

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিধ্বংসী হামলার মুখে নজিরবিহীন পাল্টা আক্রমণ শুরু করেছে ইরান। তেহরানের এই অনমনীয় মনোভাবের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের সমীকরণ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে মার্কিন সামরিক বাহিনী এখন কয়েক সপ্তাহ নয়, বরং আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। পেন্টাগন ও সেন্টকমের সাম্প্রতিক তৎপরতা এবং মিত্র দেশগুলোর সম্পৃক্ততা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এই সংঘাত এক ভয়াবহ আঞ্চলিক যুদ্ধের রূপ নিতে যাচ্ছে।
রণক্ষেত্রে নতুন মোড়: মার্কিন ঘাঁটিতে ড্রোন হামলা
গত বৃহস্পতিবার ইরাক ও কুয়েতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানের ড্রোন সফলভাবে আঘাত হেনেছে। পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের একটি তেলবাহী জাহাজেও হামলার দাবি করেছে তেহরান। ইরানের ইসলামি রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা ১৯তম ধাপে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ২০টি সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় এখন পর্যন্ত ৬ মার্কিন সেনা ও ১১ ইসরায়েলি নিহতের খবর পাওয়া গেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, তাদের ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ইরান ১৩১টি ড্রোন ও ৬টি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। কাতার ও বাহরাইনেও ভয়াবহ বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। এমনকি ওমান সাগর ও পারস্য উপসাগরে মার্কিন ও বাহামার পতাকাবাহী ট্যাঙ্কারে রহস্যময় হামলার ঘটনা ঘটেছে।
পেন্টাগনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ইরানের পাল্টা হামলা প্রতিহত করতে হিমশিম খাচ্ছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ফ্লোরিডার টাম্পায় অবস্থিত সদর দপ্তরে অতিরিক্ত গোয়েন্দা কর্মকর্তা নিয়োগের অনুরোধ জানিয়েছে তারা। সংবাদমাধ্যম পলিটিকো জানিয়েছে, এই কর্মকর্তারা অন্তত ১০০ দিন বা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কাজ করবেন—এমন পরিকল্পনা সাজানো হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক মন্ত্রী হেমিশ ফলকনারও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, এই সংকট কয়েক মাস স্থায়ী হতে পারে।
ইরানে মানবিক বিপর্যয়
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অব্যাহত বোমা হামলায় ইরানে নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ২৩০ ছাড়িয়েছে, যার মধ্যে ১৮০ জনই শিশু। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, অন্তত ১৭৪টি শহরে হামলা চালানো হয়েছে এবং ধ্বংস হয়েছে হাজার হাজার বেসামরিক স্থাপনা ও ১৩টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র। জনশূন্য তেহরানের রাস্তাঘাট এখন কেবল ধ্বংসস্তূপ আর দীর্ঘশ্বাসের সাক্ষী।
বিশ্লেষকদের চোখে ‘ভুল কৌশল’
জর্জ টাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল-আরিয়ান মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের অভ্যন্তরীণ শক্তি সম্পর্কে ভুল ধারণা পোষণ করছিল। লিবিয়ার গাদ্দাফি বা ইরাকের সাদ্দাম হোসেনের মতো একক নেতাকে সরিয়ে দিলেই পুরো রাষ্ট্র ভেঙে পড়বে—এমন ধারণা এখন বুমেরাং হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরান তার শাসনকাঠামো ধরে রেখে যেভাবে পাল্টা আঘাত হানছে, তাতে যুক্তরাষ্ট্র এখন এক ‘অবিশ্বাস্য কঠিন’ পরিস্থিতির মুখোমুখি।
মিত্রদের অংশগ্রহণ ও রাশিয়ার হুঁশিয়ারি
যুদ্ধ এখন ইরান ছাড়িয়ে আজারবাইজানসহ ১৩টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। মিত্রদের সুরক্ষায় ইতালি, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য সামরিক সরঞ্জাম ও নৌবাহিনী পাঠাচ্ছে। ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য তাদের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রকে।
অন্যদিকে, রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই যুদ্ধের কঠোর সমালোচনা করে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল উদ্দেশ্যমূলকভাবে আরব দেশগুলোকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে টেনে আনছে। মস্কোর মতে, হামলা বন্ধ না করলে পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই।
অভ্যন্তরীণ চাপে ডোনাল্ড ট্রাম্প
হামলার শুরুতে বিশাল জয়ের দাবি করলেও এখন সুর পাল্টেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। যুদ্ধের সময়সীমা দীর্ঘ হওয়ায় আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের ভরাডুবির আশঙ্কা করছেন স্বয়ং ট্রাম্পের উপদেষ্টারা। রিপাবলিকান কৌশলবিদ ম্যাথিউ বার্টলেট সতর্ক করেছেন যে, সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া এই যুদ্ধ ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
মন্তব্য করুন