ঢাকা মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬, ১৬ আষাঢ় ১৪৩৩
মুক্ত ভাবনামুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

বিভেদ-বিতর্ক রেখেও ঐক্য গড়া যায়

বিভেদ-বিতর্ক রেখেও ঐক্য গড়া যায়

(১) জুলাই আন্দোলনে যোগ দিয়েছে বলে অনেককে আপনারা 'লাল বাঁদর' বা 'লালবদর' বা ঐরকম নানা বিচিত্র ডাকনাম দিয়েছেন। আমি কখনো এইসব কথা ব্যবহার করিনি, করতে চাই না। এর একটা কারণ আছে। কারণটা বলি।

আমি জামাত বা ঐরকম দক্ষিণপন্থী কোনো দলের সাথে একসাথে দাঁড়িয়ে কোনো আন্দোলন কখনো করবো না। এইটা নিয়ে অধিক আলাপের কিছু নাই। রাজাকার—একচুয়াল বা ইন্টেলেকচুয়াল দুইই—ওদের ব্যাপারেও একই কথা। প্রাণ যাবে যাক, রাজাকারের সাথে আমি এক কাতারে এই মাটিতে দাঁড়াতে পারবো না। আপনারা আমাকে যাইই বলেন, এইগুলি কাজ আমি করবো না। এগুলি হচ্ছে আমার জাতীয় পতাকার উপর বা দুখিনী মায়ের শরীরের উপর নোংরা পায়ে দাঁড়ানোর মতো গর্হিত কাজ আমার কাছে। আর এই আন্দোলনের সূচনা যেটা দিয়ে হয়েছিল—কোটা বিলোপ বা কোটা হ্রাসের দাবি, সেটার সাথে আমি একমত নই। কেননা আমি জানি কোটার লক্ষ্য হচ্ছে বৈষম্য বিলোপ, এটা দরকার। সুতরাং জুলাইয়ের ঐ আন্দোলনের সাথে যে আমি থাকবো না, সেটাই স্বাভাবিক।

আর সেই সাথে এই কথা তো আপনি অস্বীকার করতে পারেন না যে আওয়ামী সরকারের সময় গণতন্ত্র বিঘ্নিত হয়েছে, মানুষের অধিকার হরণ করা হয়েছে, মানুষের কণ্ঠ রুদ্ধ করা হয়েছে। সুতরাং একা গণআন্দোলন তো আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে বৈধ ছিল। সেইসব আন্দোলনের যৌক্তিকতা তো অস্বীকার করতে পারি না। তারপর আন্দোলনের এক পর্যায়ে যখন ছাত্ররা প্রাণ হারাতে শুরু করলো, তখন তো পরিস্থিতি এমন ছিল যে সরকার পতনের আন্দোলনের সাথে যে মানুষ যুক্ত হবে, সেটা অনিবার্য হয়ে পড়েছিল। আমাদের সেলিব্রিটি ধরণের লোকজন তখন সেই আন্দোলনের সাথে গিয়ে সংহতি জানিয়েছেন, সেটাকে আমি নিন্দা করি কি করে? এইজন্য আমি ঐসব কথা ব্যবহার করি না।

(২) কিন্তু এখন তো আমরা আরও বড় বিপদের সম্মুখীন। গণতন্ত্র তো এখন আর বিপন্ন নয়, গণতন্ত্র রীতিমতো নিহত। দেশে এখন খুব জঘন্য কথা যেন একদল লোকের জন্যে বৈধ কাজ হয়ে গেছে। আর নারীর অবস্থা! সেই ৫ই আগস্টে বেগম রোকেয়ার ম্যুরাল বিকৃত করাটা যেন প্রতীকী সূচনা ছিল ওদের জন্যে—এরপর তো নারীর জন্যে বাংলাদেশের অবস্থা জাহান্নামের মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। না, এটাকে আপনি কেবল 'অপরাধ বেড়েছে' বললে ভুল করবেন। এই দেশে এখন নারী হয়ে জীবন যাপন করাটাই যেন একটা অপরাধ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আপনি খবরের কাগজ দেখেন, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের রিপোর্ট দেখেন, আপনার চারপাশের অবস্থা দেখেন। আমি যদি ভুল বলে থাকি, আমাকে বলবেন।

