
একটি অবলা প্রাণী, যে মুখে ফুটে নিজের কষ্টের কথা বলতে পারে না, যে কেবল একটুখানি ভালোবাসার আশায় মানুষের পায়ের কাছে লেজ নাড়ে—তার শেষ পরিণতি হলো এক টুকরো ভারী ইট আর অতল নদীর জল। নরসিংদীর মেঘনা নদীর শাখা নদীর শান্ত জল সাক্ষী হয়ে রইল মানুষের চরম নৃশংসতার। গলায় ভারী ইট বেঁধে জীবন্ত একটি কুকুরকে সেতু থেকে ছুঁড়ে ফেলা হলো নদীতে। নদী হয়তো তার জল দিয়ে সেই কুকুরের শরীরের জ্বালা জুড়িয়েছে, কিন্তু আমাদের সমাজ ও মানুষের বিবেককে যে কলঙ্কের দাগে ডুবিয়ে দিয়েছে, তা মোছার উপায় কী?
বর্বরতার সেই রুদ্ধশ্বাস মুহূর্ত
গত বুধবার নরসিংদীর নাগরিয়াকান্দি সেতুর ওপর ঘটে এই বুক কাঁপানো ঘটনা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একদল মানুষ পরম নির্মমতায় একটি কুকুরের গলায় ভারী ইট বাঁধছে। কুকুরটি হয়তো তখনো বুঝতে পারেনি, যাদের সে পরম বন্ধু ভাবত, তারাই তার মৃত্যুর পরোয়ানা লিখছে। এরপর ছটফট করতে থাকা অবলা জীবটিকে নিষ্ঠুরভাবে ছুঁড়ে ফেলা হয় মেঘনার শাখা নদীতে। ইটের ভারে মুহূর্তেই তলিয়ে যায় প্রাণীটি।
বৃহস্পতিবার সকালে ‘অ্যানিমেল কমিউনিটি ওয়েলফেয়ার অব বাংলাদেশ’ নামক একটি ফেসবুক পেজ থেকে ভিডিওটি আপলোড হওয়ার পর মুহূর্তেই তা দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়। নেটিজেনরা প্রশ্ন তোলেন—আমরা কি আসলেই মানুষ, নাকি মানুষের মুখোশ পরা কোনো দানব?
আইনের জালে নিষ্ঠুরতার কারিগররা
ভিডিওটি নজরে আসার পরপরই নরসিংদী সদর থানা পুলিশ দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করে এবং বন্যপ্রাণী ও পশুপ্রেমী সংগঠনের পক্ষ থেকে মামলা দায়ের করা হয়।
প্রথম গ্রেপ্তার: বৃহস্পতিবার পুলিশ কামারগাঁও এলাকার আব্দুর রবের ছেলে মোহাম্মদ আলীকে গ্রেপ্তার করে। তবে পরবর্তীতে আদালত থেকে তিনি জামিনে মুক্তি পান।
পরবর্তী অভিযান: নরসিংদী সদর থানার ওসি এ আর এম আল মামুনের নেতৃত্বে পুলিশি তৎপরতা আরও জোরদার করা হয়। শনিবার (২৭ জুন) সন্ধ্যা ও রাতে বিশেষ অভিযান চালিয়ে এই নৃশংসতায় জড়িত আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন: নরসিংদী পৌর এলাকার কামারগাঁওয়ের আব্দুল আজিজের স্ত্রী শাহিনারা বেগম (৪০) এবং নাগরিয়াকান্দী এলাকার রমজান আলী (২২)। এ নিয়ে এই অমানবিক ঘটনায় মোট তিনজনকে আইনের আওতায় আনা হলো।
আমাদের মনুষত্ব আজ কোথায়?
পশুদের প্রতি এই ধরনের সহিংসতা কোনো নতুন বিষয় নয়, কিন্তু নাগরিয়াকান্দির এই ঘটনা সমস্ত নিষ্ঠুরতার সীমা ছাড়িয়ে গেছে। যে সৃষ্টিজগতে মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব বা 'আশরাফুল মাখলুকাত', সেই মানুষের বিবেক এতটা নিচে কীভাবে নামতে পারে?
"প্রাণী অধিকার কোনো করুণা নয়, এটি তাদের বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার। আমরা যদি তাদের ভালো না বাসতে পারি, তবে তাদের ওপর অত্যাচার করার অধিকারও আমাদের কেউ দেয়নি।"
একটি কুকুরকে পরম বিশ্বস্ততার প্রতীক মনে করা হয়। অথচ সেই বিশ্বাসের প্রতিদান আমরা দিলাম নির্মম মৃত্যু দিয়ে। এই ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সমাজ থেকে দয়া, মায়া ও সহানুভূতি দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। আজ যে মানুষটি একটি অবলা প্রাণীকে এভাবে ঠাণ্ডা মাথায় খুন করতে পারে, কাল সে কোনো মানুষের সাথেও একই আচরণ করবে না—তার গ্যারান্টি কোথায়?
প্রাণীর ওপর সহিংসতার বিরুদ্ধে জাগুক প্রতিরোধ
বাংলাদেশে ‘প্রাণী কল্যাণ আইন, ২০১৯’ অনুযায়ী প্রাণীর প্রতি যেকোনো ধরনের নিষ্ঠুরতা বা হত্যা দণ্ডনীয় অপরাধ। নরসিংদীর এই ঘটনায় পুলিশ যেভাবে দ্রুত আসামিদের গ্রেপ্তার করেছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে শুধু গ্রেপ্তারই শেষ কথা নয়; এই অপরাধীদের এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত, যা দেখে ভবিষ্যতে কোনো অবলা প্রাণীর দিকে হাত তোলার সাহস কেউ না পায়।
আসুন, আমরা আমাদের সন্তানদের শুধু জিপিএ-৫ পাওয়ার শিক্ষা না দিয়ে, প্রাণীদের ভালোবাসতে শেখাই। রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো একটি বিড়াল বা কুকুরও এই পৃথিবীর অংশ। ওদেরও আমাদের মতোই বাঁচার অধিকার আছে। নরসিংদীর মেঘনা নদীতে যে কুকুরটির সলিল সমাধি হয়েছে, তার বোবা কান্না যেন আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। মানুষের ভেতর মানুষের ‘মনুষ্যত্ব’ ফিরে আসুক, পৃথিবীটা সব জীবের জন্য নিরাপদ হোক।
মন্তব্য করুন