ঢাকা মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬, ১৭ চৈত্র ১৪৩৩
মুক্ত মনমুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

২৮ আগস্ট ১৯৭১: মোগরার বিল গণহত্যা (মোহনপুর, রাজশাহী)

প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
২৮ আগস্ট ২০২৫, ০৮:১০ পিএম
২৮ আগস্ট ২০২৫, ০৮:১৮ পিএম
২৮ আগস্ট ১৯৭১: মোগরার বিল গণহত্যা (মোহনপুর, রাজশাহী)

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের স্থানীয় সহযোগী রাজাকারদের দ্বারা অসংখ্য গণহত্যা ও নির্যাতন সংঘটিত হয়েছে, যা জাতির ইতিহাসে চিরকালীন কলঙ্ক হিসেবে অঙ্কিত। এরকম একটি বর্বর ঘটনা ঘটে রাজশাহী জেলার মোহনপুর উপজেলায় অবস্থিত মোগরার বিলে। এই গণহত্যা সংঘটিত হয় ২৮ আগস্ট ১৯৭১ সালে, রোববার রাতে। রাজাকারদের সহায়তায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বেশ কয়েকজন নিরীহ মানুষকে ধরে এনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী চরম নির্যাতনের পর অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে এবং লাশগুলো বিলের মধ্যে ফেলে দেয়। এই ঘটনা রাজশাহী অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি পৈশাচিক অধ্যায় হিসেবে পরিচিত, যা পাকিস্তানি বাহিনীর নারকীয় মানসিকতার প্রতিফলন।

ঘটনার পটভূমি এবং স্থানের বর্ণনা

মোগরার বিল অবস্থিত কেশরহাট হাইস্কুলের পূর্বদিকে। মুক্তিযুদ্ধের সময় এই বিলের চারপাশ নানা গাছগাছালিতে ভরা ছিল, এবং আশপাশে তেমন জনবসতি ছিল না। এ কারণে এই অঞ্চলে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং রাজাকারদের অবাধ যাতায়াত ছিল, যা তাদের জন্য নিরাপদ স্থান হিসেবে কাজ করত। মোহনপুর উপজেলা রাজশাহী জেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকা, যেখানে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনী বিভিন্ন ক্যাম্প স্থাপন করে স্থানীয়দের উপর অত্যাচার চালাত। এই গণহত্যার ঘটনা ঘটে মোহনপুর থানা শান্তি কমিটির সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে, যা পাকিস্তানি বাহিনীর স্থানীয় সহযোগীদের দ্বারা পরিচালিত হয়।

ক্রমানুসার ঘটনা বর্ণনা

ঘটনার দিন, সাঁকোয়া রাজাকার ক্যাম্পের কমান্ডার আব্দুল মহেতের নেতৃত্বে রাজাকাররা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বেশ কয়েকজন মানুষকে ধরে এনে মোগরার বিলে নিয়ে আসে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সহায়তায় তাদের উপর অকথ্য নির্যাতন চালানো হয়। প্রথমে তাদের গাছের সঙ্গে বেঁধে চাবুক মারা হয়, যা তাদের শরীরে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে। এরপর পায়ের পাতায় পেরেক মেরে গাছের সঙ্গে আটকে রাখা হয়, যাতে তারা পালাতে না পারে এবং যন্ত্রণায় ছটফট করে। নির্যাতনের চরম পর্যায়ে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে তাদের বুক চিড়ে কলিজা বের করে ফেলা হয়, যা একটি অত্যন্ত পৈশাচিক কাজ। এভাবে চরম নির্যাতন শেষে তাদের হত্যা করা হয়। হত্যার পর লাশগুলো বস্তাবন্দি করে গভীর রাতে মোগরার বিলের মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়, যাতে প্রমাণ লোপাট হয়ে যায়। এই সম্পূর্ণ ঘটনা রাজাকার এবং পাকিস্তানি বাহিনীর যৌথ অভিযানের ফল, যা মুক্তিযোদ্ধাদের সমর্থকদের লক্ষ্য করে পরিকল্পিতভাবে সংঘটিত হয়।

শহিদদের তালিকা

মোগরার বিল গণহত্যায় শহিদদের মধ্যে যাদের নাম জানা গেছে, তারা হলেন:

