

মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষণের আড়ালে উগ্রবাদী আদর্শের বিস্তার ও তথাকথিত ‘গাজওয়াতুল হিন্দ’ বা ভারতীয় উপমহাদেশের চূড়ান্ত যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার অভিযোগে সম্প্রতি রাজধানী ঢাকার যাত্রাবাড়ী থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ছয় তরুণকে। আপাতদৃষ্টিতে একটি আত্মরক্ষা কৌশল শেখার কেন্দ্র মনে হলেও, ‘ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম’ (এফসিএস) নামের এই সংগঠনের অভ্যন্তরে চলছিল ভিন্ন এক তৎপরতা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের ধারাবাহিক জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য।
গ্রেপ্তারের পটভূমি ও আইনি প্রক্রিয়া
বিগত রোববার ভোর সাড়ে ৬টার দিকে যাত্রাবাড়ীর ‘মিনি কক্সবাজার’ এলাকা থেকে পুলিশ এই ছয়জনকে আটক করে। ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালত থেকে প্রথম দফায় তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়।
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের দাবি—সংগঠনের মূল চালিকাশক্তি শাহ আমানত সাবির উগ্রবাদে সম্পূর্ণভাবে জড়িয়ে পড়েছেন। তবে তার প্রধান সহযোগী হোসাইন তানিম এবং বাকি চার সদস্যের (জুনায়েদ, আতাউল্লাহ শাহ, আবিদুর রহমান ও বায়োজিদ) এই আদর্শিক জগতে গভীর কোনো সম্পৃক্ততা এখনো মেলেনি। মূলত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মার্শাল আর্টের বিজ্ঞাপন দেখে তারা সাবিরের কাছে এসেছিলেন। ফলশ্রুতিতে, আদালত সাবির ও তানিমকে দ্বিতীয় দফায় আরও তিন দিনের রিমান্ডে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে এবং বাকি চারজনকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
বোমা বিস্ফোরণের ভিডিও ও সামাজিক মাধ্যমে তোলপাড়
গ্রেপ্তারের পর এই তরুণদের মুক্তির দাবিতে যখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ডানপন্থি ও ধর্মীয় ঘরানার অ্যাক্টিভিস্টরা সোচ্চার হচ্ছিলেন, ঠিক তখনই একটি ভিডিও পুরো দৃশ্যপট বদলে দেয়। প্রবাসী সাংবাদিক জুলকারনাইন শায়ের সামির পোস্ট করা ১ মিনিট ৪ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে দেখা যায়:
সিটিটিসি-র রাসায়নিক ব্যাখ্যা
যদিও সামাজিক মাধ্যমে একে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন 'আইইডি' (ইমপ্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস) বলে দাবি করা হয়েছিল, তবে সিটিটিসি-র তদন্তে ভিন্ন তথ্য এসেছে। এটি মূলত ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর খুলনার ডুমুরিয়ায় ঘটানো একটি বিস্ফোরণ। সাধারণ চকলেট বোমার উপাদানের সাথে পেট্রোল ও অন্য একটি রাসায়নিক মিশিয়ে তারা এটি তৈরি করেছিল। আলো ও আগুনের ঝলকানি থাকলেও এতে তেমন কোনো তীব্র শব্দ ছিল না। পরবর্তীতে সাবির ও তার দল ভিডিওটি ডিজিটাল প্রযুক্তির সাহায্যে এডিট করে ভারী বিস্ফোরণের ‘বুম’ শব্দ যুক্ত করে, যাতে নিজেদের সক্ষমতা বড় করে জাহির করা যায়।
অর্থায়ন ও ‘ম্যাক ইউরি’ রহস্য
