ঢাকা মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬, ১৬ আষাঢ় ১৪৩৩
মুক্ত ভাবনামুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

রক্ষাকালী মন্দির গণহত্যা: পাবনার এক রক্তাক্ত অধ্যায়

প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
১১ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৫৭ পিএম
১১ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:০২ পিএম
রক্ষাকালী মন্দির গণহত্যা: পাবনার এক রক্তাক্ত অধ্যায়

১৯৭১ সালের ১১ এপ্রিল। চারিদিকে যুদ্ধের দামামা, আকাশে বারুদের গন্ধ। এই দিনেই পাবনা সদর উপজেলার জিলাপাড়া এলাকায় রক্ষাকালী মন্দিরের সামনে সংঘটিত হয়েছিল এক বর্বরোচিত গণহত্যা। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্বিচার গুলিতে সেদিন শহীদ হয়েছিলেন ২০ থেকে ২৫ জন নিরপরাধ মানুষ। যাঁদের অপরাধ ছিল কেবল স্বাধীন দেশের স্বপ্ন দেখা অথবা প্রাণভয়ে ঈশ্বরকে স্মরণ করা।

ঘটনার প্রেক্ষাপট

ঐদিন বিকেলবেলা পাকিস্তানি বাহিনীর একটি বিশাল বহর পাবনা শহরে প্রবেশ করে। শহর দখলের নেশায় তারা কয়েকটি দলে বিভক্ত হয়ে পুলিশ লাইন্স, সার্কিট হাউস এবং বিসিক এলাকার দিকে অগ্রসর হতে থাকে। ঘাতকদের একটি দল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট পার হয়ে ফজলুল রোড দিয়ে রক্ষাকালী মন্দিরের তিন মাথার মোড়ে এসে পৌঁছায়।

মন্দিরে আশ্রয় ও নির্মম হত্যাকাণ্ড

সে সময় প্রাণভয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা ডা. বিহারীলাল সাহার ‘গোবিন্দ বাড়ি’ মন্দিরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। কেউবা লুকিয়েছিলেন আশপাশের ঝোপঝাড়ে বা রাস্তার ধারের ঘরে। পাকিস্তানি সৈন্যরা প্রতিটি ঘর তল্লাশি করে সবাইকে টেনেহিঁচড়ে বের করে আনে। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকে রক্ষাকালী মন্দিরের সামনে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করানো হয়। মুহূর্তের মধ্যেই গর্জে ওঠে ঘাতকদের স্বয়ংক্রিয় রাইফেল। গুলিতে লুটিয়ে পড়েন ২০ থেকে ২৫ জন মানুষ। রক্তে ভেসে যায় পবিত্র মন্দিরের প্রাঙ্গণ।

শহীদ ও সৌভাগ্যবান বেঁচে যাওয়া কজন

এই গণহত্যাকাণ্ডে শহীদদের মধ্যে হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ ছিলেন। শহীদদের মধ্যে যাদের পরিচয় পাওয়া গেছে তারা হলেন:

মো. আশরাফ আলী আক্কেল (মনোহরী ব্যবসায়ী)

মো. আকবর আলী (দর্জি)

মো. আফছার আলী (পুলিশ সদস্য)

মো. মোশারফ হোসেন মুশা (ব্যবসায়ী)

অ্যাডভোকেট মো. শফিউদ্দিন

মো. নূরুল হক (জেল পুলিশ)

মো. শফিউন্নবী সূর্য (ড্রাইভার)

মো. হারুনর রশিদ (কাঠমিস্ত্রি)

বিভূতিভূষণ সাহা (ঔষধ ব্যবসায়ী)

এতবড় নৃশংসতার মাঝেও অলৌকিকভাবে গুলিবিদ্ধ হয়ে বেঁচে গিয়েছিলেন বিচ্ছু ওরফে ভেগু এবং বদর উদ্দিন শেখ চেরু নামের দুজন ব্যক্তি।

