ঢাকা শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬, ২০ আষাঢ় ১৪৩৩
মুক্ত ভাবনামুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

হোলি আর্টিজান হামলার এক দশক: ট্র্যাজেডি, বিচারপ্রক্রিয়া এবং বর্তমান নিরাপত্তা সমীক্ষা

হোলি আর্টিজান বেকারিতে নৃশংস ও ভয়াবহ জঙ্গি হামলায় যাঁরা নিহত হয়েছেন

২০১৬ সালের ১ জুলাই ঢাকার গুলশানে অবস্থিত হোলি আর্টিজান বেকারিতে ঘটেছিল বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে নৃশংস ও ভয়াবহ জঙ্গি হামলা। আজ ঘটনার এক দশক (১০ বছর) অতিক্রান্ত হলেও এর ক্ষত যেমন শুকায়নি, তেমনি দেশের বিচারিক ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এর প্রভাব এখনো সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। ঘটনার দিন থেকে শুরু করে ২০২৬ সাল পর্যন্ত প্রাপ্ত সর্বশেষ তথ্যের ভিত্তিতে এই হামলার সামগ্রিক চিত্র, বিচারপ্রক্রিয়ার জটিলতা এবং বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিচে বিস্তারিতভাবে বিশ্লেষণ করা হলো:

১. ঘটনার প্রেক্ষাপট: সেই ভয়াল রাত

২০১৬ সালের ১ জুলাই রাত পৌনে ৯টার দিকে কাঁধে ব্যাকপ্যাক, হাতে আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র, চাপাতি ও গ্রেনেড নিয়ে গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারিতে হামলা চালায় নব্য জেএমবির পাঁচ জঙ্গি—মীর সামেহ মোবাশ্বের, রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, নিবরাস ইসলাম, খায়রুল ইসলাম পায়েল ও শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল।

প্রাণহানি: প্রায় ১২ ঘণ্টার এই জিম্মি সংকটে জঙ্গিরা নৃশংসভাবে হত্যা করে ২০ জন জিম্মিকে। নিহতদের মধ্যে ছিলেন ৯ জন ইতালীয়, ৭ জন জাপানি, ১ জন ভারতীয় এবং ৩ জন বাংলাদেশী নাগরিক।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আত্মত্যাগ: জিম্মিদের উদ্ধারের প্রাথমিক প্রস্তুতি নেওয়ার সময় জঙ্গিদের ছোড়া বোমা ও গুলিতে নিহত হন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) সহকারী কমিশনার রবিউল ইসলাম এবং বনানী থানার ওসি সালাহউদ্দিন খান।

অপারেশন থান্ডারবোল্ট: পরদিন (২ জুলাই) সকালে সেনাবাহিনীর কমান্ডোরা ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ট’ পরিচালনা করেন। মাত্র ১২ থেকে ১৩ মিনিটের মূল অভিযানে ৫ হামলাকারী জঙ্গিই নিহত হয় এবং ১৩ জন জিম্মিকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়।

২. বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ও বর্তমান স্থবিরতা

হোলি আর্টিজান মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া একটি দীর্ঘ পথ পাড়ি দিলেও এক দশক পরেও তা চূড়ান্ত নিষ্পত্তি পায়নি। বর্তমানে মামলাটি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে শুনানির অপেক্ষায় থমকে আছে।

ক) নিম্ন আদালতের রায় (২০১৯)

২০১৮ সালের ২৬ নভেম্বর আট আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মাধ্যমে বিচার শুরু হয়। রাষ্ট্রপক্ষের ১১৩ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে ২০১৯ সালের ২৭ নভেম্বর ঢাকার সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনাল ৭ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং ১ জনকে খালাস দেয়।

খ) হাই কোর্টের রায় ও সাজা পরিবর্তন (২০২৩)

২০২৩ সালের ১০ অক্টোবর বিচারপতি শহিদুল করিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের হাই কোর্ট বেঞ্চ ৭ আসামির মৃত্যুদণ্ড পরিবর্তন করে ‘আমৃত্যু কারাদণ্ড’ এবং প্রত্যেকের ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করে। ২০২৪ সালের ১৭ জুন সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে ২২৯ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়।

হাই কোর্টের যুক্তি: মূল হামলাকারী ৫ জঙ্গি ঘটনাস্থলেই নিহত হয়েছে। জীবিত ৭ আসামি ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল না, তবে তারা ‘পরিকল্পনা, ষড়যন্ত্র, অর্থায়ন, অস্ত্র সংগ্রহ ও হামলায় প্ররোচনা’ দিয়েছিল। ‘একই অভিপ্রায়’ নীতির ভিত্তিতে নিম্ন আদালতের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড সঠিক ছিল না বিধায় হামলার আন্তর্জাতিক ভয়াবহতা বিবেচনা করে তাদের আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

