

১৯৭১ সালের ২৬ মে ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের একটি অন্যতম ঘটনাবহুল ও রক্তস্নাত দিন। একদিকে দেশের অভ্যন্তরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা মেতে উঠেছিল বর্বরতম হত্যাযজ্ঞে, অন্যদিকে বীর মুক্তিযোদ্ধারা গড়ে তুলেছিলেন তীব্র প্রতিরোধ। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও এদিন বাংলাদেশের সংঘাত নিয়ে বিশ্বশক্তিগুলোর বিপরীতমুখী অবস্থান এবং কূটনৈতিক তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো। একই সাথে, কলকাতায় অবরুদ্ধ ও প্রবাসী বাঙালিদের মাঝে উদযাপিত হয়েছিল বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মদিন।
১. দেশব্যাপী গণহত্যা ও বর্বরতা
বুরুঙ্গা গণহত্যা (সিলেট)
২৬ মে দুপুরের দিকে সিলেটের বালাগঞ্জের (বর্তমান ওসমানীনগর) বুরুঙ্গা গ্রামে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী স্থানীয় দালালদের সহযোগিতায় এক নৃশংস গণহত্যা সংঘটিত করে।
পটভূমি: এর আগের দিন (২৫ মে) পাকিস্তানি বাহিনী আসার খবরে গ্রামবাসীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়ালে স্থানীয় চেয়ারম্যান ইনজাদ আলীর নির্দেশে ঢোল পিটিয়ে ঘোষণা করা হয় যে, ২৬ মে বুরুঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে 'শান্তি কমিটি' গঠন ও 'পিস কার্ড' বিতরণ করা হবে।
হত্যাকাণ্ড: চেয়ারম্যানের আশ্বাসে বিশ্বাস করে সকাল ৮টার মধ্যে বিদ্যালয় মাঠে প্রায় সহস্রাধিক মানুষ সমবেত হন। সকাল ৯টার দিকে রাজাকার আব্দুল আহাদ চৌধুরী, ড. আব্দুল খালেক এবং ক্যাপ্টেন নূর উদ্দিনের নেতৃত্বে পাকিস্তানি সেনারা জিপে করে সেখানে উপস্থিত হয়।
পৈশাচিকতা: সকাল ১০টার দিকে হিন্দু ও মুসলিমদের আলাদা করা হয়। মুসলিমদের একটি শ্রেণীকক্ষে নিয়ে কালেমা ও পাকিস্তানের জাতীয় সংগীত পাঠ করিয়ে অধিকাংশকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে যাওয়ার আগে তাদেরই চারগাছি দড়ি দিয়ে হিন্দুদের বাঁধতে বাধ্য করা হয়। এরপর দুপুর ১২টার দিকে ক্যাপ্টেন নূর উদ্দিনের নির্দেশে ৯০ জন হিন্দু ধর্মাবলম্বীকে তিনটি সারিতে দাঁড় করিয়ে মেশিনগানের ব্রাশফায়ারে হত্যা করা হয়।
পরবর্তী তাণ্ডব: গণহত্যা শেষে লাশগুলো কেরোসিন ঢেলে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপর সিলেট জজ কোর্টের প্রখ্যাত আইনজীবী রাম রঞ্জন ভট্টাচার্যকে চেয়ার থেকে ডেকে তুলে পেছন থেকে গুলি করে হত্যা করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শী শ্রীনিবাস চক্রবর্তীর মতে, এই গণহত্যায় মোট ৯৪ জন নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়। পরবর্তীতে আহাদ চৌধুরী ও খালেক ডাক্তারের নেতৃত্বে গ্রামে ব্যাপক লুটপাট চালানো হয়।
ছাতকে তরুণদের হত্যা
মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে যাওয়ার পথে ১৮ জন বাঙালি তরুণ বেতুরার চেয়ারম্যান ও তার রাজাকার বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন। রাজাকাররা তাদের পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে তুলে দিলে ছাতক-গোবিন্দগঞ্জ সড়কের মাধবপুরের কাছে ১৭ জনকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। মাত্র একজন তরুণ অলৌকিকভাবে পালিয়ে প্রাণে বাঁচেন।
২. রণাঙ্গনের বীরত্বগাথা ও প্রতিরোধ যুদ্ধ
এদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে বীর মুক্তিযোদ্ধারা সফল ও অতর্কিত আক্রমণ পরিচালনা করেন:
জগন্নাথ দিঘি (কুমিল্লা): কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের জগন্নাথ দিঘির পাকিস্তানি সেনা ক্যাম্পে মুক্তিবাহিনীর একদল মুক্তিযোদ্ধা অতর্কিত হামলা চালান। এই সফল গেরিলা হামলায় পাকিস্তানি বাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয় এবং তাদের সহযোগী খুলনার সাবেক এমপিএ আবদুল হামিদ ও বাগেরহাটের মুসলিম লীগ নেতা আবদুস সাত্তার নিহত হন।
উজানিশার সেতু (ব্রাহ্মণবাড়িয়া): ব্রাহ্মণবাড়িয়া-কুমিল্লা সড়কের উজানিশার সেতুর নিকট পাহারারত পাকিস্তানি ক্যাম্পে মুক্তিবাহিনীর টহল দল আকস্মিক আক্রমণ চালায়। এতে ১৩ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত এবং ৩ জন আহত হয়। আক্রমণের পর মুক্তিযোদ্ধারা বিস্ফোরক দিয়ে সেতুর একটি স্প্যান ধ্বংস করে দেন।
কালুরঘাট (কুড়িগ্রাম): কুড়িগ্রামের কালুরঘাটে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি 'রেকি' (Reconnaissance) দলের সাথে পাকিস্তানি বাহিনীর সম্মুখ যুদ্ধ হয়। এতে ২ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়।
পাটেশ্বরী ঘাঁটি (ভূরুঙ্গামারী): পাকিস্তানি বাহিনী ভারী কামানের সাহায্যে ধরলা নদীর দক্ষিণ তীর থেকে মুক্তিবাহিনীর পাটেশ্বরী প্রতিরোধ ঘাঁটিতে তীব্র গোলাবর্ষণ শুরু করে। প্রচণ্ড আক্রমণের মুখে টিকতে না পেরে মুক্তিযোদ্ধারা ভূরুঙ্গামারীর দিকে পিছু হটেন এবং এই প্রতিরোধ ঘাঁটিটি ভেঙে যায়।
৩. আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও কূটনৈতিক তৎপরতা
লোকসভায় ইন্দিরা গান্ধীর ঐতিহাসিক ভাষণ
ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী লোকসভায় পূর্ববঙ্গের পরিস্থিতি নিয়ে পরপর তিন দিন বক্তব্য দেন। তিনি বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন:
“বাংলাদেশে যে ভয়ংকর অবস্থা ও ঠান্ডা মাথায় গণহত্যা চলছে, তাতে বিশ্ববাসীকে এগিয়ে এসে দায়িত্ব নিতে হবে। অন্যথায় এর পরিণাম বিপজ্জনক ও বিপর্যয়কর হবে।”
তিনি উল্লেখ করেন, এই সংকট এখন আর কেবল পূর্ব বাংলার নয়, বরং ভারত তথা সমগ্র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শান্তির জন্য বড় হুমকি। শরণার্থীদের তীব্র বাস্তুসমস্যার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভারত সরকার যেকোনো ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত এবং বাংলাদেশের স্বার্থের কথা বিবেচনা করেই "বাংলাদেশকে স্বীকৃতি" দেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে ভেবে দেখা হচ্ছে।
এদিকে দিল্লির এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, সীমান্তে পাকিস্তানি অনুপ্রবেশ ও হামলার কারণে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সেনাবাহিনীকে সম্পূর্ণ প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিশ্বশক্তির অবস্থান ও দ্বিমুখী নীতি
যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘ: জাতিসংঘের এক মুখপাত্র জানান, পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভারতে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীদের সাহায্য করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তুত। একই সাথে জাতিসংঘের মহাসচিব উ থান্ট এবং পাকিস্তানের স্থায়ী প্রতিনিধি আগা শাহীর মধ্যে মানবিক সহায়তা নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। তবে ওয়াশিংটন থেকে মার্কিন পররাষ্ট্র বিভাগের প্রধান চার্লস ডব্লিউ ব্রে এক বিবৃতিতে একে পাকিস্তানের "অভ্যন্তরীণ বিষয়" বলে উল্লেখ করেন এবং ভারত-পাকিস্তান উভয় পক্ষকে সংযত থাকার অনুরোধ জানান।