সৎকার ও গণকবর

গণহত্যার পর গভীর রাতে জিলাপাড়ার সাহসী কিছু মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শহীদদের লাশ উদ্ধারে আসেন। তারা মুসলিম শহীদদের লাশগুলো রক্ষাকালী মন্দিরের পাশের মনসেফ বাবু রোডে (বর্তমান শহীদ মওলানা কছিম উদ্দিন রোড) একটি গণকবরে সমাহিত করেন। তবে হিন্দু শহীদদের সৎকার করা সম্ভব হয়নি। অনেকদিন ধরে তাঁদের মরদেহগুলো মন্দির প্রাঙ্গণেই পড়ে ছিল, যা পরে শিয়াল-কুকুর ও শকুনের খাদ্যে পরিণত হয়। ডা. বিহারীলাল সাহার পুত্র বিভূতিভূষণ সাহার মরদেহটি সেখানেই পচে গলে মাটির সাথে মিশে গিয়েছিল।

স্মৃতিসৌধ ও বর্তমান অবস্থা

দেশ স্বাধীনের পর বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল ইসলাম বকুলের বিশেষ উদ্যোগে মনসেফ বাবু রোডের সেই গণকবরের স্থানে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়। যা আজও দাঁড়িয়ে আছে ১১ এপ্রিলের সেই ভয়াবহ স্মৃতির সাক্ষী হয়ে।

রক্ষাকালী মন্দির গণহত্যা পাবনার মানুষের কাছে এক অবিস্মরণীয় শোকের দিন। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, স্বাধীনতার সূর্য ছিনিয়ে আনতে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ নিজের রক্ত বিলিয়ে দিয়েছিলেন। আজ ৫৬ বছর পর সেই পবিত্র রক্তে ভেজা মন্দির ও গণকবর আমাদের মনে করিয়ে দেয় আত্মত্যাগের মহিমা।

তথ্যসূত্র

বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ, ৯ম খণ্ড (এশিয়াটিক সোসাইটি)

স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ভাষ্য ও নথিপত্র

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

৭ শিল্প অঞ্চলে ৪৫৭ কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ, বিপাকে তৈরি পোশাক খাত

বোবা কান্নার মেঘনা ও আমাদের মরে যাওয়া মনুষ্যত্ব

একের পর এক ‘মিথ্যা’ মামলা, আদালতে ক্ষোভ প্রকাশ করলেন মিষ্টি সুবাস

ভেনেজুয়েলায় জোড়া ভূমিকম্প: আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জরুরি সহায়তা চাইল জাতিসংঘ

তিন মেয়েসহ মাকে কুপিয়ে হত্যা, গণপিটুনিতে ঘাতক নিহত

ভেনেজুয়েলায় ১২৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্প

২৩ জুন ১৯৭১: আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তোলপাড় এবং প্রতিরোধ যুদ্ধের উত্তাল দিন

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগ

২২ জুন ১৯৭১: নিষেধাজ্ঞা ভেঙে পাকিস্তানে মার্কিন সমরাস্ত্রের চালান

ইরানের ঘোষণার পর হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্থবির

১০

চাঁদাবাজির অভিযোগে আটক এমপিপুত্র সজীব মুচলেকা দিয়ে মুক্ত

১১

তরুণ সমাজকে গ্রাস করছে নতুন প্রজন্মের সিনথেটিক ড্রাগস

১২

২১ জুন ১৯৭১: রণাঙ্গনে প্রতিরোধ যুদ্ধ, যুক্তরাজ্য ও ভারতের যৌথ বিবৃতি

১৩

১৮ জুন ১৯৭১: ঢাকায় দুঃসাহসিক গেরিলা আক্রমণ, কান্দাপাড়া গণহত্যা এবং রণাঙ্গনের প্রতিরোধ

১৪

বাবা নাকি ৭১-এর শহীদ, অথচ জামায়াত এমপির জন্ম ১৯৮১ সালে

১৫

আলজেরিয়াকে উড়িয়ে আর্জেন্টিনার শুভ সূচনা

১৬

১৭ জুন ১৯৭১: জগদীশপুর গণহত্যা, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কূটনৈতিক যুদ্ধ এবং প্রতিরোধ

১৭

১১ জুন ১৯৭১: বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের পক্ষে সংহতি

১৮

সরকারের প্রথম ১০০ দিনে ৬০৫ খুন

১৯

৭ জুন ১৯৭১: বিশ্বমঞ্চে কূটনৈতিক তৎপরতা ও অবরুদ্ধ বাংলায় প্রতিরোধ

২০