ঢাকা বুধবার, ০১ এপ্রিল ২০২৬, ১৮ চৈত্র ১৪৩২
মুক্ত মনমুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

৩১ মার্চ ১৯৭১: নাথপাড়ার রক্তগঙ্গা ও বিশ্ববিবেকের গর্জন

প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ৩১ মার্চ ২০২৬, ০৫:৪৭ পিএম
৩১ মার্চ ১৯৭১: নাথপাড়ার রক্তগঙ্গা ও বিশ্ববিবেকের গর্জন

১৯৭১ সালের ৩১ মার্চ ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক নৃশংসতম অথচ কূটনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দিন। একদিকে চট্টগ্রামে দখলদার পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসররা মেতে উঠেছিল বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞে, অন্যদিকে প্রতিবেশী দেশ ভারত ও বিশ্ব গণমাধ্যম ঢাকার গণহত্যা নিয়ে সোচ্চার হয়ে উঠেছিল।

১. চট্টগ্রামের প্রথম গণহত্যা: মধ্যম নাথপাড়া বধ্যভূমি

৩১ মার্চ চট্টগ্রামের হালিশহরের মধ্যম নাথপাড়ায় সংঘটিত হয় মুক্তিযুদ্ধের শুরুর দিকের অন্যতম ভয়াবহ গণহত্যা। ২৫ মার্চ থেকে হালিশহর ইপিআর ঘাঁটি থেকে মেজর রফিকের নেতৃত্বে বাঙালি সেনারা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, যেখানে স্থানীয় নাথপাড়াবাসী তাঁদের খাদ্য ও আশ্রয় দিয়ে সহযোগিতা করেন। এর প্রতিশোধ নিতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও স্থানীয় অবাঙালি বিহারিরা নাথপাড়ায় আক্রমণ চালায়। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে কুড়াল, কিরিচ ও রামদা দিয়ে কুপিয়ে ৪০ জন ইপিআর সদস্য এবং ৩৯ জন নিরপরাধ গ্রামবাসীকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।

২. ভারতের লোকসভায় ঐতিহাসিক সংহতি প্রস্তাব

এই দিনটি বাংলাদেশের কূটনৈতিক যুদ্ধের ইতিহাসে এক মাইলফলক। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী লোকসভায় (পার্লামেন্টে) বাংলাদেশের জনগণের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের প্রতি একাত্মতা ঘোষণা করে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। এই প্রস্তাবে বলা হয়:

পূর্ববঙ্গের জনগণের ওপর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আধুনিক মরণাস্ত্রের (ট্যাংক, কামান ও বিমান) ব্যবহার নজিরবিহীন বর্বরতা।

১৯৭০ সালের নির্বাচনের ম্যান্ডেটকে অবজ্ঞা করে পাকিস্তান সরকার যে গণহত্যা চালাচ্ছে, ভারত তাতে নির্লিপ্ত থাকতে পারে না।

বিশ্বের সমস্ত রাষ্ট্র ও সরকারকে অবিলম্বে এই পরিকল্পিত গণহত্যা বন্ধে পাকিস্তানের ওপর চাপ সৃষ্টির আহ্বান জানানো হয়।

৩. তাজউদ্দীন আহমদের সীমান্ত অতিক্রম

মুক্তিযুদ্ধকে একটি সুসংগঠিত রূপ দিতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ এবং ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম ৩১ মার্চ মেহেরপুর সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। এটি ছিল প্রবাসী সরকার গঠন এবং আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে এক ঐতিহাসিক যাত্রা।

৪. বিশ্ব গণমাধ্যমের কঠোর প্রতিক্রিয়া: ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর সম্পাদকীয়

লন্ডনের প্রখ্যাত পত্রিকা ‘দ্য গার্ডিয়ান’ ৩১ মার্চ তাদের সম্পাদকীয়তে ‘পাকিস্তানে হত্যাকাণ্ড’ শিরোনামে কঠোর সমালোচনা প্রকাশ করে। পত্রিকাটির মতে:

প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান গণতন্ত্রের কথা বলে শেখ মুজিবের সাথে আলোচনার নামে মূলত জেনারেলদের গণহত্যার সুযোগ করে দিয়েছেন।

জুলফিকার আলী ভুট্টোর মতো নেতারা এই বিভৎস হত্যাযজ্ঞকে সমর্থন জানিয়ে মানবতাকে পদদলিত করেছেন।

আমেরিকা, চীন ও শ্রীলঙ্কাকে সতর্ক করে দিয়ে পত্রিকাটি বলে, পশ্চিম পাকিস্তানের এই নৃশংসতায় তাদের মদত দেওয়া উচিত নয়। সম্পাদকীয়তে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয় যে, "মধুর ভাষা দিয়ে মানবতার বিরুদ্ধে এই অপরাধ ঠেকানো যাবে না।"

