ঢাকা মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬, ১৭ চৈত্র ১৪৩৩
মুক্ত মনমুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

ধর্ষণের মহামারী: শুধু আইন নয়, প্রয়োজন সমন্বিত সংস্কার

প্রিয়ভূমি প্রতিবেদক
প্রকাশ : ২১ জুন ২০২৫, ০৫:৩০ পিএম
ধর্ষণের মহামারী: শুধু আইন নয়, প্রয়োজন সমন্বিত সংস্কার

দেশজুড়ে শিশু ও নারী ধর্ষণের ঘটনা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। সম্প্রতি কুষ্টিয়ায় একটি শিশু ধর্ষণের ঘটনায় চপেটাঘাতের মাধ্যমে তথাকথিত ‘বিচার’ সম্পন্ন হয়েছে—এটি আইনের প্রতি সমাজের অবহেলা ও বিচারব্যবস্থার দুর্বলতারই প্রতিচ্ছবি। অন্যদিকে, হবিগঞ্জ, গাজীপুর, রাজবাড়ী, নাটোর ও মৌলভীবাজারের মতো জেলাগুলোতে ধর্ষণ, হত্যা ও যৌন সহিংসতার ঘটনা প্রমাণ করছে, ধর্ষণ এখন একটি সামাজিক মহামারিতে পরিণত হয়েছে।

ধর্ষণের বিস্তার: সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ

গত কয়েকদিনের সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরগুলো দেখলে চোখ কপালে ওঠার মতো অবস্থা:

  • হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে একটি চলন্ত বাসে কলেজছাত্রীকে দলবদ্ধ ধর্ষণ করা হয়েছে।

  • গাজীপুরের শ্রীপুরে একটি এটিএম বুথে একজন পোশাক শ্রমিক ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।

  • রাজবাড়ীর পাংশায় দুই স্কুলছাত্রীকে জিম্মি করে ধর্ষণ করা হয়েছে।

  • নাটোরের বড়াইগ্রামে একটি কিশোরী ধর্ষণের শিকার হয়েছে।

  • মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের পর এক স্কুলছাত্রীকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে।

এই ঘটনাগুলো শুধু বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং একটি পদ্ধতিগত সহিংসতার ধারাবাহিকতা। গত মার্চে মাগুরার শিশু আছিয়ার ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের পর সরকার দ্রুত বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের ঘোষণা দিয়েছিল। কিন্তু শুধু আইন কঠোর করলেই কি এই অপরাধ বন্ধ হবে?

আইন আছে, কিন্তু বিচার নেই

ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। কিন্তু সমস্যা হলো, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মামলাই হয় না। আর মামলা হলেও দীর্ঘসূত্রতা, দুর্বল তদন্ত ও আইনের ফাঁকফোকরে অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। কুষ্টিয়ার মতো জায়গায় সালিশের নামে চপেটাঘাত দিয়ে ধর্ষণের "বিচার" করা হচ্ছে—এটি আইনের প্রতি মানুষের আস্থাহীনতারই প্রকাশ।

প্রশ্ন হলো:

  • ধর্ষণের শিকার হওয়ার পরেও কেন নারীরা মামলা করতে ভয় পায়?

  • কেন সমাজপতিরা সালিশের নামে অপরাধীদের রক্ষা করে?

  • কেন পুলিশ ও প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ নেয় না?

কী করা উচিত?

১. আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতা:

  • ধর্ষণের প্রতিটি ঘটনায় দ্রুত তদন্ত ও অপরাধীদের গ্রেপ্তার নিশ্চিত করতে হবে।

  • পুলিশ ও প্রশাসনকে নারী-অধিকার বিষয়ে সংবেদনশীল করে তুলতে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন।

২. দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা:

  • বিশেষ ট্রাইব্যুনালগুলোকে আরও কার্যকর করতে হবে।

  • মামলার দীর্ঘসূত্রতা কমাতে ডিজিটাল সাক্ষ্য ও ফরেনসিক প্রমাণের ব্যবহার বাড়ানো দরকার।

৩. সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন:

