ঢাকা সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬, ৯ ভাদ্র ১৪৩৩
মুক্ত ভাবনামুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানিতে নতুন চার্জ দিচ্ছে বাংলাদেশ

প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৩ আগস্ট ২০২৬, ০৪:৪১ পিএম
ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানিতে নতুন চার্জ দিচ্ছে বাংলাদেশ

ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির জন্য বাংলাদেশকে ‘সেটেলমেন্ট নোডাল এজেন্সি’ (এসএনএ) নামের একটি নতুন চার্জ পরিশোধ করতে হচ্ছে। প্রস্তাবিত চুক্তি অনুযায়ী, প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ আমদানির জন্য এসএনএ চার্জের হার নির্ধারণ করা হয়েছে ০.০০৫ ভারতীয় রুপি (বা আধা পয়সা)।

এই এসএনএ চার্জ বিদ্যুতের মূল ট্যারিফ বা দামের অন্তর্ভুক্ত নয়। এটি মূলত গ্রিড পরিচালনা, পাওয়ার শিডিউলিং, মিটারিং, এনার্জি অ্যাকাউন্টিং এবং আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ লেনদেন নিষ্পত্তির খরচ বাবদ নেওয়া হবে।

ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ বিপণন প্রতিষ্ঠান ‘এনটিপিসি বিদ্যুৎ ব্যবসা নিগম লিমিটেড’ (এনভিভিএন) এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) মধ্যে এ সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। গত ১৮ আগস্ট প্রস্তাবিত চুক্তিটির বিষয়ে মতামত চেয়ে অর্থ বিভাগে চিঠি পাঠিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।

দরকষাকষি ও চুক্তির প্রয়োজনীয়তা

অর্থ বিভাগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, ভারত প্রথমে প্রতি ইউনিটে ১ ভারতীয় পয়সা চার্জের প্রস্তাব করেছিল। তবে বিপিডিবির সাথে আলোচনার পর তা কমিয়ে ০.০০৫ রুপি বা আধা পয়সায় নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।

তিনি আরও জানান, ভারতের বিদ্যুৎ নীতি ও বিধিমালার কারণে এই চুক্তি স্বাক্ষর করা বাধ্যতামূলক। চুক্তি স্বাক্ষরে বিলম্ব হলে ভারত থেকে ১,১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির প্রক্রিয়ায় বিঘ্ন ঘটতে পারে।

বিদ্যুৎ বিভাগের অন্য একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রতি ইউনিটের হিসেবে চার্জের পরিমাণ কম মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে এর সামগ্রিক আর্থিক প্রভাব বেশ তাৎপর্যপূর্ণ হবে।

ভুটান ও নেপালের সাথে সমতা

বিদ্যুৎ খাতের কর্মকর্তারা জানান, এসএনএ চুক্তির অধীনে তফসিলভুক্ত বিদ্যুতের (scheduled energy) প্রতি ইউনিটের জন্য ০.০০৫ ভারতীয় রুপি চার্জের প্রস্তাব করা হয়েছে। বিপিডিবির লিখিত আবেদনের প্রেক্ষিতে এটি ভারতের কেন্দ্রীয় বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (সিইআরসি) কাছে পেশ করা হয়। এই হার নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভুটান ও নেপালের সাথে ভারতের বিদ্যুৎ বাণিজ্যে বর্তমানে প্রযোজ্য হার বিবেচনা করা হয়েছে।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ভুটান ও নেপালের সাথে ভারতের ইতোমধ্যেই এসএনএ চুক্তি রয়েছে এবং তারা প্রতি ইউনিটে ০.০০৫ রুপি চার্জ পরিশোধ করছে। বাংলাদেশের জন্যও একই হার প্রস্তাব করা হয়েছে।

চুক্তিভুক্ত ১,১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের পুরোটাই যদি বাংলাদেশ নিরবচ্ছিন্নভাবে আমদানি করে, তবে প্রতি ঘণ্টায় ১১ লাখ ৬০ হাজার (১.১৬ মিলিয়ন) ইউনিট বিদ্যুৎ সরবরাহ আসবে। প্রতি ইউনিটে ০.০০৫ রুপি হারে এতে প্রতি ঘণ্টায় এসএনএ চার্জ দাঁড়াবে ৫,৮০০ ভারতীয় রুপি। উল্লেখ্য, ১ ইউনিট বিদ্যুৎ বলতে ১ কিলোওয়াট-ঘণ্টাকে (kWh) বোঝায়, যা একটি ১,০০০ ওয়াটের যন্ত্র টানা ১ ঘণ্টা চললে ব্যবহৃত হয়।

এসএনএ চার্জের প্রেক্ষাপট

বিদ্যুৎ বিভাগের চিঠিতে বলা হয়েছে, প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে বিদ্যুৎ বাণিজ্যের ক্ষেত্রে গ্রিড-সংক্রান্ত খরচ নিষ্পত্তির জন্য সিইআরসি এই এসএনএ প্রক্রিয়া চালু করেছে।

