

১৯৭১ সালের ১২ মার্চ ছিল শুক্রবার। অসহযোগ আন্দোলনের দ্বাদশ দিনে পূর্ব বাংলা এক চূড়ান্ত উত্তেজনার মুখোমুখি হয়। একদিকে রাজপথে মুক্তিকামী মানুষের বজ্রকণ্ঠ, অন্যদিকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ হারানোর স্পষ্ট চিত্র—সব মিলিয়ে দিনটি ছিল স্বাধীনতার পথে আরও একধাপ এগিয়ে যাওয়ার সময়।
১. আসগর খানের ঐতিহাসিক মন্তব্য ও পশ্চিমের প্রতিক্রিয়া
এদিন লাহোরে এক সংবাদ সম্মেলনে গণঐক্য আন্দোলনের প্রধান এয়ার মার্শাল (অব.) আসগর খান এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও আবেগঘন মন্তব্য করেন। তিনি বলেন:
“ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, দোষ করা হলো লাহোরে কিন্তু বুলেট বর্ষিত হলো ঢাকায়। পূর্বাঞ্চলের মানুষ সমান অধিকার নিয়ে বাঁচতে চায়, পশ্চিমাঞ্চলের দাস হিসেবে নয়।”
তিনি স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দেন যে, পাকিস্তানকে রক্ষা করার একটিই পথ খোলা আছে, আর তা হলো অবিলম্বে শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। অন্যদিকে লাহোরে ন্যাপের মহাসচিব সি.আর. আসলাম এই সংকটের জন্য জুলফিকার আলী ভুট্টোর ক্ষমতালিপ্সাকে দায়ী করেন।
২. পাকিস্তান দিবসের কর্মসূচি বাতিল
বাঙালির অসহযোগ আন্দোলনের তীব্রতা এবং স্বাধিকার চেতনার মুখে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ পিছু হটতে শুরু করে। রাওয়ালপিন্ডিতে এক সরকারি ঘোষণায় জানানো হয় যে, ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসের জন্য নির্ধারিত সম্মিলিত সশস্ত্র বাহিনীর কুচকাওয়াজ, খেতাব বিতরণ ও সব ধরনের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি বাতিল করা হয়েছে। এটি ছিল আন্দোলনের এক বড় নৈতিক বিজয়।
৩. বঙ্গবন্ধুর প্রতি ভাসানীর অবিচল আস্থা
ময়মনসিংহে আয়োজিত এক জনসভায় মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী সাত কোটি বাঙালির মুক্তি সংগ্রামে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের প্রতি আবারও পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেন। তিনি জনগণের উদ্দেশে বলেন:
“আমি জানি শেখ মুজিবুর রহমান কখনোই বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারেন না। আপনারা শেখ মুজিবের ওপর সম্পূর্ণ ভরসা রাখুন।”
৪. পেশাজীবী ও কর্মকর্তাদের আন্দোলনে একাত্মতা
সিএসপি কর্মকর্তাদের মিছিল: ‘দৈনিক পাকিস্তান’-এর খবর অনুযায়ী, বাঙালি সিএসপি (সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তান) কর্মকর্তারা রাজপথে মিছিল বের করেন এবং আন্দোলনের সমর্থনে তাদের একদিনের বেতন আওয়ামী লীগের ত্রাণ তহবিলে দান করার সিদ্ধান্ত নেন।
খেতাব বর্জন: জাতীয় পরিষদ সদস্য মোহাম্মদ জহিরউদ্দিন পাকিস্তান সরকার প্রদত্ত যাবতীয় খেতাব বর্জন করে জনগণের কাতারে সামিল হন।
প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ: চলচ্চিত্র প্রদর্শকরা বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ আন্দোলনে সমর্থন জানিয়ে ঢাকাসহ দেশব্যাপী অনির্দিষ্টকালের জন্য প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ ঘোষণা করেন এবং সাহায্য তহবিলে ১৩,২৫০ টাকা অনুদান প্রদান করেন।
৫. মার্কিন জাহাজের গতি পরিবর্তন ও মনসুর আলীর নিন্দা
প্রাদেশিক পরিষদে আওয়ামী লীগ নেতা ক্যাপ্টেন মনসুর আলী এক বিবৃতিতে গভীর উৎকণ্ঠা ও নিন্দা প্রকাশ করেন। তিনি জানান, পূর্ব বাংলার জন্য প্রেরিত খাদ্যবোঝাই মার্কিন জাহাজের গতি পরিবর্তন করে জোরপূর্বক করাচিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তিনি একে বাঙালির বিরুদ্ধে এক গভীর ষড়যন্ত্র হিসেবে উল্লেখ করেন।
৬. বগুড়া জেলখানায় বিদ্রোহ ও পলায়ন
অশান্ত বাংলার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে কারাগারের ভেতরেও। এদিন বগুড়া জেলখানা ভেঙে ২৭ জন কয়েদি পালিয়ে যায়। তাদের বাধা দিতে গিয়ে কারারক্ষীরা গুলি চালালে একজন কয়েদি নিহত এবং ১৫ জন আহত হন।
৭. অসহযোগের চিত্র
দেশজুড়ে সরকারি-আধা সরকারি কর্মচারীদের কর্মস্থল বর্জন অব্যাহত থাকে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ঝুলতে থাকে তালা। প্রতিটি যানবাহন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং বাসগৃহে শোকের ও প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে কালো পতাকা উড়তে দেখা যায়।
১২ মার্চ ১৯৭১ ছিল পাকিস্তানি জান্তার জন্য একটি চরম পরাজয়ের দিন। যখন পশ্চিম পাকিস্তানের বিবেকবান রাজনৈতিক নেতৃত্বও শেখ মুজিবের হাতে ক্ষমতা ছাড়ার দাবি তুলছিলেন, তখন বাঙালি জাতি ঘরে ঘরে প্রস্তুত হচ্ছিল চূড়ান্ত লড়াইয়ের জন্য।
তথ্যসূত্র
১. দৈনিক ইত্তেফাক আর্কাইভ। ২. রবীন্দ্রনাথ ত্রিবেদী, '৭১ এর দশমাস'। ৩. মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। ৪. দৈনিক পাকিস্তান (বর্তমান দৈনিক বাংলা) ঐতিহাসিক সংস্করণ।
মন্তব্য করুন