

১৯৭১ সালের ১৫ মার্চ, সোমবার। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে চলা লাগাতার অসহযোগ আন্দোলনের অষ্টম দিনে (অনেক সূত্রে দ্বিতীয় পর্যায়ের অষ্টম দিন হিসেবে উল্লেখ) বাংলা তখন উত্তাল। এদিন সকাল থেকেই সরকারি-বেসরকারি ভবন ও যানবাহনে উড়েছে কালো পতাকা। সভা-সমাবেশ, শান্তিপূর্ণ শোভাযাত্রা আর অফিস-আদালত বর্জনের মধ্য দিয়ে কাটে দিনটি। এই দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানের ঢাকা আগমন।
গোপনে ঢাকায় এলেন ইয়াহিয়া
প্রচলিত রীতি ভেঙে কঠোর গোপনীয়তা ও ব্যাপক নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ঢাকায় আসেন জেনারেল ইয়াহিয়া খান। করাচি থেকে তার ঢাকা আসার খবর কলকাতার বেতার প্রচার করলেও রেডিও পাকিস্তান ছিল নীরব। বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানান নবনিযুক্ত সামরিক গভর্নর লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান। সাংবাদিকদের জন্য কোনো সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা ছিল না এবং কোনো বাঙালিকে বিমানবন্দরে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি । তিনি এসেছিলেন আলোচনার আড়ালে অপারেশন সার্চলাইটের মতো গণহত্যার নীলনকশা চূড়ান্ত করতে ।
বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই চলল দেশ
এদিন কার্যত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশেই দেশ পরিচালিত হচ্ছিল। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ ১৫ মার্চ এক বিবৃতিতে বঙ্গবন্ধু ঘোষিত অসহযোগ আন্দোলনের ব্যাখ্যা দেন এবং জনগণের নিরঙ্কুশ সাড়া পাওয়ার কথা উল্লেখ করেন । তিনি এদিন বাংলাদেশের শাসনকার্য পরিচালনার জন্য ৩৫টি বিধি প্রণয়ন করেন, যা বঙ্গবন্ধু অনুমোদন করেন। হাসপাতাল, বিদ্যুৎ, গ্যাস, ফায়ার সার্ভিসের মতো জরুরি সেবা চালু রেখে সব সরকারি-বেসরকারি দপ্তর, হাইকোর্ট ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয় ।
একইদিন ১১৫ নং সামরিক আইন আদেশে সরকারি কর্মচারীদের কাজে যোগ দিতে বলা হলেও কোনো বিভাগের কর্মচারী কাজে যোগ দেননি। তারাও বিক্ষোভ মিছিল করে বঙ্গবন্ধুর কর্মসূচির প্রতি সমর্থন জানান। এমনকি সামরিক বিভাগের অধীনে অর্ডিন্যান্স ডিপোর প্রায় ১১ হাজার কর্মচারীও কাজে যোগ দেয়নি ।
ছাত্র জনতার বিক্ষোভ ও প্রস্তুতি
স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ নতুন করে সামরিক আইন জারির প্রতিবাদে বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণে এক বিশাল জনসভার আয়োজন করে। সভায় ছাত্রনেতারা বলেন, “বাংলাদেশে কেবল বাংলার সর্বাধিনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই নির্দেশ জারি করতে পারেন এবং বাংলার জনগণ কেবলমাত্র সেই বিধিই মেনে চলবে” । সভায় বাংলাদেশ থেকে অবিলম্বে পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্য সরিয়ে নেওয়ার আহ্বান জানানো হয় এবং স্বাধীনতা রক্ষায় সবাইকে অস্ত্র নিয়ে প্রস্তুত থাকার উদাত্ত আহ্বান জানানো হয় ।
সভা শেষে এক বিশাল মিছিল জিন্নাহ এভিনিউ, কাকরাইল, বেইলি রোড হয়ে প্রেসিডেন্ট ভবনের পাশ ঘেঁষে অতিক্রম করে। ইয়াহিয়া খান তখন ওই ভবনে অবস্থান করছিলেন। মিছিলটি প্রেসিডেন্ট ভবনের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সেনাবাহিনী ও ইপিআরকে ব্যাপক সতর্ক অবস্থায় দেখা যায়। মিছিলটি কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে শেষ হয় ।
