ঢাকা শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬, ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
মুক্ত ভাবনামুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

কৃষ্ণপুর-ধনঞ্জয় গণহত্যা (কুমিল্লা আদর্শ সদর)

প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৩:০৮ পিএম
কৃষ্ণপুর-ধনঞ্জয় গণহত্যা (কুমিল্লা আদর্শ সদর)

১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ছিল স্বাধীনতার জন্য একটি অভূতপূর্ব সংগ্রাম, যেখানে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নৃশংসতা এবং গণহত্যার ঘটনাগুলো ইতিহাসের পাতায় চিরকালের জন্য অমর হয়ে আছে। এরকম একটি ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছিল কুমিল্লা জেলার আদর্শ সদর উপজেলায় অবস্থিত কৃষ্ণপুর এবং ধনঞ্জয় গ্রামে। ১১ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ তারিখে সংঘটিত এই গণহত্যায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে শতাধিক নিরীহ নারী, পুরুষ এবং শিশু শহীদ হয়েছিলেন। এই ঘটনা শুধুমাত্র প্রতিশোধের একটি উদাহরণ নয়, বরং মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসিকতা এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের একটি প্রতিচ্ছবি। এই প্রতিবেদনে আমরা এই ঘটনার পটভূমি, ঘটনাপ্রবাহ, শহীদদের পরিচয় এবং উত্তরকালীন প্রভাব বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব, যাতে মূল তথ্যগুলো অক্ষুণ্ণ রাখা হয় এবং ইতিহাসের এই অন্ধকার অধ্যায়টি নতুন প্রজন্মের কাছে স্পষ্টভাবে উপস্থাপিত হয়।

পটভূমি: যুদ্ধের প্রাক্কাল

কৃষ্ণপুর এবং ধনঞ্জয় গ্রামগুলো কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার পাঁচথুবি ইউনিয়নের অন্তর্গত, যা ভারতীয় সীমান্তের সংলগ্ন এলাকায় অবস্থিত। এই অঞ্চলটি মুক্তিযুদ্ধের সময় সামরিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ এখানে মুক্তিযোদ্ধাদের সক্রিয়তা ছিল উল্লেখযোগ্য। ১০ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ তারিখে এই দুটি গ্রামে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর মধ্যে দিনব্যাপী তীব্র যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনী ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়, যার ফলে তাদের মধ্যে প্রতিশোধের আগুন জ্বলে ওঠে। মুক্তিযোদ্ধাদের খোঁজার অজুহাতে তারা পরদিন অর্থাৎ ১১ সেপ্টেম্বর পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতে আক্রমণ চালায়। এই প্রতিশোধমূলক অভিযানটি শুধুমাত্র যুদ্ধের একটি অংশ নয়, বরং নিরীহ গ্রামবাসীদের উপর নির্মম নির্যাতনের একটি উদাহরণ।

ঘটনাপ্রবাহ: নৃশংসতার বিবরণ

১১ সেপ্টেম্বর সকাল থেকেই আমড়াতলি ইউনিয়নের সর্বত্র প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দ শোনা যায়। এই গুলির আওয়াজে আতঙ্কিত হয়ে এলাকাবাসীর অনেকে কৃষ্ণপুর, ধনঞ্জয় এবং শিবের বাজার হয়ে পার্শ্ববর্তী বড়জ্বালা সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যান। মাঝিগাছা গ্রামের নারী-পুরুষরাও এই পথে ভারতের দিকে যাত্রা করে। এছাড়া শতশত লোক জীবন বাঁচানোর জন্য এলাপাতাড়ি দৌড়াদৌড়ি করে। এই আতঙ্কের মধ্যে একদল লোক খন্দকার বাড়িতে আশ্রয় নেয়ার জন্য বাড়ির উঠানে জড়ো হয়। খন্দকার সামছুল হুদা তাদের দক্ষিণ ভিটার একটি ঘরে ঢোকান এবং বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে দেন, যাতে তারা নিরাপদ থাকেন বলে ভাবেন। কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনী প্রথমে খন্দকার সামছুল হুদাকে গুলি করে হত্যা করে, এবং পরে আশ্রয়গ্রহণকারী লোকজনকে নির্মমভাবে গুলি করে। নিহতদের মধ্যে নারী, পুরুষ এবং শিশু ছিল, এবং তাদের মধ্যে নোয়াখালী অঞ্চলের বেশ কয়েকজন ক্ষেতমজুরও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই একটি বাড়িতেই ২০ জনের অধিক মানুষ গণহত্যার শিকার হন।

