

২০ এপ্রিল ১৯৭১। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে এটি একটি ঘটনাবহুল ও তাৎপর্যময় দিন। এই দিনে একদিকে যেমন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে রণাঙ্গনে বীরত্বপূর্ণ লড়াই ও চরম ত্যাগের দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে, অন্যদিকে প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন ও কূটনৈতিক অগ্রগতির চিত্র দৃশ্যমান হয়েছে। তবে একই সাথে অবরুদ্ধ ঢাকায় পাকিস্তানি দোসরদের তৎপরতা ও জনমনে ভীতি সৃষ্টির প্রচেষ্টা ছিল অব্যাহত।
বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সি আব্দুর রউফের আত্মত্যাগ
২০ এপ্রিল খাগড়াছড়ির মহালছড়ি ও রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলার সীমান্তে কাপ্তাই লেক জলপথটি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য পাকিস্তানি বাহিনী মরিয়া হয়ে ওঠে। পাকিস্তানি এসএসজি (স্পেশাল সার্ভিস গ্রুপ) কমান্ডোরা সাতটি স্পিডবোট ও দুইটি লঞ্চ নিয়ে বুড়িঘাটে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানের ওপর আক্রমণ চালায়।
বীরত্বগাঁথা: অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সিপাহি মুন্সি আব্দুর রউফ একাই মেশিনগান নিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। তাঁর অসীম সাহসিকতায় হানাদারদের সাতটি স্পিডবোট ডুবে যায় এবং লঞ্চগুলো পিছু হটতে বাধ্য হয়।
সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ: হানাদারদের মর্টারের গোলার আঘাতে তাঁর বাঙ্কার বিধ্বস্ত হয় এবং তিনি শহীদ হন। তবে তাঁর এই আত্মত্যাগের ফলে কোম্পানির প্রায় ১৫০ জন মুক্তিযোদ্ধা নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সময় পান। এই বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ের জন্য তিনি মরণোত্তর ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ উপাধিতে ভূষিত হন।
কূটনৈতিক বিজয় ও আন্তর্জাতিক সমর্থন
একাত্তরের এই দিনে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে কূটনৈতিক সফলতা ছিল চোখে পড়ার মতো:
কূটনৈতিক আনুগত্য: ভারতের নয়াদিল্লিতে পাকিস্তান হাইকমিশনের দুজন বাঙালি কূটনীতিক—শিহাবউদ্দিন ও আমজাদুল ইসলাম—পাকিস্তানি দূতাবাস থেকে পদত্যাগ করে মুজিবনগর সরকারের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন এবং রাজনৈতিক আশ্রয় নেন।
দূতাবাস পুনর্গঠন: কলকাতাস্থ প্রাক্তন পাকিস্তান হাইকমিশন থেকে ৩০ জন পাকিস্তানি ও অবাঙালি কর্মচারীকে বহিষ্কার করে সেখানে প্রবাসী সরকারের কার্যক্রম সুসংহত করা হয়।
আন্তর্জাতিক প্রচারণা: ‘ফ্রেন্ডস অব বাংলাদেশ’ নামক সংগঠনটি ‘পূর্ব পাকিস্তানকে বাঁচানো সম্ভব’ শিরোনামে প্রচারপত্র প্রকাশ করে। ফরাসি পত্রিকা লা মঁদ (Le Monde) বাংলাদেশে প্রবাসী সরকারের শপথ গ্রহণের খবর গুরুত্বের সাথে প্রচার করে, যা বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের স্বাধীনতার দাবিকে জোরালো করে।
অবরুদ্ধ ঢাকা ও দোসরদের অপতৎপরতা
পাকিস্তানি সামরিক জান্তা টিক্কা খান এই দিনে প্রবাসী সরকারের শীর্ষ নেতাদের (তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলামসহ অন্যান্য) ২৬ এপ্রিল সামরিক আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়ে তাঁদের কোণঠাসা করার চেষ্টা করেন।
শান্তি কমিটির আস্ফালন: খাজা খয়েরউদ্দিনের সভাপতিত্বে ঢাকা কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটির বৈঠকে গোলাম আযম, আবুল কাশেম ও মাহমুদ আলীদের সারা দেশে কমিটি গঠনের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
মিছিল ও প্রচারণা: শান্তি কমিটি ও নেজামে ইসলাম পার্টির উদ্যোগে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে মিছিল বের করা হয়। মিছিলে “পাকিস্তান বাঁচাও ভারত হঠাও”, “ভারতের দালাল হুশিয়ার” ইত্যাদি উসকানিমূলক স্লোগান দেওয়া হয়। এই গোষ্ঠীগুলো বিদেশি গণমাধ্যমকে ভুল তথ্য দিয়ে দেশ ‘শান্ত ও স্বাভাবিক’—এই মিথ্যা প্রচারণা চালাতে থাকে।
রণাঙ্গনের পরিস্থিতি ও প্রতিরোধ যুদ্ধ
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাকবাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের তীব্র সংঘর্ষ হয়:
হিলি (দিনাজপুর): ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পাকবাহিনীর সাথে যুদ্ধে ৬ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে ২৫০ জন মুক্তিযোদ্ধা কৌশলগত কারণে ভারতের কামালপাড়ায় স্থানান্তরিত হন।
সিলেট: শেওলা ফেরীঘাটে হামলায় পাকবাহিনীর ৮ জন সৈন্য নিহত হয় এবং মুক্তিযোদ্ধারা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে ফেরীঘাট ধ্বংস করেন।
মিরসরাই (চট্টগ্রাম): পাকবাহিনীর ট্যাংক আক্রমণের মুখে মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটে মাস্তান নগরে নতুন প্রতিরক্ষা ব্যূহ তৈরি করেন।
উল্লাপড়া (সিরাজগঞ্জ): ঘাটিনা রেলওয়ে ব্রিজের যুদ্ধে ২০ জনের অধিক পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়।
রাজনৈতিক সমর্থন
ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ এদিন এক বিবৃতিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ঘোষণা করেন। তিনি বিশ্বের সকল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রতি এই সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির আহ্বান জানান।
২০ এপ্রিল ১৯৭১ ছিল দেশপ্রেমিক বাঙালির জন্য একদিকে শোকের, অন্যদিকে অদম্য সাহস প্রদর্শনের দিন। একদিকে ষড়যন্ত্রকারীদের ঘৃণ্য কর্মকাণ্ড, অন্যদিকে রণাঙ্গনে মুন্সি আব্দুর রউফের মতো অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ—এই দুই বিপরীতমুখী স্রোত বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে চূড়ান্ত লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল।
তথ্যসূত্র
১. বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র (একাদশ ও দ্বাদশ খণ্ড)।
২. বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: সেক্টর ভিত্তিক ইতিহাস (সেক্টর ২, ৭ ও ৮)।
৩. দৈনিক পাকিস্তান (২১ এপ্রিল, ১৯৭১)।
৪. অমৃত বাজার পত্রিকা (২১ এপ্রিল, ১৯৭১)।
মন্তব্য করুন