বুদ্ধিজীবীদের খেতাব বর্জন ও নারী সমাবেশ
দেশবাসীকে অধিকার বঞ্চিত করার প্রতিবাদে শিল্পী ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে রাষ্ট্রীয় খেতাব বর্জনের ধারা অব্যাহত থাকে। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে সাংবাদিক-সাহিত্যিক আবুল কালাম শামসুদ্দীন এবং অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী তাদের রাষ্ট্রীয় খেতাব বর্জন করেন ।
তোপখানা রোডে কবি সুফিয়া কামালের সভাপতিত্বে পূর্ব পাকিস্তান মহিলা পরিষদের এক নারী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় । কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বেতার ও টিভি শিল্পীরা দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করেন । অধ্যাপক আবুল ফজলের সভাপতিত্বে চট্টগ্রামে শিল্পী, সাহিত্যিক ও সাংবাদিকদের বিশাল সমাবেশে বক্তব্য দেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসান, সাংবাদিক নূর ইসলাম প্রমুখ । উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সদস্যরা ভ্রাম্যমাণ ট্রাকে গণসঙ্গীত ও পথনাটক পরিবেশন করে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেন ।
অন্যান্য ঘটনা
চিকিৎসকরা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আয়োজিত সভা থেকে অসহযোগ আন্দোলনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে একাত্মতা প্রকাশ করেন এবং দীর্ঘস্থায়ী সংগ্রামে প্রস্তুত হওয়ার জন্য জনতার প্রতি আহ্বান জানান । নেত্রকোনায় সুইপার ও ঝাড়ুদাররা ঝাড়ু, দা, লাঠি ও কোদাল নিয়ে মিছিল করে। বগুড়া, খুলনা, রংপুর, লাকসাম, কুমিল্লা ও কুষ্টিয়াসহ বিভিন্ন স্থানে স্বাধীনতার পক্ষে মিছিল-সমাবেশ হয় । খুলনার হাদীস পার্কে এক সমাবেশে জাতীয় লীগ প্রধান আতাউর রহমান খান বলেন, “বাংলার প্রতিটি মানুষ আজ বঙ্গবন্ধুর পেছনে একতাবদ্ধ। রেডিও, টিভি, ইপিআর, পুলিশ বাহিনী, সেক্রেটারিয়েট প্রভৃতি আজ আওয়ামী লীগপ্রধানের আজ্ঞাবাহী” ।
পশ্চিম পাকিস্তানে জমিয়তে উলামায়ে পাকিস্তান, ন্যাপ (ওয়ালী), মুসলিম লীগ (কাউন্সিল) এবং পিডিপির নেতারা এক বিবৃতিতে জুলফিকার আলী ভুট্টোর দুই দলের অধীনে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রস্তাবের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান ।
দিবসের সারসংক্ষেপ: ১৫ মার্চ ১৯৭১ বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ দিন। একদিকে যেমন ইয়াহিয়া খান ঢাকায় এসে আলোচনার নামে কালক্ষেপণ ও গণহত্যার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করছিলেন, অন্যদিকে তেমনি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালি জাতি অসহযোগ ও প্রতিরোধের পথ সুসংহত করে স্বাধীনতার চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
তথ্যসূত্র
দৈনিক ইত্তেফাক, ১৬ মার্চ ১৯৭১
দৈনিক বাংলা, ১৯৭২
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর
রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদী, ‘৭১ এর দশমাস
জাহানারা ইমাম, ‘একাত্তরের দিনগুলো’
মন্তব্য করুন