর্কতা: সিলেটে জলাবদ্ধতার আশঙ্কা

দ্য প্রাইম মিনিস্টার-এ ফ্যামিলি ম্যান!

পেস ত্রয়ীকে বিশ্রাম দিয়ে তরুণ দল পাঠাচ্ছে অস্ট্রেলিয়া

লক্ষ্য বড় চুক্তি / বাণিজ্য যুদ্ধ ও ইরান উত্তাপের মধ্যেই বেইজিং যাচ্ছেন ট্রাম্প

দেশে হামের প্রকোপ ভয়াবহ / মৃত্যু ছাড়াল ৪০০, একদিনে ঝরল ১১ প্রাণ

১১ মে ১৯৭১: আর্তমানবতার পক্ষে কেনেডির গর্জন ও বিশ্ববিবেকের জাগরণ

মঙ্গল শোভাযাত্রা—বিশ্বমঞ্চে বাঙালির অসাম্প্রদায়িকতার জয়গান

১০

বুননশৈলীর মহাকাব্য—ঐতিহ্যবাহী জামদানি

১১

পদ্মা সেতু: বাংলাদেশের সক্ষমতা ও গৌরবের মহাকাব্য

১২

অবশেষে হামে ধরা খেলেন সওদাগর!

১৩

৩৬০ প্রাণের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল মেঘনা-ফুলদী তীর

১৪

মার্কিন-বাংলাদেশ বাণিজ্যচুক্তি: শর্তের বেড়াজালে সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থের সংকট

১৫

৯ মে ১৯৭১: আন্তর্জাতিক নিষ্ক্রিয়তায় ক্ষোভ ও পাক-হানাদারের নির্মমতা

১৬

সবাই তো এখন মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান!

১৭

ইউনূস সরকারের করা বাণিজ্য চুক্তির আদ্যোপান্ত, পড়ুন পুরো চুক্তিটি

১৮

সবার আগে দেশ, তার আগে আমেরিকা

১৯

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তির বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টে রিট

২০