ঢাকা মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬, ১৭ চৈত্র ১৪৩৩
মুক্ত মনমুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

হাসনাবাদ গণহত্যা (নবাবগঞ্জ, ঢাকা)

প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৫:১২ পিএম
হাসনাবাদ গণহত্যা (নবাবগঞ্জ, ঢাকা)

১৯৭১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর নবাবগঞ্জ উপজেলার হাসনাবাদে সংঘটিত গণহত্যায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের স্থানীয় সহযোগীদের হাতে ১২ জন নিরীহ গ্রামবাসী শহীদ হন। এই নৃশংস ঘটনা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি বেদনাদায়ক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।

ঘটনার বিবরণ

ঘটনার দিন পাকিস্তানি সৈন্যরা পার্শ্ববর্তী দোহার থানা হেডকোয়ার্টার্স থেকে মার্চ করে এসে নবাবগঞ্জের হাসনাবাদে পৌঁছে। তারা পথে দোহার থানার পশ্চিম-উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি গ্রাম ও জনপদ অতিক্রম করে। এ সময় তারা ইছামতি নদীবিধৌত ফারি ইক্রাশী ও কাঁচারীঘাট বাজারে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট চালায়। স্থানীয় রাজাকার ও আলবদর বাহিনীর সহায়তায় তারা ইক্রাশী ও কাঁচারীঘাটের হিন্দু ও খ্রিস্টান পল্লীতে হামলা করে। এরপর তারা উত্তর দিকে অগ্রসর হয়ে নবাবগঞ্জ থানার হাসনাবাদের হিন্দু পালপাড়া ও খ্রিস্টান পল্লীতে আক্রমণ চালায়।

পাকিস্তানি সৈন্যরা তাদের সহযোগীদের সহায়তায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে গানপাউডার ব্যবহার করে অগ্নিসংযোগ করে এবং ব্যাপক লুটপাট চালায়। এ সময় তারা বেশ কয়েকজন নারী ও শিশুর ওপর নির্মম নির্যাতন করে। আক্রমণের এক পর্যায়ে তারা হাসনাবাদ গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায়ের ১২ জনকে কাঁচারীঘাটে নদীতীরে নিয়ে গিয়ে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে। এই নৃশংসতার পর পার্শ্ববর্তী এলাকার বাসিন্দারা প্রাণভয়ে পালিয়ে যান।

শহীদদের পরিচয়

হাসনাবাদ গণহত্যায় শহীদ ১২ জনের মধ্যে ১১ জনের পরিচয় জানা গেছে। তারা হলেন:

  • ব্রজেন পাল (পিতা: বৃন্দাবন পাল, হাসনাবাদ)
  • গৌরাঙ্গ পাল (পিতা: কালিচরণ পাল, হাসনাবাদ)
  • ধীরেন পাল (পিতা: সাধু পাল, হাসনাবাদ)
  • শংকর পাল (পিতা: নরেশ পাল, হাসনাবাদ)
  • মাধব সূত্রধর (পিতা: যতীন্দ্র সূত্রধর, হাসনাবাদ)
  • দিলীপ সূত্রধর (পিতা: ত্রৈলক্ষ্য সূত্রধর, হাসনাবাদ)
  • মনোরঞ্জন পাল (হাসনাবাদ)
  • পুলহাত পাল (পিতা: সতীশ পাল, হাসনাবাদ)
  • সুদর্শন পাল (হাসনাবাদ)
  • গোবিন্দ সাহা (নতুন বান্দুরা)
  • অনীল গমেজ (পিতা: পিটার গমেজ, মোলাশীকান্দা)

এই গণহত্যার পর শহীদদের লাশ সমাহিত করার মতো কেউ আশেপাশে ছিল না। ফলে তাদের দেহগুলো নদীতে নিমজ্জিত থাকে এবং এক থেকে দুই দিন পর নদীর স্রোতে ভেসে যায়।

পরিণতি

হাসনাবাদ গণহত্যা মুক্তিযুদ্ধের সময় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর পরিকল্পিত নৃশংসতার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। এই ঘটনা স্থানীয় জনগণের মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি বেদনাদায়ক স্মৃতি হিসেবে রয়ে গেছে।

সূত্র: বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জ্ঞানকোষ, ১০ম খণ্ড (মো. আনোয়ার হোসেন ও আব্দুল মালেক সিকদার)

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

৩০ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন ও বিশ্ববিবেকের জাগরণ

ইতিহাসের অবিনশ্বর নক্ষত্র: শহীদ শাফী ইমাম রুমী

২৯ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন ও আত্মাহুতির এক নৃশংস অধ্যায়

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা,আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশ

২৮ মার্চ ১৯৭১: ধ্বংসযজ্ঞের ছাপ আর বাঙালির সুসংগঠিত প্রতিরোধ

২৭ মার্চ ১৯৭১: বিশ্ব জানল, বাংলাদেশ স্বাধীন

২৬ মার্চ ১৯৭১: একটি জাতির রক্তক্ষয়ী সূর্যোদয় ও স্বাধীনতার ঘোষণা

গণহত্যার বিরুদ্ধে শৈল্পিক প্রতিবাদ / ২৫শে মার্চের কালরাত্রি স্মরণে প্রাচ্যনাটের ‘লালযাত্রা’

২৫ মার্চ, ১৯৭১: ইতিহাসের কলঙ্কিত কালরাত ও বিভীষিকাময় গণহত্যা

২৪ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন আর চূড়ান্ত প্রস্তুতির দিন

১০

২৫ মার্চের গণহত্যা স্মরণে ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দাবিতে ‘আলোর মিছিল’

১১

২৫ মার্চ ১৯৭১: গণহত্যার কালরাত্রি ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির লড়াই

১২

জামায়াতকে বিচারের আওতায় আনার দাবি / একাত্তরের গণহত্যা স্বীকৃতির প্রস্তাব মার্কিন কংগ্রেসে

১৩

২৩ মার্চ ১৯৭১: যেদিন পাকিস্তান দিবস হলো প্রতিরোধের নামে

১৪

২২ মার্চ ১৯৭১: আপসহীন সংগ্রামের ঘোষণা এবং ইয়াহিয়ার নতুন চাল

১৫

২১ মার্চ ১৯৭১: নীতির প্রশ্নে আপসহীন বঙ্গবন্ধু এবং ঘনীভূত সামরিক মেঘ

১৬

২০ মার্চ ১৯৭১: টেবিলে আশার আলো, অন্তরালে গণহত্যার নীল নকশা

১৭

১৯ মার্চ ১৯৭১: সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের প্রথম স্ফুলিঙ্গ ও বীরত্বগাঁথা

১৮

১৮ মার্চ ১৯৭১: জান্তার তদন্ত কমিটি প্রত্যাখ্যান ও বঙ্গবন্ধুর ডাক

১৯

১৭ মার্চ ১৯৭১: ‘নরকে বসেও হাসতে পারি’, বঙ্গবন্ধুর বজ্রশপথ

২০