এরপর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ধনঞ্জয় গ্রামের খন্দকার বাড়ি ঘিরে ফেলে। তারা এখানে ৮ জন মানুষকে হত্যা করে। মনতাজ আলী নামে একজন কাঠের আলমারিতে লুকিয়ে পড়েন, কিন্তু পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে আলমারির ভেতরেই তিনি শহীদ হন। এই নৃশংসতার একটি হৃদয়বিদারক দৃশ্য ছিল: হানাদারদের ব্রাশফায়ারে শহীদ একজন মহিলার স্তনে মুখ দেয়া অবস্থায় একটি শিশু পড়ে থাকে, এবং সেই শিশুটিও গুলিতে শহীদ হয়। এরপর বাড়ির বিভিন্ন স্থানে আরও ১০ জনকে গুলি করে হত্যা করে পাকিস্তানি বাহিনী। এই দিনের নির্যাতন শুধুমাত্র এখানেই থেমে থাকেনি; পরদিন অর্থাৎ ১২ সেপ্টেম্বর নিকটবর্তী মধ্যম মাঝিগাছা এবং ইটাল্লা গ্রামের ৬ জন নিরপরাধ গ্রামবাসীকে হত্যা করে তারা।

এছাড়া, পাকিস্তানি হানাদাররা গ্রামের ১৪-১৫টি ঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়, যার ফলে গ্রামবাসীদের সম্পত্তি এবং জীবিকা ধ্বংস হয়ে যায়। এই আগুনের লেলিহান শিখা গ্রামের আকাশকে কালো করে তুলেছিল, এবং এটি শুধুমাত্র শারীরিক ক্ষতি নয়, বরং মানসিক আঘাতেরও কারণ হয়ে দাঁড়ায়। গণহত্যার খবর পেয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ১৫-১৬ জন সদস্য এবং খন্দকার বাড়ির ডা. আবদুল খালেকসহ ৬-৭ জন স্থানীয় ব্যক্তি সন্ধ্যায় খন্দকার বাড়িতে আসেন। তারা বাড়ির সামনে একটি গর্ত খুড়ে এক পাশে পুরুষদের এবং অন্য পাশে নারী ও শিশুদের কবর দেন। এই কবর দেওয়ার দৃশ্যটি মুক্তিযুদ্ধের সাহস এবং সংহতির একটি প্রতীক।

শহীদদের সংখ্যা এবং পরিচয়

কৃষ্ণপুর-ধনঞ্জয় গণহত্যায় মোট শতাধিক মানুষ শহীদ হন, যা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যা। এদের মধ্যে ৩৩ জনের পরিচয় সুনির্দিষ্টভাবে জানা গেছে। তাদের নামগুলো নিম্নরূপ:

  • শরাফত আলী এবং তার মেয়ে হাফেজা খাতুন
  • হামিদন বিবি
  • খন্দকার শামসুল হুদা
  • কেরামত আলী
  • আবুল হাসেম
  • চক্কু মিয়া
  • মোহাম্মদ আলী
  • আব্দুল লতিফ
  • সহিদন বিবি
  • জামাল মিঞা
  • বকুল আক্তার
  • শিল্পী আক্তার
  • তাহের মিঞা
  • হাফেজা খাতুন
  • সৈয়দ আলী
  • আবদুর রাজ্জাক
  • করচন বিবি
  • রাবেয়া খাতুন
  • কাদের মিয়া
  • মুকশু মিয়া
  • ফজল মিঞা
  • সমশের আলী
  • হাজেরা বেগম
  • ছোবহান মিয়া
  • আবদুল হামিদ
  • মঞ্জুর আলী
  • সালেহা খাতুন
  • জসিমউদ্দিন
  • সাজেদা খাতুন
  • জোহরা খাতুন
  • রহিম আলী
  • মো. সেলিম