একটি উগ্রবাদী চিন্তাধারা বাস্তবায়নে শক্তির পাশাপাশি প্রয়োজন কৌশল ও অর্থ। জিজ্ঞাসাবাদে সাবির স্বীকার করেছেন যে, তাদের প্রধান প্রশিক্ষক ছিলেন ‘ম্যাক ইউরি’ নামের এক রহস্যময় ব্যক্তি (যা সম্ভবত একটি ছদ্মনাম)। এই ‘ম্যাক ইউরি’র কাছ থেকেই সাবির যুদ্ধের কৌশল ও কমব্যাট ট্রেনিং নেন এবং পরবর্তীতে খুলনায় নিজের একাডেমি খোলেন।
সংগঠন পরিচালনার জন্য তহবিল সংগ্রহের ক্ষেত্রে তারা এক অদ্ভুত ও বিতর্কিত দর্শনের আশ্রয় নেন। যশোরে অমুসলিমদের স্বর্ণের দোকানে বড় ধরনের ডাকাতির গুঞ্জন থাকলেও পুলিশ তার সত্যতা পায়নি। তবে সাবির স্বীকার করেছেন যে, খুলনায় এক সনাতন ধর্মাবলম্বী ইজিবাইক চালককে তারা ‘বিধর্মী’ ও ‘হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সদস্য’ হিসেবে চিহ্নিত করে তার টাকা-পয়সা ছিনতাই করেন। তাদের উগ্রপন্থী মগজধোলাই এমন পর্যায়ে ছিল যে, অমুসলিমদের ওপর এই অপরাধকে তারা কোনো ‘জুলুম’ বা পাপ বলে গণ্য করেননি, বরং সংগঠন চালানোর বৈধ উৎস হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন।
ধর্মীয় বক্তাদের অবস্থান পরিবর্তন ও ‘চর’ বিতর্ক
সাবির ও তার দল গ্রেপ্তার হওয়ার পর প্রখ্যাত ধর্মীয় বক্তা আতাউর রহমান বিক্রমপুরী এবং আসিফ আদনান সামাজিক মাধ্যমে তাদের মুক্তির দাবিতে জোরালো বক্তব্য দিয়েছিলেন। সাবির নিয়মিত আতাউর রহমান বিক্রমপুরীর সাথে যোগাযোগ রাখতেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে তার পরামর্শ নিতেন বলেও তদন্তে জানা গেছে।
তবে বোমা বিস্ফোরণের ভিডিওটি জনসমক্ষে আসার পর এই ধর্মীয় গুরু ও ডানপন্থি বলয়ে তীব্র অস্বস্তি তৈরি হয়। অনেকেই দ্রুত নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করেন:
সবচেয়ে নাটকীয় মোড় নেয় যখন সাবিরের শ্বশুর আতিয়ার রহমান সামাজিক মাধ্যমে বিক্রমপুরীর পোস্টে মন্তব্য করেন যে, ‘কাফেরদের সহযোগিতা করা ঈমান ভঙ্গের কারণ’। এর জবাবে বিক্রমপুরী উল্টো প্রশ্ন তোলেন—“আপনার মেয়ে জামাই সাবির মুসলিম, নাকি ‘র’ (ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা) এর এজেন্ট—সেটা আগে পরিষ্কার করুন। সে নিজে প্রতারণা করে নিজের কর্মকাণ্ড গোপন রেখে পরামর্শ নিয়েছে।”
এই ঘটনার পর ডানপন্থি আন্দোলনের ভেতরেই এখন সন্দেহ দানা বাঁধছে যে, সাবির আসলেই কোনো উগ্রপন্থী, নাকি ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোকে বিপদে ফেলতে কোনো বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার ‘প্ল্যান্টেড এজেন্ট’ বা চর হিসেবে কাজ করছিলেন।
ভবিষ্যৎ তদন্তের অভিমুখ
ডিএমপির কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ শামসুল হক জানিয়েছেন, মামলাটির পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত চলছে। কোনো আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের সাথে সুনির্দিষ্ট সংযোগ এখনো না মিললেও, দেশীয় কোনো সুপ্ত চক্র বা কোনো অদৃশ্য শক্তির ইন্ধনে তরুণদের এই দল উগ্রবাদের পথে পা বাড়িয়েছে কিনা, তা পরবর্তী রিমান্ডের জিজ্ঞাসাবাদে আরও পরিষ্কার হবে।
মন্তব্য করুন