ঢাকা মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১২ ফাল্গুন ১৪৩৩
মুক্ত মনমুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১: রাজনৈতিক মাঠে উত্তাপ ও শঙ্কা, ছাত্রলীগের সমাবেশ

প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৩:২৭ পিএম
২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১: রাজনৈতিক মাঠে উত্তাপ ও শঙ্কা, ছাত্রলীগের সমাবেশ

১৯৭১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ছিল বাংলার স্বাধিকার আন্দোলনের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অর্থবহ দিন। রাজধানী ঢাকা ছিল রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক তৎপরতায় মুখর। একদিকে যেমন আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নতুন মাত্রা সংযোজিত হচ্ছিল, অন্যদিকে সামরিক জান্তার কুশীলবরা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ব্যাহত করার ষড়যন্ত্রে মগ্ন ছিল। এই দিনের ঘটনাবলি স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় যে, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার ও আইয়ুব খানের পতনের পরও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাঙালির মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না।

কূটনৈতিক অঙ্গনে উষ্ণতা: সোভিয়েত কনসাল জেনারেলের সাক্ষাৎ বঙ্গবন্ধুর সাথে

বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী শক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন তখন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের প্রক্রিয়াটিকে খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করছিল। তারই প্রতিফলন ঘটে এই দিনে। ঢাকায় নিযুক্ত সোভিয়েত কনসাল জেনারেল ভ্যালেন্টিন এস. পপোভ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে সৌজন্য সাক্ষাতে মিলিত হন। ধানমন্ডির বাসভবনে অনুষ্ঠিত এই দেড় ঘণ্টাব্যাপী বৈঠকে প্রদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিই প্রাধান্য পায়। নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সমাজসেবা সম্পাদক মোস্তফা সারওয়ার সোভিয়েত কূটনীতিককে সংবর্ধনা জানান। এই সাক্ষাৎকারটি ছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব ও আন্দোলনের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের স্বীকৃতি।

রাজনৈতিক মাঠে উত্তাপ ও শঙ্কা: ভাসানীর হুঁশিয়ারি ও ছাত্রলীগের সমাবেশ

অন্যদিকে, দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিল ক্রমশ উত্তপ্ত। মওলানা ভাসানী সিলেট থেকে ঢাকা আসার পথে ভৈরব রেল স্টেশনে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তিনি বলেন, পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো যদি আসন্ন জাতীয় পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে ঢাকায় না আসেন, তাহলে সারা দেশে ‘ত্রাসের রাজত্ব’ শুরু হবে। তিনি আরও সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ১১ বছরের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের পর জনগণ ধৈর্যের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে। জাতীয় পরিষদ বাতিল হলে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ তাদের লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য ‘অন্য পন্থা’ অবলম্বন করতে বাধ্য হবে। এই ‘অন্য পন্থা’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে, তা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে স্পষ্ট ছিল।

একই দিনে স্বাধিকারের দাবিতে পল্টন ময়দানে ছাত্রলীগের এক বিশাল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ছাত্রসমাজের এই ঐক্যবদ্ধ অবস্থান প্রমাণ করে যে, আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে নতুন একটি রাজনৈতিক চেতনা ও বাঙালির মুক্তির আকাঙ্ক্ষা।

পশ্চিম পাকিস্তানের কুশীলবরা ও ভিন্নমতের সুর

পশ্চিম পাকিস্তানের কিছু নেতার মধ্যেও মতপার্থক্য ও বাস্তববাদী চিন্তার বহিঃপ্রকাশ ঘটছিল। তেহরিক-এ-ইস্তেকলাল পার্টির প্রধান এয়ার মার্শাল আসগর খান মন্তব্য করেন যে, পূর্ব পাকিস্তানের ওপর নিজেদের ইচ্ছা চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। জমিয়তে ইসলামীর প্রধান মৌলানা মুফতি মন্তব্য করেন, সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রভাবে আওয়ামী লীগ শাসনতন্ত্র চাপিয়ে দিতে চায় না। তবে ভিন্নমতের এই সুরগুলোর বিপরীতে পাকিস্তান পিপলস পার্টির অভ্যন্তরীণ দ্বিধা বিভক্তি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দলটি আগে জানিয়েছিল যে, ছয় দফার প্রশ্নে শেখ মুজিব অনড় থাকলে তাদের এমএনএরা জাতীয় পরিষদ থেকে পদত্যাগ করবেন। তাদের এই হুমকির মুখে ইয়াহিয়া খান এলএফও সংশোধন করেছিলেন। কিন্তু এখন তারা জানায়, তাদের দল জাতীয় পরিষদ থেকে পদত্যাগ করবে না। এই দ্বিধা পাকিস্তানি রাজনীতির নৈরাজ্যেরই প্রতিফলন।