৫. মানবিক বিপর্যয় ও শরণার্থী সংকট

পাকিস্তানি বাহিনীর তাণ্ডব থেকে জীবন বাঁচাতে এদিন সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া মানুষের সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়ে যায়। ঘরবাড়ি ও প্রিয়জন হারিয়ে রিক্তহস্তে মানুষের এই দেশত্যাগ সমকালীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক বিপর্যয় হিসেবে চিহ্নিত হয়।

৩১ মার্চ ১৯৭১ ছিল একদিকে স্বজন হারানো আর্তনাদ আর অন্যদিকে বিশ্বজুড়ে সংহতির দিন। নাথপাড়ার রক্তস্রোত যেমন বাঙালির ত্যাগের মহিমাকে আকাশচুম্বী করেছিল, তেমনি ইন্দিরা গান্ধীর লোকসভার ভাষণ এবং ‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর সম্পাদকীয় বিশ্ববাসীর চোখ খুলে দিয়েছিল। এই দিনটিই নিশ্চিত করেছিল যে, বাঙালির এই স্বাধীনতা সংগ্রাম আর কেবল অভ্যন্তরীণ কোনো বিদ্রোহ নয়, বরং এটি একটি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার ন্যায়সঙ্গত যুদ্ধ।

তথ্যসূত্র

১. সারেন্ডার অ্যাট ঢাকা: একটি জাতির জন্ম – লে. জেনারেল জে এফ আর জেকব।

২. মধ্যম নাথপাড়া বধ্যভূমি – শাখাওয়াত হোসেন মজনু।

৩. দ্য গার্ডিয়ান (লন্ডন), সম্পাদকীয়: ৩১ মার্চ ১৯৭১।

৪. বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: দলিলপত্র (বিভিন্ন খণ্ড)।

৫. সংবাদ সংস্থা: বাসস (বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা) প্রতিবেদন।

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

৩১ মার্চ ১৯৭১: নাথপাড়ার রক্তগঙ্গা ও বিশ্ববিবেকের গর্জন

৩০ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন ও বিশ্ববিবেকের জাগরণ

ইতিহাসের অবিনশ্বর নক্ষত্র: শহীদ শাফী ইমাম রুমী

২৯ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন ও আত্মাহুতির এক নৃশংস অধ্যায়

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা,আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশ

২৮ মার্চ ১৯৭১: ধ্বংসযজ্ঞের ছাপ আর বাঙালির সুসংগঠিত প্রতিরোধ

২৭ মার্চ ১৯৭১: বিশ্ব জানল, বাংলাদেশ স্বাধীন

২৬ মার্চ ১৯৭১: একটি জাতির রক্তক্ষয়ী সূর্যোদয় ও স্বাধীনতার ঘোষণা

গণহত্যার বিরুদ্ধে শৈল্পিক প্রতিবাদ / ২৫শে মার্চের কালরাত্রি স্মরণে প্রাচ্যনাটের ‘লালযাত্রা’

২৫ মার্চ, ১৯৭১: ইতিহাসের কলঙ্কিত কালরাত ও বিভীষিকাময় গণহত্যা

১০

২৪ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন আর চূড়ান্ত প্রস্তুতির দিন

১১

২৫ মার্চের গণহত্যা স্মরণে ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দাবিতে ‘আলোর মিছিল’

১২

২৫ মার্চ ১৯৭১: গণহত্যার কালরাত্রি ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির লড়াই

১৩

জামায়াতকে বিচারের আওতায় আনার দাবি / একাত্তরের গণহত্যা স্বীকৃতির প্রস্তাব মার্কিন কংগ্রেসে

১৪

২৩ মার্চ ১৯৭১: যেদিন পাকিস্তান দিবস হলো প্রতিরোধের নামে

১৫

২২ মার্চ ১৯৭১: আপসহীন সংগ্রামের ঘোষণা এবং ইয়াহিয়ার নতুন চাল

১৬

২১ মার্চ ১৯৭১: নীতির প্রশ্নে আপসহীন বঙ্গবন্ধু এবং ঘনীভূত সামরিক মেঘ

১৭

২০ মার্চ ১৯৭১: টেবিলে আশার আলো, অন্তরালে গণহত্যার নীল নকশা

১৮

১৯ মার্চ ১৯৭১: সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের প্রথম স্ফুলিঙ্গ ও বীরত্বগাঁথা

১৯

১৮ মার্চ ১৯৭১: জান্তার তদন্ত কমিটি প্রত্যাখ্যান ও বঙ্গবন্ধুর ডাক

২০