

২০২৪ সালের মে মাসে ৪১ হাজার ফুট উচ্চতা থেকে গিনেস রেকর্ডধারী স্কাইডাইভ দিয়ে আলোচনায় এসেছিলেন চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন। সেই ‘উড়ন্ত’ আশিককে যখন ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৪-এ বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও বেজা’র নির্বাহী চেয়ারম্যান করা হয়, তখন প্রচার করা হয়েছিল—তাঁর হাত ধরেই দেশে বিদেশি বিনিয়োগের ‘মিরাকল’ ঘটবে। কিন্তু ১৮ মাস পর বর্তমান বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, বিনিয়োগের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার বদলে নিচের দিকেই নেমেছে। খোদ বিডার চেয়ারম্যানের ভূমিকা নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠছে—তিনি কি দেশের বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে কাজ করেছেন, নাকি বিদায়ী প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক প্রচারক হিসেবেই ব্যস্ত ছিলেন?
তলানিতে বিনিয়োগের সূচক
অনুসন্ধানে দেখা যায়, চৌধুরী আশিক মাহমুদের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে বিদেশি বিনিয়োগের চিত্র অত্যন্ত হতাশাজনক। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ (New Equity) এসেছে মাত্র ৫৫ কোটি ডলার, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এমনকি করোনাকালেও এর চেয়ে বেশি বিনিয়োগ এসেছিল। বিডায় নিবন্ধিত বিনিয়োগ প্রস্তাব কমেছে প্রায় ৫৮ শতাংশ।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) নিট এফডিআই প্রবাহ কমেছে ২৬ শতাংশ। মূলধনি যন্ত্রপাতি (Capital Machinery) আমদানি কমেছে প্রায় ২৮ শতাংশ, যা শিল্পায়নের স্থবিরতাকে স্পষ্ট করে। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ১০ শতাংশ থেকে নেমে ৭ শতাংশের নিচে অবস্থান করছে।
প্রচার বনাম বাস্তবতা
বিডার চেয়ারম্যান হিসেবে আশিক চৌধুরী ‘ইনভেস্টমেন্ট সামিট’, ইলোন মাস্কের ‘স্টারলিংক’ বা নাসার সঙ্গে চুক্তির মতো চমকপ্রদ প্রচারণা চালালেও তার প্রতিফলন মাঠ পর্যায়ে দৃশ্যমান নয়। গত বছর এপ্রিলে জমকালো বিনিয়োগ সম্মেলনে ৩ হাজার ১০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাবের ঘোষণা এলেও, বাস্তবে তার সামান্যই বাস্তবায়িত হয়েছে। স্থানীয় উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, বড় দেশি বিনিয়োগকারীদের পাশ কাটিয়ে কেবল বিদেশি ‘হাই-ভ্যালু ডিল’ আর চমক সৃষ্টির দিকেই তাঁর নজর ছিল বেশি।
‘মার্কেটিং ম্যানেজার’ বিতর্ক
অভিযোগ উঠেছে, বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান পদের চেয়ে ড. ইউনূসের ‘সোশ্যাল বিজনেস’ এবং গ্রামীণ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্বব্যাপী প্রচারণাতেই বেশি সময় ব্যয় করেছেন আশিক চৌধুরী। গ্রামীণ টেলিকম বা গ্রামীণ এন্টারপ্রাইজের মতো প্রতিষ্ঠানের জন্য বিডার চেয়ার ব্যবহার করে বিদেশে লবিং করার অভিযোগও তাঁর পিছু ছাড়ছে না। অনেকেই তাঁকে বিডার চেয়ারম্যানের বদলে ড. ইউনূসের ‘মার্কেটিং ম্যানেজার’ হিসেবে অভিহিত করছেন।
চট্টগ্রাম বন্দর ডেনমার্কের মায়ের্স্কের হাতে তুলে দেওয়া কিংবা বড় বড় অবকাঠামো চুক্তি নিয়ে স্বচ্ছতার অভাবের অভিযোগও উঠেছে। মাসরুর রিয়াজের মতো বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমলাতন্ত্রের বাইরে থেকে একজনকে এনেও বড় কোনো কাঠামোগত সংস্কার নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
সংকটে বিনিয়োগ পরিবেশ
বর্তমানে ব্যাংক খাতের নাজুক অবস্থা, ১৫ শতাংশের ওপর সুদের হার এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের কারণে স্থানীয় বিনিয়োগকারীরাই যেখানে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন, সেখানে বিডা চেয়ারম্যানের ‘হিটম্যাপ’ বা প্রচারণামূলক কৌশল কোনো কাজে আসছে না। বিদেশি রাষ্ট্রদূতরা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নির্বাচিত সরকার ছাড়া টেকসই বড় বিনিয়োগ আসা কঠিন।
ড. ইউনূসের প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে বিদায়ের পর এখন দাবি উঠেছে, বিডার মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংস্থানটিতে একজন দক্ষ, অভিজ্ঞ এবং প্রকৃত বিনিয়োগবান্ধব ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়ার। প্রচারণার আড়ালে থাকা ব্যর্থতার দায় নিয়ে আশিক চৌধুরীর অপসারণ এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ ব্যাংক, বিআইডিএ (বিডা) বার্ষিক প্রতিবেদন, এবং সমসাময়িক জাতীয় দৈনিকসমূহ।
মন্তব্য করুন