ঢাকা রবিবার, ০৩ মে ২০২৬, ২০ বৈশাখ ১৪৩৩
মুক্ত মনমুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

ঈশানগোপালপুর গণহত্যা: ফরিদপুরে ১৯৭১ সালের ২ মে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ

পাকবাহিনী ও স্থানীয় সহযোগীদের হাতে জমিদারবাড়ির ২৮ নিরীহ বাঙালি হিন্দু নিহত, একমাত্র ব্যক্তি বুলেটের আঘাত নিয়ে বেঁচে যান
প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০২ মে ২০২৬, ০৯:৩৮ পিএম
ঈশানগোপালপুর গণহত্যা: ফরিদপুরে ১৯৭১ সালের ২ মে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ

১৯৭১ সালের ২ মে। স্বাধীনতা যুদ্ধের সেই ভয়াল দিনটিতে ফরিদপুরের অদূরবর্তী ঈশানগোপালপুর গ্রামে ইতিহাসের আরেকটি নির্মম অধ্যায় রচিত হয়। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী স্থানীয় সহযোগীদের নিয়ে হিন্দু জমিদার ঈশানশঙ্কর সরকারের বাড়িতে হানা দিয়ে ২৮ জন নিরীহ বাঙালি হিন্দুকে গুলি ও বেয়নেট দিয়ে হত্যা করে। ধৃতদের স্বজনদের সামনে নির্মমভাবে প্রাণ নেওয়া হয় এবং মরদেহ পুকুরপাড়ে সমাহিত করা হয়।

প্রেক্ষাপট

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে “অপারেশন সার্চলাইট” শুরু করে। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দু সম্প্রদায়কে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তারা ফরিদপুর জেলায় পৌঁছে সেখানে সেনাছাউনি স্থাপন করে।

সেনাবাহিনীর আগমনে এলাকার হিন্দু পরিবারগুলি পলায়ন শুরু করে। ফরিদপুর শহর থেকে প্রায় ৬০টি বাঙালি হিন্দু পরিবার ছয়-সাত কিলোমিটার দূরে ঈশানগোপালপুর গ্রামে আশ্রয় নেয়। এই গ্রামেই ছিল প্রয়াত হিন্দু জমিদার ঈশানশঙ্কর সরকারের বাড়ি। তাঁর নাতি লক্ষ্মণ সেন সেই সময় বাড়িতেই অবস্থান করছিলেন।

২১ এপ্রিলের পর ন্যাপ নেতা চিত্তরঞ্জন ঘোষ, তাঁর বড় ভাই জগদীশচন্দ্র ঘোষ এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জমিদারবাড়িতে আশ্রয় নেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করার প্রশিক্ষণ নেওয়া শুরু করেছিলেন।

গণহত্যা

২ মে স্থানীয় সহযোগীদের নিয়ে পাকিস্তানি বাহিনী গ্রামটির দিকে অগ্রসর হয়। তারা লক্ষ্মী দাসের হাট নামক স্থানে গাড়ি থামিয়ে ঈশানশঙ্করের বাড়ির দিকে এগিয়ে যায়।

গ্রামবাসীরা পালানোর চেষ্টা করলে সেনাবাহিনী তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। পরবর্তীতে বাড়ির ২৯ জন বাসিন্দাকে আটক করে স্থানীয় একটি ছোট জলাশয়ের পাড়ে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর শুরু হয় নির্মম অত্যাচার। ধৃতদের লাথি-ঘুষি মারা হয় এবং বেয়নেট দিয়ে আঘাত করা হয়।

অত্যাচারের পর পুরুষ সদস্যদের একে একে তাদের স্ত্রী-সন্তানদের সামনে গুলি করে হত্যা করা হয়। স্থানটি ছেড়ে যাওয়ার আগে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী উর্দুতে হুমকি দেয় — ‘কোনো মুক্তিযোদ্ধা কিংবা হিন্দুকে ছাড়া হবে না’। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে মাত্র একজন ব্যক্তি বুলেটের ক্ষত নিয়ে প্রাণে বেঁচে যান। নিহতদের মরদেহ পুকুরের পাশেই সমাহিত করা হয়।

