

বর্তমান সময়ে ‘উন্নয়ন’ ধারণাটি যতটা অর্থনৈতিক, তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক। ধারণাটি যতটা দেশীয়, তার চেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক। বিশ্বায়নের এ যুগে আন্তর্জাতিকতার আরেক নাম পাশ্চাত্যকরণ। পাশ্চাত্য প্রচারে ‘উন্নয়ন’ ধারণাটিই অধিক সমাদৃত। ফলে দারিদ্র্য বিমোচনের স্লোগান দিন দিন ফিকে হয়ে পড়ছে। এ কারণে নয় যে দারিদ্র্য বিমোচন হয়েছে। এ কারণে যে উন্নয়ন ধারণাটি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর কাছে অধিক জনপ্রিয়। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী পাশ্চাত্য প্রচারণা ও মডেল দ্বারা অনেক বেশি অনুপ্রাণিত হয়। সেই সুযোগে ‘উন্নয়ন’ ধারণাকে আমাদের রাজনীতির অনুষঙ্গ করেছে এ দেশের রাজনীতিবিদরা। এর নেতৃত্বে রয়েছে আন্তর্জাতিক তথা ‘পাশ্চাত্য’ সংস্থা বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। ১৯৪৪ সালে ব্রেটন উডস সম্মেলনের মধ্য দিয়ে এ দুই প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়েছিল। উভয়ের কেন্দ্রীয় কার্যালয় ওয়াশিংটন ডিসি। বিশ্বব্যাংকের মূল লক্ষ্য ‘উন্নয়ন’ প্রকল্পে ঋণ ও অনুদান প্রদান; আর আইএমএফের লক্ষ্য আর্থিক সংকটে নিপতিত রাষ্ট্রের ঋণ ও নীতি সহায়তা প্রদান। ‘ঋণ সহায়তা’ সরাসরি অর্থনৈতিক কার্যক্রম হলেও নীতি সহায়তা অনেক বেশি মাত্রায় রাজনৈতিক। আইএমএফ এই রাজনৈতিক কাজটিই আঞ্জাম দিচ্ছে। এক্ষেত্রে আমাদের বোঝা দরকার, আইএমএফ কীভাবে একই সঙ্গে ‘ঋণ সহায়তা’ ও ‘ নীতি সহায়তা’র কাজটি করছে।
তৎকালীন সরকারের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে ২০২৩ সালে আইএমএফ বাংলাদেশকে ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ অনুমোদন করে। ৪২ মাসের এ ঋণ কর্মসূচিতে ৩০টি শর্ত রয়েছে, যা তিনটি বিভাগের অধীনে পড়ে: পরিমাণগত মান উন্নয়নসংক্রান্ত শর্ত (কিউপিসি), অবকাঠামোগত মান উন্নয়নসংক্রান্ত শর্ত (এসআরসি) ও সাধারণ প্রতিশ্রুতি (জিসি)। তিনটি বিভাগের আওতায় রাখা নির্ধারিত ৩০টি শর্ত হলো নীতি সহায়তা। প্রথমটির অধীনে আছে ১০টি শর্ত। শর্তগুলোর প্রধান দিক হলো সরকারের রাজস্ব সংগ্রহের সক্ষমতা বৃদ্ধি, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করা। এ লক্ষ্যে আইএমএফ বলছে, সরকারকে কর প্রশাসন সংস্কার করে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে, যাতে বাজেট ঘাটতি একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে রাখা যায়। রাজস্ব সংগ্রহের সক্ষমতা বৃদ্ধি একটি ভালো প্রস্তাব। রাজস্ব বৃদ্ধি পেলে সরকার বাজেট ঘাটতি কমাতে পারবে, একই সঙ্গে উন্নয়নমূলক কাজের পরিধি বাড়াতে পারবে। কিন্তু আইএমএফের শর্ত মানলে সরকার স্বাধীনভাবে উন্নয়নমূলক কাজের পরিধি বাড়াতে পারবে না। এর অন্যতম কারণ অবকাঠামোগত মান উন্নয়নসংক্রান্ত শর্ত।
এখানে আইএমএফ বলছে, জ্বালানি ও জ্বালানিসংশ্লিষ্ট খাতে সরকার নির্ধারিত ভর্তুকিনির্ভর মূল্য ব্যবস্থার পরিবর্তে একটি স্বয়ংক্রিয় ও সূত্রভিত্তিক মূল্যনির্ধারণ প্রক্রিয়া চালু করতে হবে। একই সঙ্গে শর্তে বলা হয়েছে, মুদ্রা বিনিময় হার এবং সুদের হারকেও সরকারিভাবে নিয়ন্ত্রণ না করে বাজারের ওপর ছেড়ে দিতে হবে। উল্লেখ্য, ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে ২০২৪-২৫ পর্যন্ত গ্যাস খাতে ৩৬ হাজার ৭১২ কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়া হয় এবং গত বছর বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি বাবদ ৬২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। এমনিতেই এ দেশের মানুষ উচ্চমূল্যস্ফীতিতে আক্রান্ত। পণ্যের দাম যেভাবে বাড়ছে সেভাবে আয় বাড়ছে না। পণ্যের দাম কমার একটা পদ্ধতি হতে পারত সরকারি প্রণোদনা বা ভর্তুকি বৃদ্ধি এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। আইএমএফ সাধারণ প্রতিশ্রুতির অধীনে যে কয়েকটি শর্ত দিয়েছে তার মধ্যে একটি হলো জ্বালানি, সার ও অন্যান্য সেক্টরে ভর্তুকি কমাতে হবে। এ শর্ত মেনে যদি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও সারের ওপর সরকারি ভর্তুকি কমানো হয়, তাতে আমাদের কৃষি ব্যবস্থা আরো দুর্বল হয়ে পড়বে। অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে আমাদের দেশে চলমান ভর্তুকি ব্যবস্থাকে সুষমভাবে কার্যকর করা এখনো সম্ভব হয়নি। কী করে ভর্তুকি ব্যবস্থাকে কার্যকর করা যায়, তার পদ্ধতি অন্বেষণ না করে ভর্তুকি কমিয়ে ফেলা পুরো দেশের অর্থনীতিকে ভঙ্গুর করার নামান্তর।
সরকারি প্রণোদনার অভাবে বেশ কয়েকটি সার কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে সারের আমদানি বেড়েছে। ডলারের মূল্য বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়ার মধ্য দিয়ে আমদানি মূল্য বৃদ্ধি পাওয়াই স্বাভাবিক। তাছাড়া কৃষকরা সরকারি ব্যাংকিং পদ্ধতির সুফল পাচ্ছেন না। কৃষকরা ৮১ শতাংশের বেশি ঋণ নিচ্ছেন বেসরকারি উৎস থেকে, যেখানে সুদের হার ১৯-৬৩ শতাংশ। অথচ সরকারি কৃষি ব্যাংক ৯ শতাংশ সুদে যে কৃষি ঋণ দিচ্ছে তার পরিমাণ মাত্র ৬ শতাংশ। এনজিওগুলো ব্যাংক থেকে ১২-১৩ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে তা থেকে ৩০ শতাংশ সুদে কৃষককে ঋণ দিচ্ছে। ফলে কৃষি উৎপাদনে খরচ বাড়ছে, কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। প্রকারান্তরে কৃষিজাত পণ্যের আমদানি বাড়ছে। শুধু তা-ই নয়, ব্যাংকিং ব্যবস্থা আইএমএফের নীতির অনুগামী হওয়ার ফলে বিভিন্ন শিল্প-কারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। শিল্পে বিনিয়োগের জন্য যে মূলধন ব্যাংক থেকে নেয়া হয় তাতে সুদের হার বেশি। সুদের হার বাজার দ্বারা নির্ধারিত হওয়ার ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ হ্রাস পেয়েছে। এতে শিল্পোন্নয়নে সরকারের ক্ষমতা কমে গেছে। অনেক শিল্প-কারখানা পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ পাচ্ছে না। বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে ভর্তুকি হ্রাস করা হলে আমাদের শিল্পোৎপাদন আরো ক্ষতির মধ্যে পড়বে।
এর মানে আইএমএফের শর্ত তথা ‘নীতি সহায়তা’ মেনে চললে আমাদের রফতানিমুখী অর্থনীতি আরো ভেঙে পড়বে। এমনিতেই আমদানির অংক অনেক বড়, রফতনির অংক ছোট। রফতানি আয় কমে গেলে আমদানির ওপর চাপ বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক। ২০২২ সালের হিসাবে দেখা গেছে, বাংলাদেশ আমদানি করেছিল ৯৬ বিলিয়ন ডলার মূল্যের পণ্য আর রফতানি করেছিল ৫৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৩৭ বিলিয়ন ডলার। হিসাবে দেখা যায়, রফতানি বৃদ্ধির হারের চেয়ে আমদানি বৃদ্ধির হার বেশি। এর মানে বাণিজ্য ঘাটতি আরো বাড়ছে। চলমান বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে না পারলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন পিছিয়ে পড়বে। বাস্তবে পিছিয়ে পড়ছে। এক্ষেত্রে সরকারকে কার্যকরী উদ্যোগ নিতে হবে। অথচ বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর জন্য আইএমএফ কোনো স্পষ্ট নীতি হাজির করেনি। আইএমএফের নীতি হলো সরকারি খরচ কমানো, বেসরকারীকরণ বাড়ানো, আর বাজার ব্যবস্থার ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ কমানো।
