ঢাকা মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬, ১৭ চৈত্র ১৪৩৩
মুক্ত মনমুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

দূষণ বনাম পরিবেশ পুলিশের আবশ্যকতা

মো. খালিদুল হক হাওলাদার
২১ জুন ২০২৫, ১২:৫৬ পিএম
২১ জুন ২০২৫, ০১:১৫ পিএম
দূষণ বনাম পরিবেশ পুলিশের আবশ্যকতা

যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার পরিবেশ পুলিশ: ১৮৬১ সালে, আর্চডিকন চার্লস থর্প ইংল্যান্ডের উত্তর-পূর্ব উপকূলে অবস্থিত ফার্ন দ্বীপপুঞ্জের কিছু অংশ ক্রয় এবং বিপন্ন সামুদ্রিক পাখি প্রজাতি রক্ষার জন্য একজন ওয়ার্ডেন নিয়োগের ব্যবস্থা করেছিলেন। তাদের কাজ ছিল শিকার রক্ষা করা এবং শিকারিদের ধরা। তারা দূষণ থেকে নদীগুলোকে রক্ষা করার সিদ্ধান্তও নিয়েছিলেন। ১৯৬০ সালে, তাদের পদবি ‘সংরক্ষণ কর্মকর্তা’ (ECO) হিসেবে পরিবর্তন করা হয়, তারপর ১৯৭০ সালে, তাদের নাম পরিবর্তন করে ‘পরিবেশ সংরক্ষণ কর্মকর্তা’ রাখা হয়, সংরক্ষণ বিভাগ এবং রাজ্য স্বাস্থ্য বিভাগ একীভূত হয়ে ‘পরিবেশ সংরক্ষণ বিভাগ’ হয়ে ওঠে। একই সময়ে ভূমিকার মর্যাদা পরিবর্তন করা হয়, যা ECO-গুলোকে পূর্বের তুলনায় আরও বেশি আইনি ক্ষমতা প্রদান করে। আমেরিকায়, সংরক্ষণ কর্মকর্তাদের ECO-এর জন্য রাজ্য সিভিল সার্ভিস পরীক্ষাও দিতে হয় এবং পাস করতে হয়। কানাডার ওয়েস্টার্ন কনজারভেশন ‘ল’ এনফোর্সমেন্ট একাডেমি হলো সেই একাডেমি, যেখান থেকে ইউকন, ব্রিটিশ কলাম্বিয়া, আলবার্টা, সাসকাচোয়ান এবং ম্যানিটোবাসহ পশ্চিম কানাডায় নিযুক্ত সমস্ত কর্মকর্তাকে তাদের নিজ নিজ এখতিয়ারে অফিসার হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার জন্য স্নাতক হতে হবে। এই কর্মসূচিটি ছয় মাসব্যাপী, যার মধ্যে প্রায় দুই মাস সরাসরি তত্ত্বাবধায়কের মাধ্যমে কর্মস্থলে প্রশিক্ষণ হিসেবে ব্যয় করা হয়। প্রশিক্ষণের মধ্যে রয়েছে পোশাক এবং আচরণ, তদন্ত, আগ্নেয়াস্ত্র পরিচালনা, বল প্রয়োগ, দ্রুত জলে উদ্ধার, অফ-রোড যানবাহন ব্যবহার, অনুসন্ধান ওয়ারেন্ট আবেদন এবং কার্যকর করণ এবং আরও অনেক কিছু।

পরিবেশ সংক্রান্ত অপরাধ দমনে পুলিশের ভূমিকা: পরিবেশবিষয়ক অপরাধসমূহ দিন দিন বাড়ছে। অবৈধ বালি উত্তোলন, জমির উপরিভাগের মাটি বিক্রি, পাহাড় কাটা, বন উজাড়, বন্যপ্রাণী শিকার, মৎস্যসম্পদ বিনষ্ট এখনকার নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। বড় বড় নদীসমূহকে শিল্প বর্জ্য থেকে রেহাই দেওয়া যাচ্ছে না। এ সব কার্যকলাপ শুধু পরিবেশকেই ধ্বংস করছে না, জনস্বাস্থ্য ও কৃষি উৎপাদনে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। দূষণের কারণে বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ, বালু নদ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গৃহস্থালির বর্জ্য, শিল্প বর্জ্য, রাসায়নিক বর্জ্য ও অন্যান্য দূষণকারী পদার্থের কারণে দেশের বৃহৎ নদীসমূহ দিনে দিনে দূষিত হয়ে যাচ্ছে। কৃষি, জনস্বাস্থ্য ও সামগ্রিক পরিবেশের ওপর মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিভিন্ন শহরে আজ বড় চ্যালেঞ্জ হয়েছে উঠেছে বায়ুদূষণ। শিল্পকারখানার ধোঁয়া, যানবাহন থেকে নির্গত ধোঁয়া, নির্মাণকাজের ধুলাবলি, এমনকি রান্নাঘর থেকে নির্গত ধোঁয়া সবই বায়ুর মান খারাপের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এতে হাঁপানি, ফুসফুসের সমস্যা ও অন্যান্য শ্বাসযন্ত্রের রোগ তৈরি হয়ে জনজীবন বিপন্ন করছে। বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যপ্রাণীর অবৈধ শিকার জীববৈচিত্র ও ভারসাম্য নষ্ট করছে। এতে পরিবেশ-সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি লঙ্ঘিত হচ্ছে। এনভায়রনমেন্টাল পুলিশ ইউনিট গঠন এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারবে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের অধীনে একটি এনভাইরনমেন্টাল পুলিশ ইউনিট গঠন করা যেতে পারে। এ বাহিনী অপরাধ দমনে নিয়মিত টহল দেবে। আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণ করে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি চালাবে। পাশাপাশি তুলে ধরবে পরিবেশগত অপরাধের নেতিবাচক প্রভাবগুলো। উৎসাহিত করবে পরিবেশবান্ধব আচরণগুলোকে। পুলিশ সংস্কার কমিশন একটি জনবান্ধব এনভায়রনমেন্টাল পুলিশ ইউনিটের প্রস্তাব পাস করিয়ে তা তৈরিতে পজিটিভ ভূমিকা পালন করে দেশকে আরেকটু এগিয়ে নিতে পারে।