পরবর্তী অবস্থা

বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর গণহত্যার স্থানটি পূর্বের মতোই পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। দীর্ঘ সময় সেখানে কোনো স্মৃতিচিহ্ন ছিল না।

২০১০ সালে গণহত্যায় নিহত ব্যক্তিদের স্বজনরা নিজ উদ্যোগে গণহত্যার স্থানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেন। ২০১০ সালের ২ মে প্রথমবারের মতো নিহত ব্যক্তিদের স্মরণ করা হয়। প্রতিবছর এই তারিখে বধ্যভূমিতে গীতা পাঠের মাধ্যমে নিহত আত্মার শান্তি কামনা করা হয়।

১৯৭১ সালের ২ মে পাকিস্তানি বাহিনী ও রাজাকারদের হাতে ফরিদপুরের ঈশানগোপালপুর গ্রামে ২৮ জন বাঙালি হিন্দু নিহত হন। ২৯ জন ধৃতের মধ্যে মাত্র একজন বেঁচে যান। নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয় লাইট মেশিনগান ও সেমি-অটোমেটিক রাইফেল।

তথ্যসূত্র

১. Wikipedia – “Ishangopalpur massacre”

২. Alchetron – “Ishangopalpur massacre”

৩. List of massacres in Bangladesh (IPFS)

৪. Dharmapedia Wiki – “Ishangopalpur massacre”

৫. Khan, Abu Saeed (2013) – “মুক্তিযুদ্ধে ফরিদপুর”

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সুপ্রিম কোর্টের এজলাসে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা: মুখে কালো কাপড় বেঁধে সাংবাদিকদের মানববন্ধন

৩ মে ১৯৭১: অবরুদ্ধ স্বদেশ ও বিশ্ববিবেকের আর্তনাদ

হামে শিশুদের মৃত্যুর মিছিল, দায় কার?

হাম মহামারিতে বাংলাদেশে নিরীহ শিশুদের মৃত্যুর মিছিল

ঈশানগোপালপুর গণহত্যা: ফরিদপুরে ১৯৭১ সালের ২ মে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ

গাভা নরেরকাঠী গণহত্যা: ইতিহাসের এক কলঙ্কজনক অধ্যায়

২ মে ১৯৭১: রাজাকাররা বরিশাল ও ফরিদপুরে নির্মম গণহত্যা চালায়

রেমিট্যান্সের রেকর্ডের আড়ালে ঢাকা পড়ছে লাশের মিছিল

আসিফ নজরুলের ১৮ মাস: দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ‘বদলি বাণিজ্য’

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ: আমিরাতকে রক্ষায় ঢাল হলো ইসরায়েলি ‘লেজার প্রযুক্তি’

১০

১ মে ১৯৭১: ইতিহাসের আয়নায় রক্তঝরা দিন ও বিশ্ববিবেকের জাগরণ

১১

উনুস সওদাগরের সালতামামি

১২

ঋণের জালে পিষ্ট অর্থনীতি

১৩

খেলাপি ঋণ ৩০ শতাংশ পার, বড় চ্যালেঞ্জ রাজস্ব আদায়

১৪

রাউজানে থামছে না লাশের মিছিল: নেপথ্যে আধিপত্য ও বালুমহাল

১৫

নাফ নদী থেকে আরাকান আর্মির হাতে ৭ জেলে অপহৃত

১৬

৩০ এপ্রিল ১৯৭১: ‘বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামীরা যুদ্ধে জয়ী হবেই’

১৭

নিবর্তনমূলক আইনে মামলা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা

১৮

যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্যচুক্তি: জাতীয় স্বার্থ সংকট ও প্রতিবাদের আওয়াজ

১৯

ডিজিটাল অরাজকতা বনাম কর্পোরেট শাসন / সোশ্যাল মিডিয়া কি ‘প্যারালাল সরকার’?

২০