আর মানুষের বাক ও চিন্তার স্বাধীনতা? হাহ। এইটা নিয়ে কথা বলাও তো এখন এই পোড়া দেশে নিরাপদ না। দেশের কারাগারগুলিতে কেবল চেতনার কারণে বন্দীদের সংখ্যা দেখুন। একটা দেশে মানুষের বাক ও চিন্তার স্বাধীনতা আদৌ আছে কিনা এবং থাকলেও তা ঠিক কী মাত্রায় আছে, সেটা পরিমাপের এইটা একটা উত্তম পন্থা—কথা বলার জন্যে কী পরিমাণ মানুষকে হয়রানির শিকার হতে হয়, সেটা দেখা। আপনিই দেখুন, নৈর্ব্যক্তিক বিবেচনায় দেখুন। সেইসাথে সাম্প্রদায়িকতার শিকার মানুষগুলোর প্রতি ঘটমান হয়রানির মাত্রাও দেখুন। আপনিই বিচার করুন, বাকস্বাধীনতা বলে কোনো জিনিস এই দেশে আর অবশিষ্ট আছে কিনা।

এই সময় আমাদের দরকার একটা জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা—গণতন্ত্রের জন্যে। এইটাতে আমার সাথে অনেকেই একমত হবেন, যারা সেই সময় আওয়ামী লীগ-বিরোধী আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। এটা আমি কল্পনা বা অনুমান করে বলছি না, যাদেরকে আপনারা 'লালবদর' ইত্যাদি বলে বকা দিচ্ছেন, তাদের কয়েকজনের সাথে আলাপ করেই আমি এইটাই অনুধাবন করেছি। চব্বিশের শীতেই একটা সামাজিক অনুষ্ঠানে এইরকম একজন তারকার সাথে দেখা হয়। বড় অনুষ্ঠান, অনেক মানুষ, রথী-মহারথীদের সাথে আমার মতো মাঝারি টাইপের কিছু লোকও ছিলেন। বিড়িখোরদের জন্যে একটা কোণায় যে বন্দোবস্ত থাকে, সেখানে গেছি, সেখানে একজন তারকার সাথে দেখা। নাম বললাম না, তিনি আমাকে আগুন দিলেন।

(৩) 'কেমন আছেন?'—'ভালো আছি' ধরণের কথার মধ্যেই তিনি বললেন, "ইমতিয়াজ ভাই, এখন মনে হচ্ছে তখন বোধহয় আমি ভুলই করেছিলাম, আমার এখন রীতিমতো অনুতাপ হয়।" আমি তাঁকে বললাম, "না না, এই কথা বলছেন কেন? যে পরিস্থিতিতে আপনি রাস্তায় নেমেছিলেন, যে ভূমিকা পালন করেছেন, সেই পরিস্থিতিতে সেটা তো একদম ভুল ছিল, সেকথা তো বলা যায় না। আপনি আপনার চেতনায় যেটা ঠিক মনে করেছেন সেটা করেছেন। ভুল কিছু ছিল না। আর আজ যেটা হচ্ছে সেটা তো আপনার কাম্য ছিল না। এখন আপনি কি করতে চান সেটাও আপনি ভাবেন, চিন্তা করেন। সময় নিশ্চয়ই আসবে যখন আপনি আবার মানুষের পাশে দাঁড়াবেন।" সেদিন ঐটুকুই কথা হয়েছে।

