ঢাকা মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩
মুক্ত ভাবনামুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

নাটোরের ছাতনী গণহত্যা

প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ০৪ জুন ২০২৬, ০৩:২০ পিএম
নাটোরের ছাতনী গণহত্যা

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার নাটোরে যে কয়েকটি বর্বরোচিত ও সুপরিকল্পিত গণহত্যা সংগঠিত হয়েছিল, তার মধ্যে ৪ জুনের ‘ছাতনী গণহত্যা’ অন্যতম বৃহত্তম এবং চরম নৃশংস। নাটোর শহর থেকে মাত্র ৭ কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত ছাতনী ইউনিয়নের ১১টি গ্রামে চালানো এই নারকীয় অভিযানে শিশু, নারী ও বৃদ্ধসহ এক রাতেই ৪৬৭ জন বাঙালিকে হত্যা করা হয়। এই অঞ্চলের মানুষের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন এবং মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দেওয়ার অপরাধে প্রাক-পরিকল্পিতভাবে এই নিধনযজ্ঞ চালায় পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ও তাদের দোসররা।

ঘটনার তারিখ ৪ জুন ১৯৭১ (২১ জ্যৈষ্ঠ ১৩৭৮ বঙ্গাব্দ, শুক্রবার গভীর রাত)
স্থান নাটোর সদর উপজেলার ছাতনী ইউনিয়ন ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকা (স্লুইস গেট সংলগ্ন গণকবর)
শহীদ সংখ্যা ৪৬৭ জন (নথিভুক্ত ও স্থানীয় সূত্রে প্রাপ্ত)
আক্রমণকারী পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ২৫ বালুচ রেজিমেন্ট, সশস্ত্র বিহারি এবং স্থানীয় আল-বদর ও রাজাকার গোষ্ঠী।

গণহত্যার ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক পটভূমি

ছাতনী ইউনিয়নে এই পৈশাচিক আক্রমণের পেছনে সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও কৌশলগত কারণ ছিল।

নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দু: ছাতনী গ্রামে ছিল তৎকালীন গণপরিষদ সদস্য (MCA), আওয়ামী লীগ নেতা ও নাটোর মহকুমা সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব শংকর গোবিন্দ চৌধুরীর বাসভবন। তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বে ছাতনী ইউনিয়নের সর্বস্তরের মানুষ—কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র ও সাধারণ জনতা—শুরু থেকেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সংগঠিত হতে শুরু করেন।

মুক্তিবাহিনীর ট্রানজিট ক্যাম্প: নাটোর শহর ২৫ মার্চ পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অন্যতম শক্তিশালী গ্যারিসনে (বর্তমানে কন্টনমেন্ট) পরিণত হলে, ছাতনী ইউনিয়নটি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য একটি নিরাপদ ট্রানজিট রুট ও গোপন আশ্রয়স্থল হিসেবে গড়ে ওঠে। এখান থেকে যুবকেরা ভারতের সীমান্ত এলাকার প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে যাতায়াত করত।

পাকিস্তানি ও বিহারিদের আক্রোশ: নাটোর শহরে অবস্থানরত কয়েক হাজার উগ্রপন্থী ও সশস্ত্র বিহারি এবং স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর দালালরা নিয়মিত ছাতনীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছিল। শংকর গোবিন্দ চৌধুরীর বাড়ি এবং পুরো ইউনিয়নকে ‘বিদ্রোহীদের ঘাঁটি’ হিসেবে চিহ্নিত করে মে মাসের শেষ দিকেই এই গণহত্যার নীলনকশা চূড়ান্ত করা হয়।

৪ জুনের অপারেশন: নারকীয়তার কালপঞ্জি

৪ জুন ১৯৭১, গভীর রাতে (অনেকের মতে সময়টি ছিল ৫ জুন ভোরের প্রথম প্রহর) নাটোর গ্যারিসন থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর একটি বড় দল এবং শহরের বড়গাছা ও কালাচাঁদপুর এলাকা থেকে আসা কয়েকশো সশস্ত্র বিহারি সম্পূর্ণ ছাতনী ইউনিয়নকে চারদিক থেকে অবরুদ্ধ করে ফেলে।

১. ঘুমন্ত গ্রামে অতর্কিত হানা

হায়েনারা একই সাথে ১১টি গ্রামে (ছাতনী, নাড়িবাড়ি, শিবপুর, পণ্ডিতগ্রাম, বারোঘড়িরা, ভাটপাড়া, আমহাটি, ভাবনি, হাড়িগাছা, রঘুনাথপুর ও বনবেলঘড়িয়া) চিরুনি অভিযান শুরু করে। তখন গ্রামের সাধারণ মানুষ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। ঘাতকেরা ঘরে ঘরে ঢুকে দরজা ভেঙে পুরুষদের টেনেহেঁচড়ে বের করতে থাকে। যুবতী ও নারীদের ওপর ঘরের ভেতরেই চালানো হয় অকথ্য পাশবিক নির্যাতন।

