ঢাকা মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬, ১৭ চৈত্র ১৪৩৩
মুক্ত মনমুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা
স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মারক ভাস্কর্য

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভ

প্রিয়ভূমি ডেস্ক
প্রকাশ : ২৭ জানুয়ারি ২০২৬, ১২:৫২ পিএম
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভ

বাংলাদেশের মানচিত্রে ‘মতিহারের সবুজ চত্বর’ খ্যাত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এক অনন্য গৌরবের নাম। কিন্তু এই সবুজ ঘাসের নিচে মিশে আছে একাত্তরের সহস্র শহীদের রক্ত আর হাহাকার। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস যে ভয়াবহ ও বীভৎস গণহত্যার সাক্ষী হয়েছিল, তার সজল স্মারক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তর-পূর্ব কোণের বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভ।

নির্মমতার সেই দিনগুলো

১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. জোহা হল দখল করে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাদের আঞ্চলিক সদর দপ্তর স্থাপন করে। জোহা হলের ঠিক পেছনেই ছিল এক নিচু জলাভূমি। সেই নয় মাস ধরে আশপাশের গ্রাম ও শহর থেকে অগণিত নিরপরাধ মানুষকে ধরে এনে এই হলের টর্চার সেলে চলত অমানুষিক নির্যাতন। তারপর রাতের অন্ধকারে তাঁদের নিয়ে যাওয়া হতো পেছনের সেই নির্জন নিচু এলাকায়। নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে সেখানেই গণকবর দেওয়া হতো অগণিত ছাত্র, শিক্ষক, কর্মচারী ও সাধারণ মানুষকে। বিজয় অর্জনের পর ১৯৭২ সালে যখন ওই এলাকা খনন করা হয়, তখন বেরিয়ে আসে কঙ্কাল আর খুলির স্তূপ। মানুষের হাড়ের সেই পাহাড় দেখে সেদিন শিউরে উঠেছিল বিশ্ববিবেক।

স্থাপত্যের ভাষায় ইতিহাসের কথা

শহীদদের স্মৃতিকে চিরজাগরুক রাখতে এই গণকবরের ওপর নির্মিত হয়েছে এক অনন্য স্থাপত্যশৈলী। স্থপতি সালাউদ্দিন আহমেদ এর নকশায় তৈরি এই স্মৃতিস্তম্ভটি গতানুগতিক নকশা থেকে ভিন্ন এবং গভীর অর্থবহ।

শূন্যতার হাহাকার: স্মৃতিস্তম্ভের মূল অংশে একটি বিশাল দেয়াল রয়েছে, যার মাঝখানে একটি বৃত্তাকার ছিদ্র। এই ছিদ্রটি মূলত বন্দুকের বুলেটের ক্ষতকে নির্দেশ করে, যা দিয়ে শহীদদের বুকের পাঁজরের শূন্যতাকে বোঝানো হয়েছে।

রক্তিম পথ: বধ্যভূমির বেদিতে ওঠার জন্য যে দীর্ঘ লাল ইটের পথ রয়েছে, তা প্রতীকীভাবে রক্তনদী পার হয়ে স্বাধীনতার দিকে যাওয়ার যাত্রাকে ফুটিয়ে তোলে।

উন্মুক্ত আকাশ: স্তম্ভটির চারপাশ উন্মুক্ত, যা দিয়ে বোঝানো হয়েছে শহীদদের আত্মা এই মুক্ত নীল আকাশে বিলীন হয়ে গেছে, কিন্তু তাঁদের ত্যাগ আজও আমাদের ছায়া দিচ্ছে।

বর্তমানের আয়নায় বধ্যভূমি

আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছে এই বধ্যভূমি কেবল ইট-পাথরের কোনো স্থাপত্য নয়, বরং এটি দেশপ্রেমের এক জীবন্ত পাঠশালা। প্রতিদিন বিকেলে যখন গোধূলির আলো এই স্তম্ভের গায়ে পড়ে, তখন মনে হয় এটি যেন নীরব ভাষায় আমাদের বলছে— "তোমরা ভুলে যেও না আমাদের ত্যাগের কথা।" ম্যাগাজিনের পাতায় এই ইতিহাস তুলে ধরার উদ্দেশ্য একটাই— আমাদের শেকড়কে চেনা। যে মাটির ওপর দাঁড়িয়ে আমরা আজ মুক্ত বাতাসে নিঃশ্বাস নিচ্ছি, সেই মাটির ঋণ যেন আমরা ভুলে না যাই। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এই বধ্যভূমি প্রতিটি বাঙালির কাছে এক পবিত্র তীর্থস্থান, যা যুগ যুগ ধরে বীরত্বের গাঁথা শুনিয়ে যাবে।

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

৩০ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন ও বিশ্ববিবেকের জাগরণ

ইতিহাসের অবিনশ্বর নক্ষত্র: শহীদ শাফী ইমাম রুমী

২৯ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন ও আত্মাহুতির এক নৃশংস অধ্যায়

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা,আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশ

২৮ মার্চ ১৯৭১: ধ্বংসযজ্ঞের ছাপ আর বাঙালির সুসংগঠিত প্রতিরোধ

২৭ মার্চ ১৯৭১: বিশ্ব জানল, বাংলাদেশ স্বাধীন

২৬ মার্চ ১৯৭১: একটি জাতির রক্তক্ষয়ী সূর্যোদয় ও স্বাধীনতার ঘোষণা

গণহত্যার বিরুদ্ধে শৈল্পিক প্রতিবাদ / ২৫শে মার্চের কালরাত্রি স্মরণে প্রাচ্যনাটের ‘লালযাত্রা’

২৫ মার্চ, ১৯৭১: ইতিহাসের কলঙ্কিত কালরাত ও বিভীষিকাময় গণহত্যা

২৪ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন আর চূড়ান্ত প্রস্তুতির দিন

১০

২৫ মার্চের গণহত্যা স্মরণে ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দাবিতে ‘আলোর মিছিল’

১১

২৫ মার্চ ১৯৭১: গণহত্যার কালরাত্রি ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির লড়াই

১২

জামায়াতকে বিচারের আওতায় আনার দাবি / একাত্তরের গণহত্যা স্বীকৃতির প্রস্তাব মার্কিন কংগ্রেসে

১৩

২৩ মার্চ ১৯৭১: যেদিন পাকিস্তান দিবস হলো প্রতিরোধের নামে

১৪

২২ মার্চ ১৯৭১: আপসহীন সংগ্রামের ঘোষণা এবং ইয়াহিয়ার নতুন চাল

১৫

২১ মার্চ ১৯৭১: নীতির প্রশ্নে আপসহীন বঙ্গবন্ধু এবং ঘনীভূত সামরিক মেঘ

১৬

২০ মার্চ ১৯৭১: টেবিলে আশার আলো, অন্তরালে গণহত্যার নীল নকশা

১৭

১৯ মার্চ ১৯৭১: সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের প্রথম স্ফুলিঙ্গ ও বীরত্বগাঁথা

১৮

১৮ মার্চ ১৯৭১: জান্তার তদন্ত কমিটি প্রত্যাখ্যান ও বঙ্গবন্ধুর ডাক

১৯

১৭ মার্চ ১৯৭১: ‘নরকে বসেও হাসতে পারি’, বঙ্গবন্ধুর বজ্রশপথ

২০