ঢাকা মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬, ১৭ চৈত্র ১৪৩৩
মুক্ত মনমুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা
শহীদ বুদ্ধিজীবী

তরফদার আতিয়ার রহমান

প্রিয়ভূমি ডেস্ক
প্রকাশ : ১৯ মে ২০২৫, ০৫:১৮ পিএম
তরফদার আতিয়ার রহমান

একাত্তরের ১৭ জুলাই শুক্রবার ভোরবেলা। নড়াইল সদর উপজেলার তুলারামপুর গ্রামে হানা দেয় রাজাকার ও পাকিস্তানি হানাদার সেনাবাহিনী। ঘিরে ফেলে শিক্ষক তরফদার আতিয়ার রহমানের বাড়ি। বাইরে শোরগোল শুনে তিনি বিছানা ছেড়ে দরজা খুলে বাইরে আসেন। হানাদার সেনারা তাঁকে ধরে নিয়ে যায়। এভাবে সেদিন গ্রামের ১৯ জনকে তারা বাড়ি থেকে তুলে নেয়। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটি অনেকেই দেখছিলেন। কিন্তু ভয়ে কেউ প্রতিবাদ করতে পারেননি।

ঘাতকের দল আটক সবাইকে নিয়ে যায় নড়াইল শহরের তাদের ক্যাম্প ওয়াপদা ডাকবাংলোয় (বর্তমানে পানি উন্নয়ন বোর্ড কার্যালয়)। তাঁদের মধ্যে আতিয়ার রহমানসহ ৮ জনকে রেখে অন্য ১১ জনকে মারধর করে বিকেলে ছেড়ে দেয়। এই আটজনকে তারা টানা তিন দিন নির্মম নির্যাতন করে। তাঁদের দিয়েই ডাকবাংলো চত্বরে গর্ত করায়। এরপর ২০ জুলাই ৩৪ বছর বয়সী শিক্ষক আতিয়ার রহমানসহ সবাইকে হত্যা করে সেই গর্তে মাটিচাপা দেয়।

আতিয়ার রহমানের সঙ্গে সেদিন পাকিস্তানি সেনাদের হাতে শহীদ হন তুলারামপুর গ্রামের দুই ভাই রফিকুল ইসলাম তরফদার ও স্নাতকের ছাত্র মাহাতাব উদ্দীন তরফদার, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আলতাফ হোসেন তরফদার, কৃষক কাইজার রহমান মোল্লা ও তাঁর ভাতিজা কৃষক মোকাম মোল্লা, ইপিআরের গাড়িচালক মকবুল হোসেন শিকদার ও গ্রামপ্রধান আবদুস সালাম তরফদার।

আতিয়ারের স্ত্রী আয়শা খাতুন (৭৭) এখনো বেঁচে আছেন। সেই দুঃসহ দিনের স্মৃতি স্মরণ করে তিনি বলেন, ঘরের দরজা খোলার পর সেনারা তাঁকে উঠানে ডেকে জিজ্ঞাসা করে অস্ত্র আছে না কি? তিনি না, অস্ত্র নেই”—এই টুকু কথার পরই তাদের সঙ্গে যেতে বলে। পানি খেতে চেয়েছিলেন তিনি। ছোট মেয়ে ওহিদা খাতুন গ্লাসে করে পানি নিয়ে যায়। কিন্তু তারা পানিও খেতে দেয়নি। টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যায়।

আতিয়ার রহমানের জন্ম ১৯৩৮ সালে তুলারামপুর গ্রামে। বাবা নাজিম উদ্দীন তরফদার ছিলেন কৃষিজীবী। মা জাহানারা খাতুন গৃহিণী। চার ভাইয়ের মধ্যে আতিয়ার মেজ। ছোট ভাই ওবায়দুর তরফদার মুক্তিযোদ্ধা ও তুলারামপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান। অন্য দুই ভাই খয়বার তরফদার ও আজমল তরফদার ছিলেন কৃষিজীবী। আজমল মারা গেছেন। সেদিন হানাদাররা আতিয়ার রহমানের সঙ্গে ভাই খয়বার ও আজমলকেও ধরে নিয়েছিল। পরে তাঁদের ছেড়ে দেয়। আতিয়ার রহমানের স্ত্রী আয়শা খাতুন (৭৭) বেঁচে আছেন। তিন মেয়ে ও এক ছেলে তাঁদের। ছেলে মুন্নু তরফদার ব্যবসায়ী। মেয়েরা গৃহিণী।