গ) আপিল বিভাগে বর্তমান অবস্থা (২০২৬)

পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পর ২০২৫ সালের মে মাসে দণ্ডিত ৬ আসামি খালাস চেয়ে আপিল বিভাগে **'লিভ টু আপিল'** দায়ের করে। তবে বর্তমান বাস্তবতায় আপিল বিভাগে শুনানি শুরু হতে আরও কয়েক বছর লেগে যেতে পারে। এর প্রধান কারণগুলো হলো:

তীব্র মামলাজট: আপিল বিভাগে বর্তমানে মাত্র পাঁচজন বিচারপতি কর্মরত আছেন, যার ফলে ফৌজদারি মামলার বিশাল জট তৈরি হয়েছে। আইনজীবীদের মতে, বর্তমানে ২০১৯ সালের লিভ টু আপিলগুলোর শুনানি চলছে।

আসামিপক্ষের আর্থিক সক্ষমতার অভাব: আসামিরা দরিদ্র হওয়ায় সর্বোচ্চ আদালতে শুনানির জন্য নামী বা জ্যেষ্ঠ আইনজীবী নিয়োগ করার আর্থিক সামর্থ্য তাদের নেই।

আইনগত প্রশ্ন: আসামিপক্ষের আইনজীবীদের দাবি—সন্ত্রাসবিরোধী আইনে 'আমৃত্যু কারাদণ্ড' বলে কোনো সাজার বিধান নেই এবং ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিগুলো ভয়ভীতি দেখিয়ে নেওয়া হয়েছিল।

৩. দণ্ডিত আসামিদের বর্তমান অবস্থা

নিম্ন আদালত ও হাই কোর্ট কর্তৃক দণ্ডিত ৭ আসামির তালিকা ও বর্তমান অবস্থা নিম্নরূপ:

আসামির নাম জঙ্গি সংগঠন বর্তমান অবস্থা (২০২৬)
১. রাকিব উল হাসান ওরফে রিগ্যান নব্য জেএমবি কারাগারে আমৃত্যু দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত
২. মো. জাহাঙ্গীর হোসেন ওরফে রাজীব গান্ধী নব্য জেএমবি কারাগারে আমৃত্যু দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত
৩. আসলাম হোসেন ওরফে র‌্যাশ নব্য জেএমবি নিহত (৬ আগস্ট ২০২৪-এর কারা বিদ্রোহে)
৪. হাদিসুর রহমান নব্য জেএমবি কারাগারে আমৃত্যু দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত
৫. আবদুস সবুর খান ওরফে সোহেল মাহফুজ নব্য জেএমবি কারাগারে আমৃত্যু দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত
৬. মামুনুর রশীদ ওরফে রিপন নব্য জেএমবি কারাগারে আমৃত্যু দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত
৭. শরিফুল ইসলাম খালেদ নব্য জেএমবি কারাগারে আমৃত্যু দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত

৪. জাতীয় নিরাপত্তা ও উগ্রপন্থীদের বর্তমান তৎপরতা (২০২৬-এর চিত্র)

হোলি আর্টিজান হামলার পর সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কারণে উগ্রবাদ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এলেও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও দেশের সার্বিক পরিস্থিতিতে নতুন নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। অ্যান্টি টেররিজম ইউনিটের (এটিইউ) সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী পরিস্থিতি নিম্নরূপ:

পলাতক উগ্রপন্থী: নিষিদ্ধ ঘোষিত বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের অন্তত ৩১১ জন সদস্য বর্তমানে পলাতক বা আত্মগোপনে রয়েছেন। এর মধ্যে জেএমবির ১৮৫ জন, আনসার আল ইসলামের ৮৩ জন, হুজি-বি-এর ১৬ জন এবং নব্য জেএমবির ১৬ জন। এছাড়া হিযবুত তাহ্‌রীরের আরও ৫৯ জন পলাতক।

কারাগার থেকে পলায়ন: ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের দিন কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারের ফটক ভেঙে উগ্রবাদী মামলার সাজাপ্রাপ্ত ৯ জনসহ মোট ২০২ জন বন্দী পালিয়ে যায়, যা আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর জন্য বড় উদ্বেগের কারণ।