বাংলাদেশ অনুন্নত বিশ্বের একটি দেশ। জনসংখ্যার ভারে পীড়িত ও প্রাকৃতিক সম্পদে দীন এ দেশটির পরিবেশ দূষণ এখন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। সমগ্র বিশ্বের পরিবেশবাদী আন্দোলনের সঙ্গে বাংলাদেশের একাত্ম হওয়া দরকার। সম্প্রতি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি বিশেষ জরুরি যোগাযোগ হটলাইন চালু করার ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ হেডকোয়ার্টার; যার মাধ্যমে নিরাপত্তা-সংক্রান্ত যে কোনো ঘটনা তারা সরাসরি জানাতে পারবে এবং তাৎক্ষণিক সহায়তা পাবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি বিশেষ ইউনিটের পক্ষ থেকে সম্প্রতি এ-সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে পুলিশ সংস্কার কমিশনকে। এতে বলা হয়, এনভায়রনমেন্টাল পুলিশ ইউনিট গঠন সময়ের দাবি। কারণ, দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে হুমকি ক্রমাগত বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, অবৈধভাবে বন নিধন, নদীদূষণ এবং বন্যপ্রাণী পাচার দেশের পরিবেশগত ভারসাম্য ও টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুতর সংকট তৈরি করছে। এ ক্ষেত্রে পরিবেশ পুলিশ গঠন একটি রাষ্ট্রের সফল বিনিয়োগ হবে।

লেখক: সিইও, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন, র‌্যাব-২

প্রথম প্রকাশ: কালবেলা, ১৬ জুন ২০২৫

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

৩০ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন ও বিশ্ববিবেকের জাগরণ

ইতিহাসের অবিনশ্বর নক্ষত্র: শহীদ শাফী ইমাম রুমী

২৯ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন ও আত্মাহুতির এক নৃশংস অধ্যায়

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা,আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশ

২৮ মার্চ ১৯৭১: ধ্বংসযজ্ঞের ছাপ আর বাঙালির সুসংগঠিত প্রতিরোধ

২৭ মার্চ ১৯৭১: বিশ্ব জানল, বাংলাদেশ স্বাধীন

২৬ মার্চ ১৯৭১: একটি জাতির রক্তক্ষয়ী সূর্যোদয় ও স্বাধীনতার ঘোষণা

গণহত্যার বিরুদ্ধে শৈল্পিক প্রতিবাদ / ২৫শে মার্চের কালরাত্রি স্মরণে প্রাচ্যনাটের ‘লালযাত্রা’

২৫ মার্চ, ১৯৭১: ইতিহাসের কলঙ্কিত কালরাত ও বিভীষিকাময় গণহত্যা

২৪ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন আর চূড়ান্ত প্রস্তুতির দিন

১০

২৫ মার্চের গণহত্যা স্মরণে ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দাবিতে ‘আলোর মিছিল’

১১

২৫ মার্চ ১৯৭১: গণহত্যার কালরাত্রি ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির লড়াই

১২

জামায়াতকে বিচারের আওতায় আনার দাবি / একাত্তরের গণহত্যা স্বীকৃতির প্রস্তাব মার্কিন কংগ্রেসে

১৩

২৩ মার্চ ১৯৭১: যেদিন পাকিস্তান দিবস হলো প্রতিরোধের নামে

১৪

২২ মার্চ ১৯৭১: আপসহীন সংগ্রামের ঘোষণা এবং ইয়াহিয়ার নতুন চাল

১৫

২১ মার্চ ১৯৭১: নীতির প্রশ্নে আপসহীন বঙ্গবন্ধু এবং ঘনীভূত সামরিক মেঘ

১৬

২০ মার্চ ১৯৭১: টেবিলে আশার আলো, অন্তরালে গণহত্যার নীল নকশা

১৭

১৯ মার্চ ১৯৭১: সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের প্রথম স্ফুলিঙ্গ ও বীরত্বগাঁথা

১৮

১৮ মার্চ ১৯৭১: জান্তার তদন্ত কমিটি প্রত্যাখ্যান ও বঙ্গবন্ধুর ডাক

১৯

১৭ মার্চ ১৯৭১: ‘নরকে বসেও হাসতে পারি’, বঙ্গবন্ধুর বজ্রশপথ

২০