সিইআরসির বিধিমালা অনুযায়ী, গ্রিড পরিচালনা, বিদ্যুৎ শিডিউলিং, মিটারিং, এনার্জি অ্যাকাউন্টিং, নির্ধারিত ও বাস্তব সরবরাহের পার্থক্যের কারণে উদ্ভূত অর্থ নিষ্পত্তি এবং অন্যান্য গ্রিড-সংক্রান্ত অর্থ প্রদানের দায়িত্ব এসএনএ-র ওপর ন্যস্ত। ভারতের বিদ্যুৎ গ্রিডের ভেতরে বাংলাদেশকে একটি পৃথক 'কন্ট্রোল এরিয়া' বা নিয়ন্ত্রণ এলাকা হিসেবে গণ্য করা হয়, যার জন্য মিটারিং, এনার্জি অ্যাকাউন্টিং এবং বিদ্যুৎ আমদানির অর্থ নিষ্পত্তির নির্দিষ্ট ব্যবস্থা রয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ ট্যারিফ ছাড়াও গ্রিড পরিচালনা ও আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ লেনদেন নিষ্পত্তির চার্জ হিসেবে পৃথকভাবে এই এসএনএ চার্জ ধার্য করা হচ্ছে।

বিদ্যুৎ আমদানির বর্তমান চিত্র

বাংলাদেশ বহু বছর ধরেই ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করে আসছে। বর্তমানে বিভিন্ন চুক্তির আওতায় দেশটি ভারত থেকে সর্বোচ্চ ২,৬৫৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির ব্যবস্থা রেখেছে।

এর মধ্যে এনভিভিএনের মাধ্যমে এনটিপিসির একটি কেন্দ্র থেকে ২৫০ মেগাওয়াট, দামোদর ভ্যালি করপোরেশন থেকে ৩০০ মেগাওয়াট, ত্রিপুরা স্টেট ইলেকট্রিসিটি করপোরেশন থেকে ১৬০ মেগাওয়াট, পিটিসি ইন্ডিয়ার মাধ্যমে সেম্বকর্প এনার্জি ইন্ডিয়ার কেন্দ্র থেকে ২০০ মেগাওয়াট এবং সেম্বকর্প এনার্জি ইন্ডিয়া থেকে সরাসরি আরও ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করা হয়। এই পাঁচটি চুক্তির আওতায় সরবরাহ করা মোট ১,১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রস্তাবিত এসএনএ চুক্তির অন্তর্ভুক্ত।

অন্যদিকে, ঝাড়খণ্ডের আদানি পাওয়ারের গড্ডা কেন্দ্র থেকে ১,৪৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির জন্য বিপিডিবির পৃথক চুক্তি রয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আদানির সাথে বিদ্যমান চুক্তিতে আগেই এসএনএ চার্জ অন্তর্ভুক্ত রাখা হয়েছে, তাই ওই সরবরাহের জন্য আলাদা চুক্তির প্রয়োজন নেই।

গ্যাস সংকট, জ্বালানি আমদানির বাড়তি ব্যয় এবং দেশীয় বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন সীমাবদ্ধতার কারণে দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে ভারতের বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রস্তাবিত এই চুক্তি কার্যকর হলে বিদ্যুৎ আমদানির নির্ধারিত ট্যারিফের সাথে বাড়তি এই চার্জ যুক্ত হবে।

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় ৫ জনের মৃত্যু

২০০৭-এর নিপীড়ন ও প্রতিরোধের ইতিহাস / ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘কালো দিবস’ আজ

ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানিতে নতুন চার্জ দিচ্ছে বাংলাদেশ

বঙ্গোপসাগরে পণ্যবাহী জাহাজ ডুবি: বাংলাদেশি সহ ২২ জন নিখোঁজ

বঙ্গভবনে উঠলেন নতুন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল

রংপুরে চার হত্যাকাণ্ড: ২ যুবক আটক, দায় স্বীকার

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা

ইরানকে সহায়তাকারী দেশগুলোর ওপর কঠোর শাস্তির হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের

ড. ইউনূস ও আসিফ নজরুলসহ ২৭ জনের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন

আবার বাড়লো স্বর্ণের দাম

১০

কলকাতার হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড: ৯ বাংলাদেশির মৃত্যু

১১

৯,৩৩৩ কোটি টাকার ১০ প্রকল্প অনুমোদন / একনেক থেকে ফেরত পাঠানো হলো বিএসসি ও তুরাগ নদের ২ প্রকল্প

১২

কারামুক্ত হলেন সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক

১৩

১২ ঘণ্টার প্যারোলে মুক্তি পেলেন দীপু মনি

১৪

রাজধানীতে চালু ‘পিংক বাস’, কি বলছে সাধারণ জনগণ

১৫

কঙ্গোয় ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে ইবোলা, মৃত্যু বেড়ে ২,৩২৫

১৬

অপারেশন জ্যাকপটের বীর জলযোদ্ধাদের স্মরণে রাজধানীতে বিশেষ অনুষ্ঠান

১৭

জেএমবি’র ভয়াল সিরিজ বোমা হামলার ২১ বছর

১৮

২৬ দিন ধরে বন্ধ ময়মনসিংহের ২১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র

১৯

ওষুধে কর: মওকুফে স্বস্তি, নাকি নতুন ঝুঁকির শঙ্কা?

২০