ঢাকা রবিবার, ০৩ মে ২০২৬, ২০ বৈশাখ ১৪৩৩
মুক্ত মনমুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

২ মে ১৯৭১: রাজাকাররা বরিশাল ও ফরিদপুরে নির্মম গণহত্যা চালায়

প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০২ মে ২০২৬, ০৯:০৯ পিএম
২ মে ১৯৭১: রাজাকাররা বরিশাল ও ফরিদপুরে নির্মম গণহত্যা চালায়

১৯৭১ সালের ২ মে ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের এক ভয়াবহ অধ্যায়। এই দিনে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের দেশীয় দোসর রাজাকাররা বরিশাল ও ফরিদপুরে বাঙালি হিন্দুদের উপর নির্মম গণহত্যা চালায়। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের পক্ষে সমর্থন জোরদার হতে থাকে এবং প্রবাসী সরকার বিভিন্ন কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করে।

গণহত্যা ও প্রতিরোধ

গাভা নরেরকাঠী গণহত্যা (বরিশাল)

১৯৭১ সালের ২ মে সকালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আশেপাশের গ্রামের রাজাকারদের সহায়তায় বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার গাভা নরেরকাঠী গ্রামে প্রবেশ করে। “শান্তি কমিটি”র সভার কথা বলে গ্রামের হিন্দু পরিবারের লোকদের বেরিয়ে আসতে বলা হয়। স্থানীয় রাজাকাররা তাদের আটকে নিকটবর্তী খালের ধারে নিয়ে যায় এবং গুলি করে হত্যা করে। গুলি থেকে বাঁচতে যারা পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে তারা ডুবে যায় কিংবা স্রোতে ভেসে চলে যায়। বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী, এই গণহত্যায় ৯৫-১০০ জন বাঙালি হিন্দু নিহত হয়েছিল।

ঈশানগোপালপুর গণহত্যা (ফরিদপুর)

একই দিনে ফরিদপুর জেলার অদূরবর্তী ঈশানগোপালপুর গ্রামে আরেকটি গণহত্যা সংঘটিত হয়। ২রা মে স্থানীয় সহযোগীদের সহায়তায় পাকিস্তানি বাহিনী গ্রামের দিকে চলে আসে। তারা লক্ষ্মী দাসের হাট নামক স্থানে যান থামিয়ে প্রয়াত হিন্দু জমিদার ঈশানশঙ্কর সরকারের বাড়ির দিকে অগ্রসর হয়। গ্রামবাসীরা পলায়নে উদ্যত হলে সেনাবাহিনী তাদের ওপর গুলি চালায়। বাড়ির বাসিন্দাদের ২৯ জনকে আটক করে স্থানীয় ছোট একটি জলাধারের নিকট নিয়ে যাওয়া হয়। ধৃতদের প্রহার ও বেয়নেট দিয়ে অত্যাচার করার পর পুরুষ সদস্যদের স্ত্রী ও সন্তানের সামনে গুলি করে হত্যা করা হয়। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী স্থানটি ত্যাগের পূর্বে উর্দুতে হুমকি দেয় যে কোনো মুক্তিযোদ্ধা কিংবা হিন্দুদের ছেড়ে দেওয়া হবে না। কেবল একজন ব্যক্তি বুলেটের ক্ষত নিয়ে বেঁঁচে যান।

মুক্তিযুদ্ধের অন্যান্য ঘটনা

২ মে পাকিস্তানি সেনারা সকাল প্রায় ৮টায় ভারতের পশ্চিম দিনাজপুরের রাধিকাপুর স্টেশন এবং তার আশেপাশে গোলাবর্ষণ করে। গোলায় রাধিকাপুর স্টেশন বিধ্বস্ত হয় এবং কয়েকজন হতাহত হয়। এ ছাড়া ত্রিপুরার সাবরুমে পাকিস্তানি বাহিনীর গোলাবর্ষণে বেশ কয়েকজন হতাহত হয়।

