

বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এমন কিছু নাম রয়েছে, যাদের সাহসিকতা আর আত্মত্যাগ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে অনুপ্রেরণার আলোকবর্তিকা হয়ে জ্বলে থাকে। সেই উজ্জ্বল নক্ষত্রদের একজন বীরশ্রেষ্ঠ ল্যান্স নায়েক মুন্সি আব্দুর রউফ। ১৯৭১ সালের ২০ এপ্রিল রাঙ্গামাটির নানিয়ারচরের বুড়িঘাটে পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে এক অসম যুদ্ধে তিনি যে বিরোচিত দৃঢ়তা প্রদর্শন করেছিলেন, তা বিশ্ব সামরিক ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
জন্ম ও বেড়ে ওঠা
মুন্সি আব্দুর রউফ ১৯৪৩ সালের ১ মে ফরিদপুর জেলার (বর্তমান রাজবাড়ী) মধুখালী উপজেলার সালামতপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম মুন্সি মেহেদী হাসান এবং মায়ের নাম মুকিদুননেসা। শৈশব থেকেই রউফ ছিলেন অত্যন্ত সাহসী ও শান্ত স্বভাবের। পড়াশোনা শেষ করে জীবনের লক্ষ্য স্থির করেছিলেন দেশসেবার। সেই ব্রত নিয়ে ১৯৬৩ সালের ৮ মে তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসে (ইপিআর) যোগ দেন।
রণাঙ্গনে রউফ
১৯৭১ সালের মার্চ মাসে যখন পাকিস্তানি বাহিনী বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তখন আব্দুর রউফ অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সাথে পার্বত্য চট্টগ্রামে কর্মরত ছিলেন। স্বাধীনতার ডাক আসার পর তিনি কোনো দ্বিধা না করে রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। রাঙ্গামাটি ও মহালছড়ি অঞ্চলের জলপথ ছিল রণকৌশলের দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই পথ রক্ষায় অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি দলের সাথে তিনি বুড়িঘাটে প্রতিরক্ষা অবস্থানে নিয়োজিত ছিলেন।
২০ এপ্রিলের সেই মহাকাব্যিক লড়াই
সেদিন ছিল ২০ এপ্রিল ১৯৭১। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বিপুল অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে সাতটি স্পিডবোট ও দুটি লঞ্চে করে কাপ্তাই লেক হয়ে এগিয়ে আসছিল মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানে। পাকিস্তানি বাহিনীর লক্ষ্য ছিল জলপথ দখল করে নেওয়া। তাদের আক্রমণের তীব্রতায় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরক্ষা ব্যূহ ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়। সহযোদ্ধারা যখন চারদিক থেকে ঘেরাও হয়ে যাচ্ছিলেন, তখন রউফ বুঝতে পারেন, এ যাত্রায় পিছু না হটলে সবাই মারা পড়বেন।
সহযোদ্ধাদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার সুযোগ করে দিতে তিনি একাই বাঙ্কারে থেকে যান। মেশিনগান হাতে তিনি পাকিস্তানি স্পিডবোটগুলোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। তাঁর নির্ভুল নিশানায় সাতটি স্পিডবোট ডুবে যায় এবং শত্রুসৈন্যদের লঞ্চগুলো পিছু হটতে বাধ্য হয়। কিন্তু শত্রুসেনারা তখন মরিয়া। তারা দূরে অবস্থান নিয়ে মর্টারের গোলাবর্ষণ শুরু করে। একটি গোলার আঘাতে রউফের বাঙ্কার বিধ্বস্ত হয় এবং তিনি শাহাদাতবরণ করেন।
তাঁর এই আত্মত্যাগের ফলে কোম্পানির প্রায় ১৫০ জন মুক্তিযোদ্ধা প্রাণে বেঁচে যান এবং পরবর্তী রণকৌশল সাজানোর সময় পান। এটি ছিল একটি আত্মদান, যা রণাঙ্গনে এক নতুন লড়াইয়ের জন্ম দেয়।
চূড়ান্ত স্বীকৃতি
স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের গেজেট নোটিফিকেশন অনুযায়ী, অসীম সাহসিকতা ও আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ সরকার তাঁকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ উপাধিতে ভূষিত করে। মৃত্যুর পর তাঁকে বুড়িঘাটের কাছেই সমাহিত করা হয়। সেখানে আজও তাঁর স্মৃতিচিহ্ন বহন করছে বীরের সমাধি।
বীরের উত্তরাধিকার
মুন্সি আব্দুর রউফ কেবল একজন সেনাসদস্য ছিলেন না; তিনি ছিলেন বাঙালি জাতির অদম্য সাহসের প্রতীক। তাঁর জীবনী থেকে আজকের প্রজন্ম শিখতে পারে, দেশের প্রয়োজনে ব্যক্তিগত জীবনের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে দেশপ্রেম। তিনি আজ আর আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া ত্যাগের মহিমা প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে গেঁথে আছে।
প্রতি বছর ২০ এপ্রিল এলে কৃতজ্ঞ জাতি সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করে সেই অকুতোভয় মহানায়ককে, যিনি নিজের প্রাণ দিয়ে বাঁচিয়েছিলেন অসংখ্য সহযোদ্ধা আর লাল-সবুজের পতাকার মান।
বিশেষ তথ্যসূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র, সেক্টর ভিত্তিক ইতিহাস ও বীরশ্রেষ্ঠদের জীবনী আর্কাইভ।
মন্তব্য করুন