সেনানায়তনের অন্ধকার কুঠিরায়: ২২ ফেব্রুয়ারির বৈঠকের সাক্ষ্য

এই দিনের খবরের কাগজগুলোতে (ইত্তেফাক, মর্নিংসান) প্রকাশিত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ ছিল প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সকল প্রদেশের গভর্নর ও সামরিক প্রশাসকদের বিশেষ সম্মেলনের। পিপিআইয়ের খবরে বলা হয়, সরকারি ঘোষণায় আলোচনার বিষয়বস্তু সম্পর্কে কিছু না বলা হলেও দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েই আলোচনা হয়েছে বলে অনুমান করা হচ্ছে। এই অনুমান কতটা সত্য ছিল, তা পরে হামিদুর রহমান কমিশনে পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর এডমিরাল আহসানের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়।

ডন পত্রিকায় প্রকাশিত সেই বক্তব্যে এডমিরাল আহসান জানান, ১৯৭১ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি রাওয়ালপিন্ডিতে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকেই সামরিক নেতৃত্বের আসল চেহারা ফুটে ওঠে। তিনি বলেন, সেখানে ‘মিলিটারি সলিউশন’ বা সামরিক সমাধানের কথা openly আলোচিত হচ্ছিল, যা শুনে তিনি হতবাক হয়ে যান। তিনি ছিলেন সেই বৈঠকে একমাত্র অবসরপ্রাপ্ত ও অসামরিক গভর্নর, যিনি ৭০ মিলিয়ন বাঙালির প্রতিনিধিত্ব করছিলেন সম্পূর্ণ পশ্চিম পাকিস্তানি জেনারেলদের মাঝে। তাঁর মতে, পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের মতামত না নিয়েই সেনা অভিযানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছিল। এই স্বীকারোক্তি স্পষ্ট করে দেয় যে, ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকেই পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাঙালির মুক্তির আন্দোলনকে সামরিক শক্তির মাধ্যমে দমন করার চূড়ান্ত পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছিল।

পাকিস্তান ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি কে. জি. মোস্তফা প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের কাছে আটক সাংবাদিক সৈয়দ নজিউল্লাহ ও দোহাকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার আবেদন জানান, তাদের অসুস্থতা ও পারিবারিক অবস্থার কথা উল্লেখ করে।

সারসংক্ষেপ

২৩শে ফেব্রুয়ারি, ১৯৭১ ছিল দ্বন্দ্ব ও সিদ্ধান্তের এক গুরুত্বপূর্ণ দিন। রাজপথে ছাত্র-জনতার স্বাধিকারের দাবি যেমন উচ্চকিত ছিল, তেমনি প্রাসাদ ও সেনানায়তনে চলছিল বাঙালির এ আকাঙ্ক্ষা চিরতরে নস্যাৎ করে দেওয়ার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সোভিয়েত কনসাল জেনারেলের সাক্ষাৎ যেমন আন্দোলনের আন্তর্জাতিকীকরণের ইঙ্গিত দেয়, তেমনি এডমিরাল আহসানের বক্তব্য প্রমাণ করে যে, পাকিস্তানি জান্তা ইতিমধ্যেই তাদের ‘চূড়ান্ত সমাধানের’ পথ বেছে নিতে বসেছিল।

তথ্যসূত্র

১. মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর - ২৩ ফেব্রুয়ারি, ১৯৭১-এর ঐতিহাসিক ঘটনাবলি সংকলন

২. দৈনিক ইত্তেফাক, ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ (প্রথম পাতা) - ঢাকায় নিযুক্ত সোভিয়েত কনসাল জেনারেল ভ্যালেন্টিন এস. পপোভের বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ, পিপলস পার্টির এমএনএদের পদত্যাগ বিষয়ক সংবাদ, আসগর খান ও মৌলানা মুফতির বক্তব্য, ছাত্রলীগ সমাবেশ, এমসিসি টেস্ট ম্যাচের সূচি এবং ইয়াহিয়া খানের গভর্নর সম্মেলনের সংবাদ

৩. দৈনিক মর্নিংসান, ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ - সামরিক প্রশাসকদের সম্মেলন সম্পর্কিত তথ্য

৪. দৈনিক পূর্বদেশ, ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ (প্রথম পাতা) - সোভিয়েত কনসাল জেনারেলের সাক্ষাৎ ও মোস্তফা সারওয়ারের সংবর্ধনা, সৈয়দ নজিউল্লাহ ও দোহাকে মুক্তিদানের আবেদন, মওলানা ভাসানীর ভৈরব রেল স্টেশনে বক্তব্য