একই দিন সকালে পাকিস্তানি সেনারা খাগড়াছড়ির রামগড়ে মুক্তিবাহিনীর ওপর তীব্র হামলা চালায়। সারাদিন যুদ্ধের পর মুক্তিযোদ্ধারা সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের সাবরুমে আশ্রয় নেয়। পাকিস্তানি সেনারা রাতে রামগড়ের দখল নিয়ে হত্যাকাণ্ড ও অগ্নিসংযোগ করে এলাকায় বিভীষিকা কায়েম করে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গন

২ মে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশ নিয়ে আলোচনার জন্য ৭ মে বিরোধী দলের নেতাদের বৈঠক ডাকেন। তাঁর সরকার বাংলাদেশ সম্পর্কে কী ভাবছে, সে সম্পর্কে তিনি বিরোধী দলের নেতাদের অবহিত করবেন বলে জানান। শরণার্থীদের প্রসঙ্গেও কথা হবে বলে জানানো হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের বৈদেশিক সাহায্য বিষয়ক কমিটির এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল সংক্রান্ত উপ-কমিটির চেয়ারম্যান কর্নেলিয়াস গ্যালাঘার কলকাতায় বলেন, শরণার্থীদের সঙ্গে কথা বলে তিনি নিশ্চিত হয়েছেন, পূর্ব পাকিস্তানে অতি মাত্রায় বর্বরতা ও গণহত্যা চলছে। কিছুদিন আগেও এটি পাকিস্তানের ঘরোয়া বিষয় ছিল, কিন্তু পাঁচ লাখ লোক দেশান্তরি হওয়ার পর এটি আন্তর্জাতিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

ভারত সরকার জানায়, সেখানে আগত বাংলাদেশি শরণার্থীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৬৭ হাজার ৪২৮। ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী জানান, ত্রিপুরায় প্রায় আড়াই লাখ শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ গণতান্ত্রিক কনভেনশন বাংলাদেশ সরকারকে অবিলম্বে স্বীকৃতি দিতে ভারত সরকারের প্রতি দাবি জানায়। কনভেনশনে বক্তব্য দেন জ্যোতি বসু, হরেকৃষ্ণ কোঙার, বিমলচন্দ্র মুখার্জি প্রমুখ।

প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের কর্মকাণ্ড

২ মে বাংলাদেশ সরকার একটি বিবৃতি দেয়। বিবৃতিতে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হয়, শত্রুসেনাদের সাহায্য করে যারা বিশ্বাসঘাতকতা করছেন, মানুষ তাদের ক্ষমা করবে না। তাদের কাজের জন্য চরম মূল্য দিতে হবে।

বুদাপেস্ট শান্তি সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকার আবদুস সামাদ আজাদকে নির্বাচন করে। বিশ্ব শান্তি কমিটি শান্তি সম্মেলনে প্রতিনিধি পাঠাতে বাংলাদেশ সরকারের কাছে অনুরোধ জানিয়েছিল।

সরকার তাদের প্রশাসনের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের এই দিন বেতন প্রদান করে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকেই বেতনের একটি অংশ সরকারের মুক্তিসংগ্রাম তহবিলে জমা দেন।

পাকিস্তানের তৎপরতা

পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো লাহোরে এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, দেশের একটি অংশে সামরিক আইন বলবৎ রেখেও অন্য অংশে ক্ষমতা হস্তান্তর করা যেতে পারে।

কাইয়ুম মুসলিম লীগের প্রধান খান আবদুল কাইয়ুম খান পাকিস্তানের রাজনৈতিক শূন্যতা পূরণের জন্য শাসনতন্ত্র জারির সুপারিশ করেন।

মুসলিম লীগ নেতা খান এ সবুর খান খুলনায় শান্তি কমিটি আয়োজিত এক সভায় মুক্তিযোদ্ধাদের নির্মূলের কাজে নিয়োজিত পাকিস্তানের সেনাবাহিনীকে সহযোগিতার আহ্বান জানান।

যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর গাভা নরেরকাঠী গণহত্যার স্থানটি গ্রামবাসীরা চিহ্নিত করে। কিন্তু অদ্যাবধি বধ্যভূমিতে কোনো স্মৃতিচিহ্ন স্থাপন করা হয়নি কিংবা গণহত্যার শিকার ব্যক্তিদের নাম খুঁজে বের করা হয়নি।