২. স্লুইস গেটে ডেথ মার্চ (Death March)

আটককৃত নিরপরাধ মানুষদের হাত ও চোখ পিছমোড়া করে বেঁধে লাইনে দাঁড় করিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় ছাতনী স্লুইস গেটের (তৎকালীন স্থানীয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের জলকপাট) কাছাকাছি একটি খোলা মাঠে। শত শত মানুষের আহাজারি, শিশুদের কান্না আর বন্দীদের আর্তনাদে ছাতনীর আকাশ বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। স্থানীয় কুখ্যাত দালাল ও রাজাকার হাফেজ আব্দুর রহমানের সুনির্দিষ্ট নির্দেশে এবং উস্কানিতে ঘাতক দল চূড়ান্ত নিধনযজ্ঞের প্রস্তুতি নেয়।

৩. ব্রাশফায়ার ও বেয়নেটের তাণ্ডব

স্লুইস গেটের সামনে জড়ো করা ৪৬৭ জন বাঙালিকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র দিয়ে ব্রাশফায়ার করা হয়। গুলির শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো এলাকা। যারা গুলি খেয়েও অলৌকিকভাবে বেঁচে ছিলেন বা ছটফট করছিলেন, তাঁদেরকে বুটের নিচে পিষে, বেয়নেট ও ধারালো রামদা দিয়ে খুঁচিয়ে এবং জবাই করে মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়।

৪. এসিড দিয়ে বিকৃতি ও প্রমাণ লোপাট

ছাতনী গণহত্যার সবচেয়ে বীভৎস দিকটি ছিল এর পরবর্তী নৃশংসতা। শহীদদের পরিচয় যেন কোনোভাবেই স্বজনেরা শনাক্ত করতে না পারে এবং যুদ্ধের পরে যেন আন্তর্জাতিক মহলে কোনো প্রমাণ না থাকে, সেজন্য পাকিস্তানি সেনা ও বিহারিরা প্রতিটি লাশের মুখমণ্ডলে তীব্র ক্ষারক এসিড ঢেলে দেয়। এসিডের প্রতিক্রিয়ায় প্রত্যেকের চেনা মুখ গলে বিকৃত কয়লায় পরিণত হয়। এরপর স্লুইস গেটের নিচের ডোবা, ধানের জমি ও আশপাশের পুকুরগুলোতে তড়িঘড়ি করে লাশগুলো মাটিচাপা দেওয়া হয়। অনেক লাশ নদীতেও ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

ক্ষতিগ্রস্ত গ্রামের পরিসংখ্যান ও বিবরণ

গণহত্যার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছাতনী হলেও এর আঁচ লেগেছিল পুরো ইউনিয়ন জুড়েই। আক্রান্ত গ্রামগুলোর চিত্র ছিল নিম্নরূপ:

গ্রামের নাম ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ
ছাতনী ও নাড়িবাড়ি শংকর গোবিন্দ চৌধুরীর বাড়িসহ শতাধিক হিন্দু ও মুসলিম বাড়িঘর গান পাউডার দিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। সবচেয়ে বেশি মানুষ এই দুটি গ্রাম থেকে ধরে আনা হয়েছিল।
পণ্ডিতগ্রাম ও শিবপুর যুবকদের ধরে এনে নির্যাতন করা হয় এবং কৃষিজীবী পরিবারের ধান ও গবাদিপশু লুট করে বিহারিরা নিয়ে যায়।
বারোঘড়িরা, ভাটপাড়া ও আমহাটি পুরুষদের ধরে নিয়ে যাওয়ার পর নারীদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন চালানো হয় এবং সম্পূর্ণ গ্রাম পুরুষশূন্য হয়ে পড়ে।
ভাবনি, হাড়িগাছা, রঘুনাথপুর ও বনবেলঘড়িয়া এই সীমান্ত ঘেঁষা গ্রামগুলোর জঙ্গল ও ডোবা থেকে পরবর্তীতে পচা ও গলিত নরকঙ্কাল উদ্ধার করা হয়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান ও স্মৃতিকথা

পরবর্তীতে অনুসন্ধান ও মুক্তিযুদ্ধ গবেষকদের সংগৃহীত তথ্যে কয়েকজন অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া মানুষের জবানবন্দি পাওয়া যায়:

ক্ষতিগ্রস্ত এক জননী (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক): “ওরা আমার স্বামী আর দুই জোয়ান ছেলেকে চোখের সামনে থেকে তুলে নিয়ে গেল। মেঝের ওপর রক্ত পড়েছিল। সকালে যখন স্লুইস গেটের দিকে গেলাম, দেখি নদীর পানি লাল। আমার চেনার উপায় ছিল না কোনটা আমার ছেলের লাশ, মুখগুলো সব পুড়ে খসখসে কালো হয়ে গিয়েছিল।”

