
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারে সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করে টেকনোক্রেট কোটায় নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই নিয়োগকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করা এবং মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার নজরদারিতে থাকা এই ব্যক্তি কি বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষায় সক্ষম হবেন, নাকি তিনি ওয়াশিংটনের স্বার্থ বাস্তবায়নে কাজ করবেন?
খলিলুর রহমান ২৬ বছর যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন এবং সেখানে তিনি 'রজার রহমান' নামে পরিচিত ছিলেন। তার স্ত্রী, মেয়ে ও বোনসহ পুরো পরিবার যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করে। বিশ্লেষকরা বলছেন, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে তার তথ্য রয়েছে এবং তিনি মার্কিন নাগরিক হওয়ার পরও বাংলাদেশের অত্যন্ত সংবেদনশীল পদে অধিষ্ঠিত রয়েছেন ।
অন্তর্বর্তী সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা থাকাকালে গত জানুয়ারিতে তিনি ওয়াশিংটনে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের আন্ডার সেক্রেটারি অ্যালিসন হুকার এবং সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী পল কাপুরের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে তিনি বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচন, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং গাজায় আন্তর্জাতিক বাহিনীতে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের বিষয়ে আলোচনা করেন যা অনেকের মতে, বাংলাদেশের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা।
মজার ব্যাপার হলো, অন্তর্বর্তী সরকারে খলিলুর রহমান জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা থাকাকালে বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমেদ তাকে 'বিদেশি নাগরিক' উল্লেখ করে অপসারণের দাবি জানিয়েছিলেন । কিন্তু লন্ডনে ড. ইউনূস ও তারেক রহমানের বৈঠকে খলিলুর সক্রিয় উপস্থিতির পর বিএনপির অবস্থান পাল্টে যায়। সেই বৈঠকেই সম্ভবত ভবিষ্যৎ সরকার গঠন এবং খলিলের ভূমিকা নিয়ে সমঝোতা হয় বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা ।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এই নিয়োগকে 'ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং' হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, "পরিকল্পনা করে দুই-তৃতীয়াংশ আসন সরকারি দল নিয়ে নিল, এই সংবিধান সংস্কার যাতে না হয়, এই জটিলতা, এটা পুরাটাই একটা ইঞ্জিনিয়ারিং। আজকে জাতির সামনে সেটা উন্মোচন হচ্ছে খলিলুর রহমানের মন্ত্রিসভায় যোগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে" ।
খলিলুর রহমানের মার্কিন নাগরিকত্ব রয়েছে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক চলছেই। তিনি দাবি করেন, তার শুধু বাংলাদেশি নাগরিকত্ব রয়েছে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরসেদের মতে, যদি তার মার্কিন নাগরিকত্ব না ছাড়ার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে এই নিয়োগ সংবিধান লঙ্ঘন । তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাকে পরবর্তী রাজনৈতিক সরকারে মন্ত্রী হিসেবে দেখা যায়নি, যা নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বাংলাদেশের ওপর চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব কমানো এবং ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল বাস্তবায়নে খলিলুর রহমানকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় দেখছে ওয়াশিংটন। তার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তা কৌশল নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালাতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, রাখাইনে মানবিক করিডর স্থাপন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে মার্কিন এজেন্ডা বাস্তবায়নে তিনি কাজ করবেন বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের জনমত ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, বাঙালির জাতীয়তাবাদ ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির প্রতি আপত্তি থাকা সত্ত্বেও মার্কিন চাপে এবং গোপন সমঝোতার মাধ্যমেই খলিলুর রহমানকে এই পদে বসানো হয়েছে। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে সরাসরি প্রভাব বিস্তারের একটি বড় সুযোগ পেয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়েছে।
মন্তব্য করুন