

১৯৭১ সালের ২৫ এপ্রিল। ক্যালেন্ডারের পাতায় এটি কেবল একটি সাধারণ তারিখ নয়, জয়পুরহাটবাসীর জন্য এটি এক গভীর শোক ও আতঙ্কের দিন। স্বাধীনতাকামী বাঙালির ওপর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নৃশংস গণহত্যা শুরুর দিন হিসেবে এই দিনটি স্থানীয় ইতিহাসে কালো অধ্যায় হয়ে আছে। স্বাধীনতার এত বছর পরও স্বজন হারানো পরিবারের সদস্যদের চোখে সেই বিভীষিকাময় স্মৃতি আজও জীবন্ত।
প্রতিরোধ ও হানাদারদের আগমন
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পর থেকেই জয়পুরহাটে শুরু হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি। আওয়ামী লীগ, ন্যাপ (মোজাফফর) ও কমিউনিস্ট পার্টির নেতাকর্মীরা স্থানীয় সাধারণ মানুষকে সাথে নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন প্রতিরোধ। পাকিস্তানি সেনাদের বাধা দিতে আক্কেলপুর স্টেশনের অদূরে হলহলিয়া রেলওয়ে ব্রিজের একাংশ বিস্ফোরক দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া হয়। কাটা হয় রেললাইন এবং জয়পুরহাট-বগুড়া সড়কের হাড়াইল ছোট ব্রিজটি ডিনামাইট দিয়ে ধ্বংস করা হয়।
কিন্তু এতসব প্রতিরোধ সত্ত্বেও, ২৪ এপ্রিল শনিবার মধ্যরাতে ট্রেনযোগে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী জয়পুরহাটে প্রবেশ করে। তারা প্রথমে রেলওয়ে স্টেশনে ক্যাম্প স্থাপন করে এবং ২৫ এপ্রিল ভোর থেকে শুরু করে শহরজুড়ে তাণ্ডব ও গণহত্যা।
নির্বিচারে গণহত্যা: এক রক্তাক্ত ইতিহাস
২৫ এপ্রিল খুব সকালে পাকিস্তানি সেনারা জয়পুরহাট থানা দখল করে। এদিন প্রথম আঘাতেই থানায় ২০ থেকে ২২ জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এরপর শুরু হয় পরিকল্পিত হত্যাযজ্ঞ। শহরের সিমেন্ট ফ্যাক্টরি এলাকা, হাতিল-বুলুপাড়া এবং চকগোপাল মৌজার গাড়িয়াকান্ত এলাকায় ৩৬ জনকে ধরে নিয়ে গিয়ে প্রথমে গর্ত খুঁড়তে বাধ্য করা হয়। পরে তাদের সারিবদ্ধভাবে গুলি করে সেই গর্তেই মাটিচাপা দেওয়া হয়। হাতিল-বুলুপাড়ায় একই পরিবারের ৮ জনসহ ১৭ জন এবং চিনিকল সংলগ্ন বুলুপাড়া মাঠে ১০ জনকে একইভাবে হত্যা করে হায়েনারা।
তৎকালীন ছাত্রনেতা তবিবর রহমানের বর্ণনা অনুযায়ী, জয়পুরহাট সরকারি কলেজে প্রশিক্ষণরত মুক্তিযোদ্ধাদের খাবার সরবরাহের ‘অপরাধে’ পাঁচুরচক এলাকার লুৎফর রহমানকে ধরে নিয়ে গিয়ে কয়লা ইঞ্জিনের ভেতর ঢুকিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। এছাড়া দর্জি নাজির হোসেন, আব্দুস সালাম এবং রাম কুমার খেতানের মতো অসংখ্য সাধারণ মানুষকে সেদিন নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল।
সহযোগীদের ভূমিকা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি
মুক্তিযুদ্ধকালীন ডেপুটি কমান্ডার জাকারিয়া হোসেন মন্টুর ভাষ্যমতে, জয়পুরহাটের এই ভয়াবহ গণহত্যা পরিচালিত হয়েছিল তৎকালীন শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান আব্দুল আলীম ও আব্বাস আলী খানের প্রত্যক্ষ মদদে। স্থানীয় রাজাকার ও আলবদর বাহিনীর সহায়তায় হানাদাররা শহরজুড়ে ত্রাস সৃষ্টি করেছিল।
১৯৭২ সালে দালাল আইনে মামলা হলে আব্দুল আলীমসহ স্থানীয় কয়েকজন যুদ্ধাপরাধীকে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু ১৯৭৫ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সাজা মওকুফ হওয়ায় তারা কারাগার থেকে মুক্তি পায়। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি জয়পুরহাটবাসীর মনে গভীর ক্ষোভের জন্ম দিয়েছিল।
বর্তমান প্রেক্ষাপট ও দাবি
মুক্তিযোদ্ধা সংসদ জয়পুরহাট ইউনিটের সাবেক কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা আমজাদ হোসেন বলেন, “দীর্ঘ সময় পার হলেও আমাদের দাবি ছিল সঠিক ইতিহাসের বিচার। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আমাদের ক্ষতস্থানে কিছুটা প্রলেপ দিয়েছে।” মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও গবেষক আমিনুল হক বাবুল মনে করেন, বধ্যভূমিগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও এর ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা এখন সময়ের দাবি।
আজও জয়পুরহাটের মাটিতে মিশে আছে শহীদদের রক্ত। প্রতিটি বধ্যভূমি যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতার জন্য কত বড় মূল্য দিতে হয়েছে এ দেশের মানুষকে।
মন্তব্য করুন