

১৯৭১ সালের ১৮ মার্চ ছিল বৃহস্পতিবার। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকা অসহযোগ আন্দোলনের ১৮তম দিন। এদিন পূর্ব বাংলার আকাশে-বাতাসে ছিল চূড়ান্ত যুদ্ধের পদধ্বনি। একদিকে আলোচনার পরবর্তী সময় নির্ধারণ না হওয়ায় জনমনে ছিল চরম উৎকণ্ঠা, অন্যদিকে ঢাকা ও চট্টগ্রামের রাজপথে পাকিস্তানি সেনাদের উসকানিমূলক আচরণ পরিস্থিতিকে আরও ঘোলাটে করে তোলে।
১. সামরিক তদন্ত কমিশন প্রত্যাখ্যান
পূর্ব বাংলায় চলমান আন্দোলনে নির্বিচার গুলিবর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তদন্তের জন্য সামরিক আইন প্রশাসক লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিশন গঠন করেন। ১৮ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক বিবৃতিতে এই কমিশনকে একবাক্যে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন-
“এ ধরনের কমিশন দিয়ে কোনো ফায়দা হবে না। এটি হবে জনগণকে বিভ্রান্ত করার অপকৌশল মাত্র। আমি এই তদন্ত কমিশন চাই না।”
একই সঙ্গে তিনি বাংলার জনগণকে এই সরকারি কমিশনের সঙ্গে কোনো প্রকার সহযোগিতা না করার আহ্বান জানান। এর পরিবর্তে তিনি আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে নিজস্ব তদন্ত দল গঠন করেন।
২. ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর: জনতা ও নেতার মিলনস্থল
ভোর থেকে রাত পর্যন্ত উৎসুক জনতা তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে ভিড় জমাতে থাকেন। বঙ্গবন্ধু দিনের বিভিন্ন সময়ে শোভাযাত্রাকারীদের উদ্দেশে সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন। তাঁর কণ্ঠে ছিল চূড়ান্ত লড়াইয়ের আহ্বান:
সংগ্রামী দুর্গ: “তোমরা চরম প্রস্তুতি নিয়ে ঘরে ঘরে সংগ্রামী দুর্গ গড়ে তোলো।”
পাল্টা আঘাত: “যদি তোমাদের ওপর আঘাত আসে, তবে তা প্রতিহত করে শত্রুর ওপর পাল্টা আঘাত হেনো।”
চূড়ান্ত লক্ষ্য: “৭ কোটি বাঙালির সার্বিক মুক্তি না আসা পর্যন্ত সংগ্রাম চালিয়ে যাও।”
৩. রাজনৈতিক বৈঠক ও ভুট্টোর টালবাহানা
এদিন বঙ্গবন্ধু ও ওয়ালী ন্যাপ প্রধান খান আব্দুল ওয়ালী খান এক ঘণ্টারও বেশি সময় রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মিলিত হন। বৈঠকে গাউস বক্স বেজেঞ্জোসহ পশ্চিম পাকিস্তানের অন্যান্য নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। অন্যদিকে, করাচিতে এক সংবাদ সম্মেলনে পিপলস পার্টির প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো ইয়াহিয়ার ঢাকা আসার আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, তাঁর চাওয়া কিছু ব্যাখ্যার জবাব না পাওয়ায় তিনি ঢাকা যাচ্ছেন না। এটি ছিল মূলত আলোচনার টেবিলে অচলাবস্থা তৈরির এক অপকৌশল।
৪. বিমানবন্দরে সৈন্যদের হামলা ও জনরোষ
তেজগাঁও ও মহাখালী এলাকায় ট্রাকবোঝাই শ্রমিকদের ওপর পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সদস্যরা হামলা চালায়। সৈন্যরা নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর নির্মম নির্যাতন চালায় এবং তাদের টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নেয়। এই ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে আওয়ামী লীগের উপ-নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেন:
"নিরস্ত্র মানুষের ওপর উসকানিমূলক আচরণ আমরা আর সহ্য করব না। এর ফলাফলের দায়িত্ব উসকানিদাতাদেরই বহন করতে হবে।"
৫. সামরিক প্রস্তুতি ও খাদ্যশস্য লুণ্ঠন
পাকিস্তানি জান্তা একদিকে আলোচনার নাটক করছিল, অন্যদিকে গোপনে শক্তি বাড়াচ্ছিল। এদিন বাংলাদেশের জন্য আসা খাদ্যশস্যবাহী জাহাজ ‘ইরনা এলিজাবেথ’-এর গতিপথ বদলে চট্টগ্রাম থেকে করাচিতে নিয়ে যাওয়া হয়। এটি ছিল বাঙালির মুখে অন্ন কেড়ে নেওয়ার এক নগ্ন চক্রান্ত। এছাড়া বিমানবাহিনীর প্রাক্তন বাঙালি সৈনিকরা এদিন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শপথ নেন যে, তারা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে যেকোনো ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত।
৬. পরবর্তী বৈঠকের ঘোষণা
এদিন রাতে সরকারিভাবে ঘোষণা করা হয় যে, পরদিন ১৯ মার্চ সকাল ১১টায় প্রেসিডেন্ট ভবনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের মধ্যে বর্তমান রাজনৈতিক সংকট নিয়ে তৃতীয় দফার আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে।
১৮ মার্চ ১৯৭১ প্রমাণ করেছিল যে, বাঙালি জাতি এখন আর কোনো আপস বা তদন্তের মিথ্যে আশ্বাসে ভুলতে রাজি নয়। বঙ্গবন্ধুর বাসভবন তখন কেবল একটি বাড়ি নয়, বরং একটি সমান্তরাল রাষ্ট্রের সচিবালয়ে পরিণত হয়েছিল। রাজপথে জনতার "জয় বাংলা" স্লোগান আর জান্তার মেশিনগানের মহড়া জানান দিচ্ছিল যে, আলোচনার টেবিলের বাইরে এক মহাযুদ্ধের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়ে গেছে।
তথ্যসূত্র
১. দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক পাকিস্তান (১৯ মার্চ ১৯৭১ সংস্করণ)।
২. রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদী, ‘৭১ এর দশমাস’।
৩. বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ওয়েবসাইট।
৪. দৈনিক বাংলা (মার্চ ১৯৭২-এর বিশেষ সংখ্যা)।
মন্তব্য করুন