চীন: করাচিতে চীনের কনসুলেট জেনারেল কুন চি পাকিস্তানের পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেন, অখণ্ড পাকিস্তান রক্ষায় চীন সব ধরনের সহযোগিতা করবে এবং পাকিস্তানের ওপর কোনো বহিঃআক্রমণ হলে সামরিক সাহায্য দিতেও দ্বিধাবোধ করবে না।
নিউজিল্যান্ড: সিঙ্গাপুর সফরকালে নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী কিথ হলিয়ক পূর্ব পাকিস্তানের গণহত্যাকে “নির্মমতার চরম সীমা” বলে আখ্যা দেন এবং বলেন যে এই পরিস্থিতিতে নিউজিল্যান্ড চুপ থাকতে পারে না।
ওয়ার অন ওয়ান্ট-এর প্রতিনিধি দলের বক্তব্য
ব্রিটিশ স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘ওয়ার অন ওয়ান্ট’-এর দুই প্রতিনিধি রেভারেন্ড ব্রুসকেন্ট ও জন হরগান সীমান্ত এলাকা পরিদর্শন শেষে কলকাতায় জানান, পাকিস্তান সরকার তাদের পূর্ব পাকিস্তানে প্রবেশের অনুমতি দেয়নি। তবে শরণার্থীদের কাছ থেকে তারা পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞের বিবরণ পেয়েছেন। মানবিক কারণে সীমান্ত খুলে দেওয়ায় তারা ভারত সরকারকে ধন্যবাদ জানান।
৪. ব্রিটেনে ক্রিকেট মাঠে বাঙালির অভিনব প্রতিবাদ
ব্রিটেনের কেন্টের ক্রিকেট মাঠে পাকিস্তান দল ও কেন্ট কাউন্টি দলের মধ্যকার ম্যাচ চলাকালীন প্রায় ৫০-৬০ জন প্রবাসী বাঙালি প্ল্যাকার্ড হাতে মাঠে প্রবেশ করেন। তারা দর্শকদের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের গণহত্যার বিবরণ সম্বলিত লিফলেট বিতরণ করেন। প্রতিবাদকারীরা মাঠের সাইট স্ক্রিনের সামনে সারিবদ্ধভাবে হেঁটে নীরব বিক্ষোভ প্রদর্শন করলে কিছুক্ষণের জন্য খেলা বন্ধ থাকে। বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণে এটি ছিল এক অনন্য প্রতিবাদ।
৫. কলকাতায় বিদ্রোহী কবির ৭২তম জন্মজয়ন্তী উদযাপন
২৬ মে (১১ জ্যৈষ্ঠ) ছিল কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৭২তম জন্মজয়ন্তী (৭৩ বছরে পদার্পণ)। অবরুদ্ধ স্বদেশের বুক থেকে দূরে কলকাতায় প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগে কবিকে যথাযোগ্য মর্যাদায় স্মরণ করা হয়।
সকালে বাংলাদেশ মিশনের প্রধান এম হোসেন আলী কবি ভবনে গিয়ে কবিকে এবং তাঁর সহধর্মিণীকে পুষ্পস্তবক দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। সন্ধ্যায় সরকারের পক্ষ থেকে পুনরায় শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। রণেশ দাশগুপ্তসহ বহু বাংলাদেশি লেখক, কবি, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী কবিকে দেখতে যান।
পশ্চিমবঙ্গ নজরুল একাডেমির সহায়তায় বাংলাদেশ মিশনের সামনে একটি বিশেষ সঙ্গীতানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। গণনাট্য সংস্থার শিল্পীদের ‘তোরা সব জয়ধ্বনি কর’ গানের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। অনুষ্ঠানটি শেষ হয় বিশিষ্ট রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী সন্জীদা খাতুনের কণ্ঠে ‘আমার সোনার বাংলা’ গানের মাধ্যমে, যেখানে উপস্থিত সবাই দাঁড়িয়ে সমবেত কণ্ঠে গলা মেলান এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগের শপথ নেন।
তথ্যসূত্র:
১. বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র: সপ্তম, অষ্টম, নবম, দ্বাদশ, ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ খণ্ড।
২. বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস (সেক্টর ১, ২, ৩, ৪ ও ৬)।
৩. দৈনিক পাকিস্তান, ২৭ মে ১৯৭১।
৪. দৈনিক পূর্বদেশ, ২৭ ও ২৮ মে ১৯৭১।
৫. দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা (ভারত), ২৭ মে ১৯৭১।
৬. দৈনিক অমৃতবাজার পত্রিকা (ভারত), ২৭ মে ১৯৭১।
৭. দৈনিক যুগান্তর (ভারত), ২৭ মে ১৯৭১।
মন্তব্য করুন