  • ধর্ষণকে "লজ্জার বিষয়" হিসেবে না দেখে একে একটি গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে সমাজকে সচেতন করতে হবে।

  • শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মিডিয়ার মাধ্যমে লিঙ্গসমতা ও নারী অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।

৪. রাস্তা থেকে রাজনৈতিক অঙ্গন—সব জায়গায় নিরাপত্তা:

  • চলন্ত বাস, এটিএম বুথ, স্কুল-কলেজের আশেপাশে নিরাপত্তা বাড়াতে হবে।

  • নারীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

শুধু আইন নয়, প্রয়োজন সমন্বিত সংস্কার

ধর্ষণ রোধে শুধু কঠোর শাস্তির আইন করলেই চলবে না। প্রয়োজন একটি সমন্বিত উদ্যোগ—যেখানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিচারব্যবস্থা, প্রশাসন ও সমাজ সবাই একসাথে কাজ করবে। নারীরা যেন ন্যায়বিচার পায়, অপরাধীরা যেন কোনোভাবেই পার না পায়—সেটা নিশ্চিত করতে হবে। কুষ্টিয়ার মতো "সালিশি বিচার" যেন আর কখনোই ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের "সমাধান" না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

সরকার, প্রশাসন ও সমাজ—সবাইকে এখনই জেগে উঠতে হবে। নইলে এই মহামারী থামানো যাবে না।

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

৩০ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন ও বিশ্ববিবেকের জাগরণ

ইতিহাসের অবিনশ্বর নক্ষত্র: শহীদ শাফী ইমাম রুমী

২৯ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন ও আত্মাহুতির এক নৃশংস অধ্যায়

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা,আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশ

২৮ মার্চ ১৯৭১: ধ্বংসযজ্ঞের ছাপ আর বাঙালির সুসংগঠিত প্রতিরোধ

২৭ মার্চ ১৯৭১: বিশ্ব জানল, বাংলাদেশ স্বাধীন

২৬ মার্চ ১৯৭১: একটি জাতির রক্তক্ষয়ী সূর্যোদয় ও স্বাধীনতার ঘোষণা

গণহত্যার বিরুদ্ধে শৈল্পিক প্রতিবাদ / ২৫শে মার্চের কালরাত্রি স্মরণে প্রাচ্যনাটের ‘লালযাত্রা’

২৫ মার্চ, ১৯৭১: ইতিহাসের কলঙ্কিত কালরাত ও বিভীষিকাময় গণহত্যা

২৪ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন আর চূড়ান্ত প্রস্তুতির দিন

১০

২৫ মার্চের গণহত্যা স্মরণে ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দাবিতে ‘আলোর মিছিল’

১১

২৫ মার্চ ১৯৭১: গণহত্যার কালরাত্রি ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির লড়াই

১২

জামায়াতকে বিচারের আওতায় আনার দাবি / একাত্তরের গণহত্যা স্বীকৃতির প্রস্তাব মার্কিন কংগ্রেসে

১৩

২৩ মার্চ ১৯৭১: যেদিন পাকিস্তান দিবস হলো প্রতিরোধের নামে

১৪

২২ মার্চ ১৯৭১: আপসহীন সংগ্রামের ঘোষণা এবং ইয়াহিয়ার নতুন চাল

১৫

২১ মার্চ ১৯৭১: নীতির প্রশ্নে আপসহীন বঙ্গবন্ধু এবং ঘনীভূত সামরিক মেঘ

১৬

২০ মার্চ ১৯৭১: টেবিলে আশার আলো, অন্তরালে গণহত্যার নীল নকশা

১৭

১৯ মার্চ ১৯৭১: সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের প্রথম স্ফুলিঙ্গ ও বীরত্বগাঁথা

১৮

১৮ মার্চ ১৯৭১: জান্তার তদন্ত কমিটি প্রত্যাখ্যান ও বঙ্গবন্ধুর ডাক

১৯

১৭ মার্চ ১৯৭১: ‘নরকে বসেও হাসতে পারি’, বঙ্গবন্ধুর বজ্রশপথ

২০