আতিয়ার রহমান যশোর এম এম কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে যশোরের বাঘারপাড়ার দোহাকুলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। পরে রাজশাহী টিচার্স ট্রেনিং কলেজে বিএড করে ১৯৬৫ সালে নড়াইল ভিক্টোরিয়া কলেজিয়েট উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে যুক্ত হন। মৃত্যুর আগপর্যন্ত এখানেই শিক্ষকতা করছিলেন।

মুক্তিযোদ্ধা এম এম গোলাম কবীর বলেন, শহীদ আতিয়ার রহমান ছিলেন খ্যাতিমান শিক্ষক। মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করাসহ নানাভাবে সাহায্য করেছেন। তিনিসহ যে আটজন শহীদ হয়েছিলেন, তাঁদের নাম সরকারি তালিকাভুক্ত করার জন্য মুক্তিযোদ্ধা সংসদের পক্ষ থেকে অনেক চেষ্টা করা হয়েছে। তবে এখনো তাঁদের নাম তালিকাভুক্ত না হওয়া দুঃখজনক।

প্রথম প্রকাশ: প্রথম আলো

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

৩০ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন ও বিশ্ববিবেকের জাগরণ

ইতিহাসের অবিনশ্বর নক্ষত্র: শহীদ শাফী ইমাম রুমী

২৯ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন ও আত্মাহুতির এক নৃশংস অধ্যায়

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা,আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশ

২৮ মার্চ ১৯৭১: ধ্বংসযজ্ঞের ছাপ আর বাঙালির সুসংগঠিত প্রতিরোধ

২৭ মার্চ ১৯৭১: বিশ্ব জানল, বাংলাদেশ স্বাধীন

২৬ মার্চ ১৯৭১: একটি জাতির রক্তক্ষয়ী সূর্যোদয় ও স্বাধীনতার ঘোষণা

গণহত্যার বিরুদ্ধে শৈল্পিক প্রতিবাদ / ২৫শে মার্চের কালরাত্রি স্মরণে প্রাচ্যনাটের ‘লালযাত্রা’

২৫ মার্চ, ১৯৭১: ইতিহাসের কলঙ্কিত কালরাত ও বিভীষিকাময় গণহত্যা

২৪ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন আর চূড়ান্ত প্রস্তুতির দিন

১০

২৫ মার্চের গণহত্যা স্মরণে ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দাবিতে ‘আলোর মিছিল’

১১

২৫ মার্চ ১৯৭১: গণহত্যার কালরাত্রি ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির লড়াই

১২

জামায়াতকে বিচারের আওতায় আনার দাবি / একাত্তরের গণহত্যা স্বীকৃতির প্রস্তাব মার্কিন কংগ্রেসে

১৩

২৩ মার্চ ১৯৭১: যেদিন পাকিস্তান দিবস হলো প্রতিরোধের নামে

১৪

২২ মার্চ ১৯৭১: আপসহীন সংগ্রামের ঘোষণা এবং ইয়াহিয়ার নতুন চাল

১৫

২১ মার্চ ১৯৭১: নীতির প্রশ্নে আপসহীন বঙ্গবন্ধু এবং ঘনীভূত সামরিক মেঘ

১৬

২০ মার্চ ১৯৭১: টেবিলে আশার আলো, অন্তরালে গণহত্যার নীল নকশা

১৭

১৯ মার্চ ১৯৭১: সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের প্রথম স্ফুলিঙ্গ ও বীরত্বগাঁথা

১৮

১৮ মার্চ ১৯৭১: জান্তার তদন্ত কমিটি প্রত্যাখ্যান ও বঙ্গবন্ধুর ডাক

১৯

১৭ মার্চ ১৯৭১: ‘নরকে বসেও হাসতে পারি’, বঙ্গবন্ধুর বজ্রশপথ

২০