এই শহীদরা শুধুমাত্র সংখ্যা নয়, তারা ছিলেন সাধারণ গ্রামবাসী, কৃষক, মজুর এবং পরিবারের সদস্য, যাদের জীবন স্বাধীনতার সংগ্রামে বলিদান হয়েছে।

উত্তরকাল: স্মৃতি এবং প্রভাব

এই গণহত্যার পর এলাকায় একটি গভীর শোকের ছায়া নেমে আসে। শহীদদের স্মরণে কৃষ্ণপুর-ধনঞ্জয় এলাকায় একটি স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপিত হয়েছে, যা আজও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি জাগিয়ে রাখে। এই স্মৃতিস্তম্ভটি শুধুমাত্র একটি স্থাপত্য নয়, বরং স্বাধীনতার মূল্যবোধ এবং শহীদদের ত্যাগের প্রতীক। এই ঘটনা মুক্তিযুদ্ধের অন্যান্য গণহত্যার মতোই বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত, যা আজও আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে স্বাধীনতা কতটা মূল্যবান এবং কতটা রক্তের বিনিময়ে অর্জিত।

সূত্র:

বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ ২য় খণ্ড [শফিউদ্দিন তালুকদার ও মামুন সিদ্দিকী]

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

হামে শিশু মৃত্যু ও মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির প্রতিবাদে মানববন্ধন, ১০ দফা দাবি

কক্সবাজারে হামের ভয়াবহ রূপ / ২০ বেডে ৮৭ শিশু

হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ / গর্ভের শিশুর লিঙ্গ পরিচয় প্রকাশ করা যাবে না

৩ বিভাগে অতি ভারী বর্ষণের সতর্কতা: সিলেটে জলাবদ্ধতার আশঙ্কা

দ্য প্রাইম মিনিস্টার-এ ফ্যামিলি ম্যান!

পেস ত্রয়ীকে বিশ্রাম দিয়ে তরুণ দল পাঠাচ্ছে অস্ট্রেলিয়া

লক্ষ্য বড় চুক্তি / বাণিজ্য যুদ্ধ ও ইরান উত্তাপের মধ্যেই বেইজিং যাচ্ছেন ট্রাম্প

দেশে হামের প্রকোপ ভয়াবহ / মৃত্যু ছাড়াল ৪০০, একদিনে ঝরল ১১ প্রাণ

১১ মে ১৯৭১: আর্তমানবতার পক্ষে কেনেডির গর্জন ও বিশ্ববিবেকের জাগরণ

মঙ্গল শোভাযাত্রা—বিশ্বমঞ্চে বাঙালির অসাম্প্রদায়িকতার জয়গান

১০

বুননশৈলীর মহাকাব্য—ঐতিহ্যবাহী জামদানি

১১

পদ্মা সেতু: বাংলাদেশের সক্ষমতা ও গৌরবের মহাকাব্য

১২

অবশেষে হামে ধরা খেলেন সওদাগর!

১৩

৩৬০ প্রাণের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল মেঘনা-ফুলদী তীর

১৪

মার্কিন-বাংলাদেশ বাণিজ্যচুক্তি: শর্তের বেড়াজালে সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থের সংকট

১৫

৯ মে ১৯৭১: আন্তর্জাতিক নিষ্ক্রিয়তায় ক্ষোভ ও পাক-হানাদারের নির্মমতা

১৬

সবাই তো এখন মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান!

১৭

ইউনূস সরকারের করা বাণিজ্য চুক্তির আদ্যোপান্ত, পড়ুন পুরো চুক্তিটি

১৮

সবার আগে দেশ, তার আগে আমেরিকা

১৯

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তির বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টে রিট

২০