৫. ডন পত্রিকা - হামিদুর রহমান কমিশনে এডমিরাল আহসানের বক্তব্য, ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১-এর উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের বিবরণ

৬. লন্ডন টাইমস, ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ - বঙ্গবন্ধুর বিবৃতিতে 'পূর্ব পাকিস্তান'-এর পরিবর্তে 'বাঙালি জাতি'র উল্লেখ প্রসঙ্গে

৭. লিভারপুল ডেইলি পোস্ট, ২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১ - হোয়াইট হলের আশঙ্কা: পাকিস্তান দ্বিখণ্ডিত হয়ে পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন বাঙালি মুসলিম প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করতে পারে

৮. সংগ্রামের নোটবুক - একাত্তরের দিনপঞ্জি

অতিরিক্ত গবেষণা ও ক্রস-ভেরিফিকেশন

প্রতিবেদনের তথ্যগুলো নির্ভুলতা নিশ্চিত করার জন্য নিম্নলিখিত উৎসগুলোর সাথেও ক্রস-ভেরিফাই করা হয়েছে:

বিশ্ব গণমাধ্যম: দ্য গার্ডিয়ান, ওয়াশিংটন পোস্ট, ডেইলি টেলিগ্রাফ, টাইম ম্যাগাজিন, নিউজউইক

ব্রিটিশ নথি: প্রথম আলোর “চিরন্তন ১৯৭১” সিরিজে প্রকাশিত ব্রিটিশ সরকারের অবমুক্ত নথিপত্র (১৯৬৯-১৯৭১)

উইকিপিডিয়া: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ বিষয়ক নিবন্ধ

তথ্য সংগ্রহ পদ্ধতি

প্রতিবেদনের তথ্যসূত্রগুলো মূলত সমসাময়িক সংবাদপত্র (১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চে প্রকাশিত দৈনিক ইত্তেফাক, পূর্বদেশ, মর্নিংসান), সরকারি নথি (ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি), হামিদুর রহমান কমিশনের সাক্ষ্য এবং পরবর্তীকালে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ও বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সংকলিত দলিলপত্রের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। তথ্যগুলোর ঐতিহাসিক নির্ভুলতা নিশ্চিত করতে একাধিক স্বাধীন উৎসের মধ্যে তুলনা ও যাচাই করা হয়েছে।

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

৮ ক্যাটাগরিতে ৯ বিশিষ্টজন পাচ্ছেন বাংলা একাডেমি পুরষ্কার

শহীদ বেদীতে জামায়াতের রাজনীতির ফুল

বাংলাদেশ-মার্কিন বাণিজ্যচুক্তি: কৃষিখাতের জন্য একটি ‘ট্রোজান হর্স’

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন / ইরানে বড় আক্রমণের কথা ভাবছেন ট্রাম্প

বিদ্যুৎ খাতে ৪৫ হাজার কোটি টাকা বকেয়া

ট্রাম্পের নতুন শুল্ক নিয়ে ইইউর কঠোর বার্তা

চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত ডিসিসিআইয়ের

রাজধানীতে সক্রিয় ১২৭ কিশোর গ্যাং, নিরাপত্তা সংকট

২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৭১: রাজনৈতিক মাঠে উত্তাপ ও শঙ্কা, ছাত্রলীগের সমাবেশ

একুশের চেতনা: বাঙালির আত্মপরিচয়ের সংগ্রাম

১০

দূর্গম পাহাড়ে একুশের গান / ম্রো শিশুদের কণ্ঠে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ (ভিডিও)

১১

শহীদ মিনারে জামায়াত আমিরকে ঘিরে ‘রাজাকার’ ও ‘একাত্তরের দালাল’ স্লোগান (ভিডিও)

১২

অমর একুশে ফেব্রুয়ারি / ভাষার জন্য আত্মোৎসর্গের গৌরবময় ইতিহাস

১৩

সবচেয়ে খারাপ রিক্রুটতো ছিলেন ইউনূস: খালেদ মুহিউদ্দীন (ভিডিও)

১৪

অস্ত্র উৎপাদন ও সামরিক খাতে পুঁজির প্রবাহ ও ব্যয় উভয়ই বাড়ছে

১৫

নারী স্বাধীনতা আর পিতৃতান্ত্রিক অন্ধকার

১৬

প্রকৃত পরীক্ষা আসলে খারাপ সময়েই হয়

১৭

এইসবের জবাবদিহি হবে না?

১৮

মার্কিন স্বার্থের প্রতিনিধি কি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী?

১৯

খলিলুর রহমান: নীলক্ষেতের রক্তমাখা ছায়া থেকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী

২০