আইএমএফ রাজস্ব বাড়ানোকে গুরুত্ব দিলেও সেই রাজস্বের বড় অংশ ঋণ পরিশোধে ব্যয় করতে বলেছে। এর নাম দিয়েছে ঋণ ব্যবস্থাপনা। দেশের বাজেটের সিংহভাগ যখন দেশী-বিদেশী ঋণ পরিশোধে ব্যয় করা হয়, তখন তো দেশের কৃষি, শিল্প, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অন্যান্য উন্নয়ন ও সেবামূলক খাতে সরকারি ব্যয় কমাতে সরকার বাধ্য হবে। আইএমএফ এটাই চায়। আইএমএফ চায় দেশের জনগণের উপার্জিত অর্থ বিদেশে চলে যাক, দেশে একটা নির্ভরশীল অর্থনীতি তৈরি হোক। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে আইএমএফ চায় টেকসই নির্ভরশীল অর্থনীতি। এসব প্রতিষ্ঠান কিছুতেই টেকসই স্বনির্ভর অর্থনীতি চায় না। বরং বাংলাদেশের মতো দেশে যেন টেকসই স্বনির্ভর অর্থনীতি প্রতিষ্ঠিত না হয় তার জন্য আইএমএফ ‘নীতি সহায়তা’ দিয়ে চলছে। আমাদের সরকারকে বাধ্য করছে এ ধরনের ‘নীতি সহায়তা’ মেনে নিতে।
আইএমএফের এ নীতিসাম্রাজ্যবাদ বজায় থাকলে আর সরকার তা মেনে নিলে দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতি উভয়ই পর্যুদস্ত হতে বাধ্য। জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে এ ধরনের নীতিসাম্রাজ্যবাদ কিছুতেই টিকতে পারবে না। যে সরকার জনগণের অধিকার পূরণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, সেই সরকারকে আইএমএফের নীতি শিকল থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বেসরকারীকরণের নামে পাশ্চাত্য কোম্পানির স্বার্থরক্ষার জন্য সরকার নিজের সার্বভৌমত্ব বিকিয়ে দিতে পারে না। সরকারকে অবশ্যই স্বাধীন অর্থনীতির পথে চলতে হবে। সেজন্য দরকার রাষ্ট্র মেরামতের অঙ্গীকার। বিদেশী প্রতিষ্ঠানের আজ্ঞাবহ কেউ অর্থমন্ত্রী, বাণিজ্যমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হতে পারবে না। দেশের অর্থনীতিকে কৃষিবান্ধব ও শিল্পবান্ধব করতে হবে। কর্মসংস্থান বাড়াতে করণীয় ঠিক করতে হবে। দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সুদের হার নির্ধারণ করতে হবে সরকারিভাবে। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় কৃষি ঋণকে সহজ করতে হবে, স্বল্প সুদে শিল্প ঋণ নিশ্চিত করতে হবে। শিল্প-কারখানায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক করতে সরকারি প্রণোদনা বাড়াতে হবে। তদুপরি সরকারি ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতির লাগাম টেনে না ধরলে আইএমএফের রাজনীতির বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হয়ে পড়বে।
আইএমএফের নীতিসাম্রাজ্যবাদ থেকে মুক্তি এখন অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছে। আমরা যদি নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে স্বাধীন না হই আর দেশের ভবিষ্যৎ যদি স্বাধীন নীতির আলোকে না গড়ি, তাহলে আমাদের স্বাধীনতা আর উন্নয়ন কিছুই থাকবে না।
ড. আশেক মাহমুদ: সহযোগী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
মন্তব্য করুন