  • মো. শুকুর আলী (পিতা: শহরুল্লাহ প্রামাণিক, গ্রাম: থানাগ্রাম, খালগ্রাম, বাগমারা)
  • শহীদ ফকির প্রামাণিক (পিতা: শহরুল্লাহ প্রামাণিক, গ্রাম: থানাগ্রাম, খালগ্রাম, বাগমারা)
  • নগেন্দ্রনাথ (গ্রাম: সইপাড়া, মোহনপুর)
  • পিয়ার বক্স (গ্রাম: সালন্দি, বাগমারা)
  • সহিবুদ্দিন (গ্রাম: সারন্দো, বাকশিমাইল, মোহনপুর)
  • দানবক্স (পিতা: কলিম, গ্রাম: নারায়ণপাড়া, খালগ্রাম, বাগমারা)
  • এনায়েত (গ্রাম: আলুপাড়া)

এই নিহতরা মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক ছিলেন, এবং তাদের হত্যা করে পাকিস্তানি বাহিনী এলাকায় ভীতি সৃষ্টি করতে চেয়েছিল।

স্মৃতি এবং সংরক্ষণ

প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, মোগরার বিল গণহত্যার স্থানে কোনো সুনির্দিষ্ট স্মৃতিসৌধ বা নামফলক নির্মিত হয়নি বলে উল্লেখ নেই। তবে, এই ঘটনা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে স্থান পেয়েছে এবং স্থানীয়ভাবে স্মরণ করা হয়। রাজশাহী অঞ্চলের অন্যান্য গণহত্যার স্থানগুলোর মতো এটিও সংরক্ষণের দাবি রাখে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই নির্যাতনের ইতিহাস জানতে পারে।

সূত্র:

বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ ৮ম খণ্ড

আখতারুজ্জাহান

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

৩০ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন ও বিশ্ববিবেকের জাগরণ

ইতিহাসের অবিনশ্বর নক্ষত্র: শহীদ শাফী ইমাম রুমী

২৯ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন ও আত্মাহুতির এক নৃশংস অধ্যায়

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা,আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশ

২৮ মার্চ ১৯৭১: ধ্বংসযজ্ঞের ছাপ আর বাঙালির সুসংগঠিত প্রতিরোধ

২৭ মার্চ ১৯৭১: বিশ্ব জানল, বাংলাদেশ স্বাধীন

২৬ মার্চ ১৯৭১: একটি জাতির রক্তক্ষয়ী সূর্যোদয় ও স্বাধীনতার ঘোষণা

গণহত্যার বিরুদ্ধে শৈল্পিক প্রতিবাদ / ২৫শে মার্চের কালরাত্রি স্মরণে প্রাচ্যনাটের ‘লালযাত্রা’

২৫ মার্চ, ১৯৭১: ইতিহাসের কলঙ্কিত কালরাত ও বিভীষিকাময় গণহত্যা

২৪ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন আর চূড়ান্ত প্রস্তুতির দিন

১০

২৫ মার্চের গণহত্যা স্মরণে ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দাবিতে ‘আলোর মিছিল’

১১

২৫ মার্চ ১৯৭১: গণহত্যার কালরাত্রি ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির লড়াই

১২

জামায়াতকে বিচারের আওতায় আনার দাবি / একাত্তরের গণহত্যা স্বীকৃতির প্রস্তাব মার্কিন কংগ্রেসে

১৩

২৩ মার্চ ১৯৭১: যেদিন পাকিস্তান দিবস হলো প্রতিরোধের নামে

১৪

২২ মার্চ ১৯৭১: আপসহীন সংগ্রামের ঘোষণা এবং ইয়াহিয়ার নতুন চাল

১৫

২১ মার্চ ১৯৭১: নীতির প্রশ্নে আপসহীন বঙ্গবন্ধু এবং ঘনীভূত সামরিক মেঘ

১৬

২০ মার্চ ১৯৭১: টেবিলে আশার আলো, অন্তরালে গণহত্যার নীল নকশা

১৭

১৯ মার্চ ১৯৭১: সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের প্রথম স্ফুলিঙ্গ ও বীরত্বগাঁথা

১৮

১৮ মার্চ ১৯৭১: জান্তার তদন্ত কমিটি প্রত্যাখ্যান ও বঙ্গবন্ধুর ডাক

১৯

১৭ মার্চ ১৯৭১: ‘নরকে বসেও হাসতে পারি’, বঙ্গবন্ধুর বজ্রশপথ

২০