আপনারাও আলাপ-আলোচনা করুন নিজেদের মধ্যে। আপনি তো নিজের দেশকে পৃথিবীর নিকৃষ্টতম মিজোজিনিস্ট, হোমোফোবিক, অগণতান্ত্রিক ফ্যাসিস্টদের হাতে ছেড়ে দিতে পারেন না। আপনি তো আমার রাষ্ট্রের গৌরবজনক ইতিহাস মুছে ফেলতে দিতে পারেন না। আপনি তো দেশটাকে পুরোদস্তুর সাম্প্রদায়িক একটা রাষ্ট্রে পরিণত হতে দিতে পারেন না। তাহলে কি করবেন? নিজেদের মধ্যে যে বিভাজনটা তৈরি হয়েছে সেটা ঘুচাতে হবে না? সেটা কিভাবে ঘুচাবেন? জাতীয় ঐক্য কিভাবে গড়বেন? এইগুলি ভাবেন। চিন্তা করেন, আলাপ-আলোচনা শুরু করেন। আপনি যদি প্রত্যাশা করেন যে আপনার বন্ধুরা জুলাইয়ে যার যার ভূমিকার জন্যে ভুল স্বীকার করবে বা মাফ চাইবে, সেটা তো বস্তুনিষ্ঠ চিন্তা নয়।

বিভেদ-বিতর্ক রেখেও ঐক্য গড়া যায়—ঐক্যটা হতে হয় মূল বা চূড়ান্ত লক্ষ্য, নীতি ইত্যাদি প্রশ্নে। কাজের ধরন, কৌশল, পথ—এইসবে ভিন্নমত ঐক্যের ক্ষেত্রে কোনো বড় বাধা নয়।

লেখক: ইমতিয়াজ মাহমুদ, আইনজীবী ও অ্যাক্টিভিস্ট

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

৭ শিল্প অঞ্চলে ৪৫৭ কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ, বিপাকে তৈরি পোশাক খাত

বোবা কান্নার মেঘনা ও আমাদের মরে যাওয়া মনুষ্যত্ব

একের পর এক ‘মিথ্যা’ মামলা, আদালতে ক্ষোভ প্রকাশ করলেন মিষ্টি সুবাস

ভেনেজুয়েলায় জোড়া ভূমিকম্প: আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জরুরি সহায়তা চাইল জাতিসংঘ

তিন মেয়েসহ মাকে কুপিয়ে হত্যা, গণপিটুনিতে ঘাতক নিহত

ভেনেজুয়েলায় ১২৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী জোড়া ভূমিকম্প

২৩ জুন ১৯৭১: আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তোলপাড় এবং প্রতিরোধ যুদ্ধের উত্তাল দিন

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগ

২২ জুন ১৯৭১: নিষেধাজ্ঞা ভেঙে পাকিস্তানে মার্কিন সমরাস্ত্রের চালান

ইরানের ঘোষণার পর হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্থবির

১০

চাঁদাবাজির অভিযোগে আটক এমপিপুত্র সজীব মুচলেকা দিয়ে মুক্ত

১১

তরুণ সমাজকে গ্রাস করছে নতুন প্রজন্মের সিনথেটিক ড্রাগস

১২

২১ জুন ১৯৭১: রণাঙ্গনে প্রতিরোধ যুদ্ধ, যুক্তরাজ্য ও ভারতের যৌথ বিবৃতি

১৩

১৮ জুন ১৯৭১: ঢাকায় দুঃসাহসিক গেরিলা আক্রমণ, কান্দাপাড়া গণহত্যা এবং রণাঙ্গনের প্রতিরোধ

১৪

বাবা নাকি ৭১-এর শহীদ, অথচ জামায়াত এমপির জন্ম ১৯৮১ সালে

১৫

আলজেরিয়াকে উড়িয়ে আর্জেন্টিনার শুভ সূচনা

১৬

১৭ জুন ১৯৭১: জগদীশপুর গণহত্যা, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কূটনৈতিক যুদ্ধ এবং প্রতিরোধ

১৭

১১ জুন ১৯৭১: বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশের পক্ষে সংহতি

১৮

সরকারের প্রথম ১০০ দিনে ৬০৫ খুন

১৯

৭ জুন ১৯৭১: বিশ্বমঞ্চে কূটনৈতিক তৎপরতা ও অবরুদ্ধ বাংলায় প্রতিরোধ

২০