ঢাকা মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩
মুক্ত ভাবনামুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

২৫ মার্চ, ১৯৭১: ইতিহাসের কলঙ্কিত কালরাত ও বিভীষিকাময় গণহত্যা

প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৫ মার্চ ২০২৬, ০৩:০১ পিএম
২৫ মার্চ, ১৯৭১: ইতিহাসের কলঙ্কিত কালরাত ও বিভীষিকাময় গণহত্যা

আজ ২৫ মার্চ, জাতীয় গণহত্যা দিবস। বাঙালি জাতির ইতিহাসে এটি সবচেয়ে বেদনাবিধুর ও বিভীষিকাময় দিন। ১৯৪৮ সালের জাতিসংঘের ‘জেনোসাইড কনভেনশন’-এর সংজ্ঞাকে ছাড়িয়ে ১৯৭১ সালের এই রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী মেতে উঠেছিল বিংশ শতাব্দীর অন্যতম নৃশংসতম নিধনযজ্ঞে। ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামক এই সুপরিকল্পিত সামরিক অভিযানের লক্ষ্য ছিল বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়া।

অপারেশন সার্চলাইট: গণহত্যার নীল নকশা

১৯৭১ সালের ১৭ মার্চ সকাল ১০টায় ঢাকার কমান্ড হাউসে বসে এই গণহত্যার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তদানিন্তন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা ও মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী এই অভিযানের নীল নকশা প্রণয়ন করেন।

গোপন নির্দেশনা: এই অভিযানের কোনো লিখিত নথি রাখা হয়নি; বরং ফরমেশন কমান্ডারদের মুখে মুখে নির্দেশ প্রদান করা হয়।

মূল লক্ষ্য: আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তার, বাঙালি সামরিক ও পুলিশ বাহিনীকে (ইপিআর ও পুলিশ) নিরস্ত্র করা এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বুদ্ধিজীবী সমাজকে নিশ্চিহ্ন করা।

সেই ভয়াল রাতের বর্ণনা: নরকের দুয়ার যখন উন্মুক্ত

২৫শে মার্চ রাত ১১টা ৩০ মিনিটের দিকে ঢাকা সেনানিবাস থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ট্যাংক, মর্টার এবং অত্যাধুনিক মারণাস্ত্র নিয়ে বেরিয়ে আসে। লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান ও নিয়াজীর জনসংযোগ কর্মকর্তা সিদ্দিক সালিক তাঁর ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ গ্রন্থে লিখেছেন, “নির্দিষ্ট সময়ের আগেই সামরিক কার্যক্রম শুরু হয়ে গেল... নরকের দরজা উন্মুক্ত হয়ে গেল।”

১. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ হল: বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। বিশেষ করে জগন্নাথ হলে রাতভর চলে পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড। ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব, জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা, অধ্যাপক সন্তোষ ভট্টাচার্যসহ ১০ জন শিক্ষককে ওই রাতে হত্যা করা হয়। রোকেয়া হলের ছাত্রীরাও রেহাই পায়নি তাদের হাত থেকে। সাংবাদিক সাইমন ড্রিং-এর মতে, কেবল ইকবাল হলেই (বর্তমান জহুরুল হক হল) ২০০ ছাত্র নিহত হন।

২. রাজারবাগ ও পিলখানা: রাজারবাগ পুলিশ লাইনস ও পিলখানায় ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর) সদর দপ্তরে প্রথম সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন বাঙালি সদস্যরা। তবে ভারী ট্যাংক ও গোলার মুখে তাঁদের প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে এবং সেখানে ব্যাপক রক্তপাত ঘটে।

৩. সাধারণ মানুষের ওপর বর্বরতা: পুরান ঢাকার হিন্দু-অধ্যুষিত এলাকা এবং রেললাইনের ধারের বস্তিগুলোতে আগুন ধরিয়ে দিয়ে পলায়নরত মানুষদের ব্রাশফায়ার করে হত্যা করা হয়। মার্কিন সাংবাদিক রবার্ট পেইন লিখেছেন, “সেই রাতে কেবল ঢাকাতেই ৭ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল।”

বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা ও সশস্ত্র প্রতিরোধ

অপারেশন সার্চলাইট শুরুর অব্যবহিত পর ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে (২৫শে মার্চ দিবাগত রাত) জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ধানমন্ডির বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার হওয়ার ঠিক আগে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তাঁর এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে বাংলার সর্বস্তরের মানুষ প্রতিরোধ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। একই সময়ে চট্টগ্রামের অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের ‘উই রিভোল্ট’ ঘোষণার মাধ্যমে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক বিদ্রোহ শুরু হয়।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও ঐতিহাসিক দলিল

আর্চার কে ব্লাড: তৎকালীন মার্কিন কনসাল জেনারেল একে ‘সিলেকটিভ জেনোসাইড’ বা বাছাই করা গণহত্যা হিসেবে অভিহিত করেন।