স্থানীয় এক বীর মুক্তিযোদ্ধা: “৪ জুনের এই খবর যখন আমাদের ক্যাম্পে পৌঁছায়, আমরা কান্নায় ভেঙে পড়েছিলাম। আমাদের রসদ ও আশ্রয়ের মূল শক্তি ছিল ছাতনী। এই গণহত্যার প্রতিশোধ নিতেই পরবর্তীতে আমরা নাটোর শহরের পিস কমিটির সদস্যদের ওপর বেশ কয়েকটি গেরিলা হামলা চালাই।”

উত্তর-যুদ্ধ পরিস্থিতি ও বর্তমান স্মৃতি সংরক্ষণ

দেশ স্বাধীনের পর ছাতনী স্লুইস গেট এলাকাটি নাটোরের অন্যতম বৃহৎ বধ্যভূমি হিসেবে চিহ্নিত হয়। স্বজনেরা ডোবা ও গর্ত থেকে হাড়গোড় উদ্ধার করে ধর্মীয় রীতিতে সমাহিত করার চেষ্টা করেন।

বর্তমানে স্থানীয় সামাজিক সংগঠন এবং শংকর গোবিন্দ চৌধুরীর পরিবারের উদ্যোগে শহীদদের স্মরণে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে। প্রতি বছর ৪ জুন ‘ছাতনী গণহত্যা দিবস’ হিসেবে নাটোরে অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্যের সাথে পালিত হয়, যেখানে শহীদ পরিবারের সদস্যরা এসে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং বধ্যভূমিটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় সংরক্ষণের দাবি জানান।

তথ্যসূত্র

১. বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র: অষ্টম খণ্ড (গণহত্যা ও বধ্যভূমি অধ্যায়)।

২. ৪ জুন ১৯৭১: ছাতনী গণহত্যা, বিশেষ অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন, দ্য ডেইলি স্টার (The Daily Star), ৫ জুন ২০২১।

৩. নাটোরের ছাতনী গণহত্যা দিবস, রাইজিংবিডি.কম (Risingbd), ৪ জুন ২০১৪।

৪. মুক্তিযুদ্ধে নাটোর: আঞ্চলিক ইতিহাস ও বধ্যভূমি জরিপ — ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি।

৫. দৈনিক উত্তরাঞ্চল (নাটোর জেলা আর্কাইভ), বিশেষ সংখ্যা, ১৯৯৩।

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

‘অসৎ মানুষের হাতে এআই গেলে ১০০ কোটি মানুষের মৃত্যু হতে পারে’

১

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র / বাংলাদেশে জ্বালানি নিয়ে আসা বিমানকে আকাশসীমায় ঢুকতে দেয়নি পাকিস্তান

২

শহীদ তাজুলের স্মৃতিতে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তরুণ প্রজন্ম

৩

ফুলেল শ্রদ্ধায় শহীদ মিনারে আখতার হুসেনকে শেষবিদায়

৪

রাশিয়ার পার্লামেন্ট নির্বাচনে এগিয়ে পুতিনের ইউনাইটেড রাশিয়া

৫

জামায়াত এমপি নজরুলের বাসায় উদ্ধারকৃত চিঠিতে মরিয়মের যা লেখা

৬

জামায়াত এমপি নজরুলের বিরুদ্ধে নির্যাতন ও প্ররোচনার মামলা

৭

সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড: কবিতা, গান ও ক্যানভাসে শরণার্থী জীবনের করুণ আখ্যান

৮

যুক্তরাষ্ট্রকে ৭ শর্ত দিল ইরান, না মানলে ‘চূড়ান্ত যুদ্ধ’

৯

নজিরবিহীন জালিয়াতি / বাংলাদেশ ব্যাংকে পদ ছাড়াই ৩৬৫ জনের নিয়োগ ও পদোন্নতি

১০

অপ্রতিম হত্যা: কিশোর গ্যাং, অপরাধ চক্র ও পুলিশের ভূমিকা

১১

আজ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’

১২

‘বারবার মামলা না দিয়ে গুলি করে মেরে ফেলেন’

১৩

আসিফের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ, অনুসন্ধানে দুদক

১৪

সিঙ্গাপুরেও মিলল বাড়ি ও ব্যাংক হিসাব / সাবেক ভূমিমন্ত্রী জাবেদের ১০ হাজার কোটি টাকার বিদেশি সম্পদ জব্দ

১৫

​​​​​​​শীতলক্ষ্যায় নিখোঁজ চারজনের মধ্যে ৩ জনের লাশ উদ্ধার

১৬

মোদী-পেজেশকিয়ান বৈঠক: মধ্যপ্রাচ্য সংকটে সংলাপ ও নিরাপদ সমুদ্রপথের তাগিদ

১৭

গুলশানে আ’লীগের মিছিল, গ্রেপ্তার ৩২

১৮

সমকাল কার্যালয়ে সাবেক ব্যুরো প্রধানের লাশ উদ্ধার

১৯

রংপুরে চার খুন: নেপথ্যে স্থানীয় বিএনপি নেতা, গৃহশিক্ষিকা ও পুলিশ কর্মকর্তা

২০