ঈশানগোপালপুর গণহত্যার স্থানটি স্বাধীনতার পর পরিত্যক্ত থাকে। ২০১০ সালে গণহত্যার শিকার ব্যক্তিদের স্বজনরা গণহত্যার স্থানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করে। ২রা মে নিহত ব্যক্তিদের স্মরণ করা হয় এবং তাদের বিদেহী আত্মার কল্যাণের জন্য গীতা পাঠ করা হয়।

বাংলাদেশের পিরোজপুরে সিরাজ শিকদার গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনার জন্য একটি কমিটি গঠন করেন। কমিটির সভানেত্রী এবং প্রধান কমান্ডার হন যথাক্রমে স্ত্রী জাহানারা বেগম এবং শাহনেওয়াজ।

তথ্যসূত্র

১. উইকিপিডিয়া, “গাভা নরেরকাঠী গণহত্যা”

২. উইকিপিডিয়া, “ঈশানগোপালপুর গণহত্যা”

৩. “বধ্যভূমির গদ্য (Unicoded) Part 4”, সংগ্রামের নোটবুক

৪. “চিহ্নিত হয়নি ৬৮ বধ্যভূমি, নেই শহীদদের তালিকাও”, Bangla Tribune

৫. “আজো সংরক্ষণ হয়নি বানারীপাড়ার বধ্যভূমি”, The Daily Ittefaq

৬. “বানারীপাড়ায় আজও অরক্ষিত দুটি বধ্যভূমি”, The Daily Ittefaq

৭. “বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর এক ও সাত”

৮. দৈনিক পাকিস্তান, পূর্বদেশ ও আনন্দবাজার পত্রিকা, ৩ মে ১৯৭১

৯. প্রথম আলো, “১৯৭১ সালে চট্টগ্রাম ও রাঙামাটিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গণহত্যা”

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

সুপ্রিম কোর্টের এজলাসে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা: মুখে কালো কাপড় বেঁধে সাংবাদিকদের মানববন্ধন

৩ মে ১৯৭১: অবরুদ্ধ স্বদেশ ও বিশ্ববিবেকের আর্তনাদ

হামে শিশুদের মৃত্যুর মিছিল, দায় কার?

হাম মহামারিতে বাংলাদেশে নিরীহ শিশুদের মৃত্যুর মিছিল

ঈশানগোপালপুর গণহত্যা: ফরিদপুরে ১৯৭১ সালের ২ মে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ

গাভা নরেরকাঠী গণহত্যা: ইতিহাসের এক কলঙ্কজনক অধ্যায়

২ মে ১৯৭১: রাজাকাররা বরিশাল ও ফরিদপুরে নির্মম গণহত্যা চালায়

রেমিট্যান্সের রেকর্ডের আড়ালে ঢাকা পড়ছে লাশের মিছিল

আসিফ নজরুলের ১৮ মাস: দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ‘বদলি বাণিজ্য’

ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ: আমিরাতকে রক্ষায় ঢাল হলো ইসরায়েলি ‘লেজার প্রযুক্তি’

১০

১ মে ১৯৭১: ইতিহাসের আয়নায় রক্তঝরা দিন ও বিশ্ববিবেকের জাগরণ

১১

উনুস সওদাগরের সালতামামি

১২

ঋণের জালে পিষ্ট অর্থনীতি

১৩

খেলাপি ঋণ ৩০ শতাংশ পার, বড় চ্যালেঞ্জ রাজস্ব আদায়

১৪

রাউজানে থামছে না লাশের মিছিল: নেপথ্যে আধিপত্য ও বালুমহাল

১৫

নাফ নদী থেকে আরাকান আর্মির হাতে ৭ জেলে অপহৃত

১৬

৩০ এপ্রিল ১৯৭১: ‘বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামীরা যুদ্ধে জয়ী হবেই’

১৭

নিবর্তনমূলক আইনে মামলা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা

১৮

যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বাণিজ্যচুক্তি: জাতীয় স্বার্থ সংকট ও প্রতিবাদের আওয়াজ

১৯

ডিজিটাল অরাজকতা বনাম কর্পোরেট শাসন / সোশ্যাল মিডিয়া কি ‘প্যারালাল সরকার’?

২০