
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রাণশক্তি ও কাঁচামালের বড় জোগানদার জাহাজভাঙা (শিপব্রেকিং) শিল্প। বিশ্ববাজারের চাপ ও আন্তর্জাতিক সনদের শর্ত মেনে পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ গঠনে ইয়ার্ডগুলোকে 'গ্রিন ইয়ার্ড'-এ রূপান্তর করতে উদ্যোক্তারা বিপুল মূলধন বিনিয়োগ করছেন। তবে ভৌত অবকাঠামোর ঝলমলে পরিবর্তন ও হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগের পরও সীতাকুণ্ড উপকূলে কমছে না মারাত্মক দুর্ঘটনা ও শ্রমিকের করুণ মৃত্যু।
গ্রিন ইয়ার্ডের সুবাতাস, অথচ জীবনের ঝুঁকি অপরিবর্তিত
২০২০ সালে দেশে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক সনদপ্রাপ্ত পরিবেশবান্ধব গ্রিন শিপব্রেকিং ইয়ার্ডের সূচনা ঘটে। হংকং কনভেনশন (HKC) অনুসরণে বিশ্বমানের মানদণ্ড অর্জনের লক্ষ্যে প্রতিটি ইয়ার্ডের অবকাঠামো আধুনিকায়নে উদ্যোক্তারা আকারভেদে ৫০ থেকে ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত বিনিয়োগ করেছেন। কংক্রিটের মেঝে, ভারী ক্রেন, ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত হলেও শ্রমিকের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও জীবন সুরক্ষার দিকটি এখনো অবহেলিত।
চলতি ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা ইয়ার্ডগুলোতে অন্তত ২৮টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারিয়েছেন ৩ জন শ্রমিক এবং পঙ্গুত্বসহ গুরুতর আহত হয়েছেন অন্তত ২৫ জন। আন্তর্জাতিক সনদের কাগজ নিশ্চিত হলেও বাস্তব কর্মক্ষেত্রে বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে শ্রমিকদের।
দেড় দশকের ভয়াবহ পরিসংখ্যান: ঝরেছে শতাধিক তাজা প্রাণ
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (BILS)-এর সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ বছরে সীতাকুণ্ড উপকূলীয় শিপব্রেকিং অঞ্চলে ২০০টিরও বেশি বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রাণ হারিয়েছেন শতাধিক শ্রমিক এবং চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ কিংবা গুরুতর আহত হয়েছেন পাঁচ শতাধিক সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ।
বিগত বছরগুলোর দুর্ঘটনার করুণ চিত্র
২০২৬ (প্রথম ৬ মাস): ২৮টি দুর্ঘটনা | ৩ জন নিহত | ২৫ জন আহত
২০২৫: ৪৮টি দুর্ঘটনা | ৪ জন নিহত | ৫৮ জন আহত
২০২৪: ২৮টি দুর্ঘটনা | ৭ জন নিহত | ৩৬ জন আহত
২০২৩: ৩৪টি দুর্ঘটনা | ৭ জন নিহত | ২৮ জন আহত
এছাড়াও বিগত বছরগুলোর পরিসংখ্যানে দেখা যায়—২০২০ সালে ১০ জন, ২০১৯ সালে ২২ জন, ২০১৮ সালে ১৩ জন, ২০১৭ সালে ১৮ জন এবং ২০১৬ সালে ১৮ জন শ্রমিকের মর্মান্তিক অকালমৃত্যু ঘটে। এই ধারাবাহিক মৃত্যুমিছিল প্রমাণ করে যে, প্রযুক্তির ছোঁয়া লাগলেও কাজের সুনির্দিষ্ট ঝুঁকি হ্রাসে কোনো কার্যকর অগ্রগতি হয়নি।
দুর্ঘটনার মূল কারণ ও নিরাপত্তা খাতের ঘাটতি
শিল্প খাতের বিশেষজ্ঞ ও শ্রমিক অধিকার সংগঠনগুলোর বিশ্লেষণে দুর্ঘটনার মূল কারণ হিসেবে বেশ কিছু গুরুতর গাফিলতি উঠে এসেছে:
উত্তরণের পথ ও সুপারিশ
জাহাজভাঙা শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে এবং শ্রমিকদের জীবনের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কেবল 'গ্রিন' তকমা পাওয়াই যথেষ্ট নয়। কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের এখনই উপযুক্ত সময়:
দেশের শিল্প প্রবৃদ্ধি ও ইস্পাত খাতের জোগান নিশ্চিত করতে জাহাজভাঙা শিল্পের গুরুত্ব অপরিসীম। তবে এই অগ্রগতি কোনোভাবেই শ্রমিকের রক্তের বিনিময়ে হতে পারে না। বাহ্যিক কাঠামোর পরিবর্তনের পাশাপাশি শ্রমিকের সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সঠিক নীতিগত নজরদারি প্রতিষ্ঠা করাই এখন সময়ের দাবি।
মন্তব্য করুন