জামিনে মুক্তি ও আত্মগোপন: ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে প্রায় ১,৬১১ জন উগ্রপন্থী সদস্য জামিনে মুক্তি পেয়েছেন (যার মধ্যে ২০২৪ সালের আগস্টের পরেই মুক্ত হন ৩৮০ জন)। এদের মধ্যে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের জসীম উদ্দিন রাহমানী (২০ অক্টোবর ২০২৪-এ মুক্ত) এবং জেএমবি প্রধান মাওলানা সাইদুর রহমান (২১ মার্চ ২০২৫-এ মুক্ত) অন্যতম। মুক্তিপ্রাপ্তদের অনেকেই বর্তমানে নজরদারির বাইরে চলে গেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

৫. ভবিষ্যৎ ঝুঁকি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ

এক দশকের মাথায় এসে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাংলাদেশে উগ্রপন্থীদের বড় ধরনের হামলার সক্ষমতা বর্তমানে না থাকলেও তাদের একেবারে নিষ্ক্রিয় ভাবার সুযোগ নেই।

১. অস্ত্রের অনিয়ন্ত্রিত উৎস: ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের সময় পুলিশের বিভিন্ন থানা ও স্থাপনা থেকে লুণ্ঠিত আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদের একটি বড় অংশ এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এই অস্ত্রগুলো উগ্রপন্থীদের হাতে পৌঁছানোর ঝুঁকি রয়েছে।

২. নজরদারি শিথিলতা: দেশের সাম্প্রতিক প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক পুনর্গঠনের কারণে জঙ্গি ও উগ্রপন্থীদের ওপর নিয়মিত গোয়েন্দা নজরদারি কিছুটা শিথিল হয়েছে, যার সুযোগ নিয়ে তারা ভেতরে ভেতরে সংঘবদ্ধ হওয়ার চেষ্টা করছে।

হোলি আর্টিজান হামলা বাংলাদেশকে বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদ বিরোধী লড়াইয়ে এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল। হামলার ১০ বছর পূর্তিতে দাঁড়িয়ে একদিকে যেমন আপিল বিভাগে বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করে চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করা রাষ্ট্রের আইনি দায়িত্ব, অন্যদিকে কারাগার থেকে পালানো এবং জামিনে মুক্ত উগ্রপন্থীদের কঠোর নজরদারিতে এনে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নিভিয়ে দেয়া হয়েছে ‘শিখা অনির্বাণ’

হোলি আর্টিজান হামলার এক দশক: ট্র্যাজেডি, বিচারপ্রক্রিয়া এবং বর্তমান নিরাপত্তা সমীক্ষা

জাপানের জমাট রক্ষণ চূর্ণ করে ব্রাজিলের উল্লাস

৭ শিল্প অঞ্চলে ৪৫৭ কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ, বিপাকে তৈরি পোশাক খাত

বোবা কান্নার মেঘনা ও আমাদের মরে যাওয়া মনুষ্যত্ব

একের পর এক ‘মিথ্যা’ মামলা, আদালতে ক্ষোভ প্রকাশ করলেন মিষ্টি সুবাস

ভেনেজুয়েলায় জোড়া ভূমিকম্প: আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জরুরি সহায়তা চাইল জাতিসংঘ

তিন মেয়েসহ মাকে কুপিয়ে হত্যা, গণপিটুনিতে ঘাতক নিহত

ভেনেজুয়েলায় ১২৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্প

২৩ জুন ১৯৭১: আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তোলপাড় এবং প্রতিরোধ যুদ্ধের উত্তাল দিন

১০

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগ

১১

২২ জুন ১৯৭১: নিষেধাজ্ঞা ভেঙে পাকিস্তানে মার্কিন সমরাস্ত্রের চালান

১২

ইরানের ঘোষণার পর হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্থবির

১৩

চাঁদাবাজির অভিযোগে আটক এমপিপুত্র সজীব মুচলেকা দিয়ে মুক্ত

১৪

তরুণ সমাজকে গ্রাস করছে নতুন প্রজন্মের সিনথেটিক ড্রাগস

১৫

২১ জুন ১৯৭১: রণাঙ্গনে প্রতিরোধ যুদ্ধ, যুক্তরাজ্য ও ভারতের যৌথ বিবৃতি

১৬

১৮ জুন ১৯৭১: ঢাকায় দুঃসাহসিক গেরিলা আক্রমণ, কান্দাপাড়া গণহত্যা এবং রণাঙ্গনের প্রতিরোধ

১৭

বাবা নাকি ৭১-এর শহীদ, অথচ জামায়াত এমপির জন্ম ১৯৮১ সালে

১৮

আলজেরিয়াকে উড়িয়ে আর্জেন্টিনার শুভ সূচনা

১৯

১৭ জুন ১৯৭১: জগদীশপুর গণহত্যা, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কূটনৈতিক যুদ্ধ এবং প্রতিরোধ

২০