সাইমন ড্রিং: লন্ডনের ডেইলি টেলিগ্রাফে প্রকাশিত তাঁর প্রতিবেদনে পুরো বিশ্ব এই নৃশংসতার খবর প্রথম জানতে পারে।

পাকিস্তান সরকারের শ্বেতপত্র: তৎকালীন পাকিস্তান সরকার প্রকাশিত নথিতেও স্বীকার করা হয় যে, ১ থেকে ২৫ মার্চের মধ্যে ১ লক্ষাধিক মানুষের জীবননাশ হয়েছিল।

২৫শে মার্চের সেই কালরাত্রি কেবল বাঙালির রক্তে রঞ্জিত হয়নি, বরং এটি ছিল একটি জাতির পুনর্জন্মের সূচনালগ্ন। ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগ ও ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতার মর্যাদা রক্ষায় ২৫শে মার্চের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আজ সময়ের দাবি। প্রতি বছর রাত ১০টা ৩০ মিনিট থেকে ১০টা ৩১ মিনিট পর্যন্ত ১ মিনিটের প্রতীকী ‘ব্ল্যাকআউট’ পালনের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিশ্ববাসীকে এই ভয়াবহতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

তথ্যসূত্র

১. মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা রচিত ‘এ স্ট্রেঞ্জার ইন মাই ওন কান্ট্রি’। ২. সিদ্দিক সালিক রচিত ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’। ৩. রবার্ট পেইন রচিত ‘ম্যাসাকার’ (Massacre, The Tragedy of Bangladesh)। ৪. আর্চার কে ব্লাড-এর কূটনৈতিক তারবার্তা (The Blood Telegram)। ৫. দৈনিক টেলিগ্রাফ ও সাইমন ড্রিং-এর প্রতিবেদন (মার্চ ১৯৭১)। ৬. বাংলাদেশ সরকার ঘোষিত ২৫ মার্চ ‘গণহত্যা দিবস’ সংক্রান্ত জাতীয় ক্রোড়পত্র ও বাণীবলি (২০২৬)।

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

‘অসৎ মানুষের হাতে এআই গেলে ১০০ কোটি মানুষের মৃত্যু হতে পারে’

১

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র / বাংলাদেশে জ্বালানি নিয়ে আসা বিমানকে আকাশসীমায় ঢুকতে দেয়নি পাকিস্তান

২

শহীদ তাজুলের স্মৃতিতে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তরুণ প্রজন্ম

৩

ফুলেল শ্রদ্ধায় শহীদ মিনারে আখতার হুসেনকে শেষবিদায়

৪

রাশিয়ার পার্লামেন্ট নির্বাচনে এগিয়ে পুতিনের ইউনাইটেড রাশিয়া

৫

জামায়াত এমপি নজরুলের বাসায় উদ্ধারকৃত চিঠিতে মরিয়মের যা লেখা

৬

জামায়াত এমপি নজরুলের বিরুদ্ধে নির্যাতন ও প্ররোচনার মামলা

৭

সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড: কবিতা, গান ও ক্যানভাসে শরণার্থী জীবনের করুণ আখ্যান

৮

যুক্তরাষ্ট্রকে ৭ শর্ত দিল ইরান, না মানলে ‘চূড়ান্ত যুদ্ধ’

৯

নজিরবিহীন জালিয়াতি / বাংলাদেশ ব্যাংকে পদ ছাড়াই ৩৬৫ জনের নিয়োগ ও পদোন্নতি

১০

অপ্রতিম হত্যা: কিশোর গ্যাং, অপরাধ চক্র ও পুলিশের ভূমিকা

১১

আজ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’

১২

‘বারবার মামলা না দিয়ে গুলি করে মেরে ফেলেন’

১৩

আসিফের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ, অনুসন্ধানে দুদক

১৪

সিঙ্গাপুরেও মিলল বাড়ি ও ব্যাংক হিসাব / সাবেক ভূমিমন্ত্রী জাবেদের ১০ হাজার কোটি টাকার বিদেশি সম্পদ জব্দ

১৫

​​​​​​​শীতলক্ষ্যায় নিখোঁজ চারজনের মধ্যে ৩ জনের লাশ উদ্ধার

১৬

মোদী-পেজেশকিয়ান বৈঠক: মধ্যপ্রাচ্য সংকটে সংলাপ ও নিরাপদ সমুদ্রপথের তাগিদ

১৭

গুলশানে আ’লীগের মিছিল, গ্রেপ্তার ৩২

১৮

সমকাল কার্যালয়ে সাবেক ব্যুরো প্রধানের লাশ উদ্ধার

১৯

রংপুরে চার খুন: নেপথ্যে স্থানীয় বিএনপি নেতা, গৃহশিক্ষিকা ও পুলিশ কর্মকর্তা

২০