ঢাকা মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩
মুক্ত ভাবনামুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা
ইতিহাসের পাতায় এক বীরের পদচ্ছাপ / নৌ-কমান্ডো এনামুল হক ও অপারেশন জ্যাকপট
মানুষের জীবনের ক্যানভাসে চিত্রিত দৃশ্য ও অদৃশ্যের নানা গল্প নিয়েই এগিয়ে চলে সময়। তবে স্বাধীনতা অর্জনের দীর্ঘ সময় পার হলেও আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বহু বীরত্বগাথা আজও লিখিত রূপ পায়নি, হারিয়ে যাচ্ছে কালের অতল গর্ভে। যথাযথ আর্কাইভের অভাবে এমন বহু ঐতিহাসিক ঘটনা যখন ভুলতে বসেছি, ঠিক তখনই কিছু ব্যক্তির ব্যক্তিগত উদ্যোগে সামনে আসছে সেই অনিশ্চিত, রোমাঞ্চকর ও ত্যাগের দিনগুলোর কথা। এমনই একজন বীর সন্তান নৌ-কমান্ডো মো. এনামুল হক, যিনি একাত্তরের রক্তঝরা দিনগুলোতে জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে অংশ নিয়েছিলেন ইতিহাসের অন্যতম দুঃসাহসিক সামরিক অভিযান ‘অপারেশন জ্যাকপট’-এ। একাত্তরের ১৬ আগস্টের প্রথম প্রহরে চালানো এই অভিযানটি ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সামরিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর মুক্তিযোদ্ধাদের এক মরণঘাতী প্রহার। চট্টগ্রাম, মোংলা, চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জ বন্দর—এই চার স্থানে একযোগে চালানো আত্মঘাতী হামলায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অস্ত্র, খাদ্য ও জ্বালানি বহনকারী ২৬টি দেশি-বিদেশি জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়া হয়। বিশ্ব গণমাধ্যমে একযোগে প্রচারিত এই খবর রাতারাতি বদলে দিয়েছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের কূটনৈতিক রূপরেখা। বীর মুক্তিযোদ্ধা এনামুল হক তাঁর সেই রোমাঞ্চকর ও আত্মত্যাগের দিনগুলোকে ধরে রেখেছেন বইয়ের পাতায়। ২০২৩ সালের একুশে বইমেলায় নিমপিয়া পাবলিকেশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর স্মৃতিকথামূলক গ্রন্থ ‘অপারেশন জ্যাকপট: এক নৌ-কমান্ডোদের অহংকার’ (প্রচ্ছদ: আনিসুজ্জামান সোহেল)। গ্রন্থে তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন উত্তাল মার্চের ঢাকা, ২৫ মার্চের নারকীয় গণহত্যা, নৌ-কমান্ডো দলের কঠোর প্রশিক্ষণ এবং মোংলা বন্দরের সেই ঐতিহাসিক আক্রমণের কথা। কক্সবাজারের সমুদ্র থেকে মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গন ঢাকায় জন্ম নেওয়া এনামুল হকের শৈশব কেটেছে কক্সবাজারে, বাবার চাকুরিসূত্রে। সাগরের উত্তাল ঢেউয়ে বন্ধুদের সঙ্গে নিয়মিত সাঁতার কাটার সেই তারুণ্যের অভিজ্ঞতাটিই পরবর্তীতে তাঁকে নৌ-কমান্ডো হিসেবে প্রস্তুত করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে। পরবর্তীতে তিনি যখন জগন্নাথ কলেজের ছাত্র, তখন দেশজুড়ে চলছিল পাকিস্তানি শোষণের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ। সেই রাজনৈতিক সচেতনতা থেকেই যুদ্ধে যাওয়ার মানসিক প্রস্তুতি নেন তিনি। ২৫ মার্চের কালরাত্রির অভিজ্ঞতা স্মরণ করে তিনি লিখেছেন— “হঠাৎই শুনতে পাই গুলির আওয়াজ। চারদিকে বারুদের গন্ধ। আব্বা ভয়ে আজান দেওয়া শুরু করলেন। আম্মা মেঝেতে চাদর বিছিয়ে সবাইকে শুয়ে পড়তে বললেন। পরবর্তী তিন দিন চলল কারফিউ। কারফিউ তুলে নিলে ঢাকার অবস্থা দেখতে বেরিয়ে যা দেখলাম তা বলার মতো না। বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রোকেয়া হলের সামনে দেখলাম মেয়েদের শাড়ি, ব্লাউজ, ওড়না ঝুলছে। জগন্নাথ হলে গিয়ে শুনি ছাত্রদের জীবন্ত পুঁতে ফেলার বীভৎস গল্প। সেই ক্ষোভ থেকেই সিদ্ধান্ত নিই—ভারতে গিয়ে ট্রেনিং নিতেই হবে।” ‘মৃত্যু নিশ্চিত জেনেই অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর’ ভারতে প্রশিক্ষণ চলাকালীন একদিন এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন এনামুল হক। ভারতীয় সামরিক কর্মকর্তারা ক্যাম্পে এসে জানতে চান, কাদের সমুদ্রে ও বড় নদীতে সাঁতার কাটার অভিজ্ঞতা আছে। উপস্থিত হাজারো বীরদের মধ্য থেকে ১৭ জনকে আলাদা করা হয়। পরবর্তীতে তাঁদের নিয়ে যাওয়া হয় বিশেষ এক ক্যাম্পে। সেখানে এক ভারতীয় ক্যাপ্টেন তাঁদের সোজা জানিয়ে দেন, “এটি একটি সুইসাইডাল স্কোয়াড (আত্মঘাতী দল)—এখানে গেলে মৃত্যু প্রায় নিশ্চিত।” তরুণ এনামুলকে তিনি পরামর্শ দেন সাধারণ ট্রেনিং নিয়ে দেশের ভেতরে ফিরে যুদ্ধ করতে। কিন্তু অকুতোভয় এই তরুণ পিছপা হননি। স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন— “মৃত্যু নিশ্চিত জেনেই যুদ্ধে এসেছি, স্যার। আমার আরও ভাই আছে, আমি দ্বিতীয়। যুদ্ধে আমি শহীদ হলেও পরিবারের অপূরণীয় ক্ষতি হবে না। আমি দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করতে চাই।” প্রশিক্ষণে যোগ দেওয়ার আগেই অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করতে হয়েছিল—"আমি দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন বিসর্জন দিতে সম্মত হয়েই এই প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করছি। যুদ্ধে আমার মৃত্যু ঘটলে কেউ দায়ী থাকবে না।" কঠিন বাছাইপ্রক্রিয়া শেষে ভাগীরথী নদীর তীরে তীব্র সামরিক ও লাইমপেট মাইনের কমান্ডো ট্রেনিং নেন তাঁরা। মোংলা বন্দরের সেই রক্তগরম করা ভোর অপারেশন জ্যাকপটের সেই কালজয়ী স্মৃতি বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি লিখেছেন—দলনেতার নির্দেশে মোংলা বন্দরে নোঙ্গর করা জাহাজগুলোতে মাইন লাগাতে রওনা হন তাঁরা। যখন নদীতে নামেন, তখন ভোরবেলায় আজান হচ্ছিল। নদীতে প্রচণ্ড স্রোত, আর একটু পর পর পাকিস্তানি হানাদারদের গানবোট টহল দিচ্ছে। কচুরিপানার আড়ালে নিজেদের গোপন করে, স্রোতের প্রতিকূলে ভেসে গিয়ে জাহাজগুলোর গায়ে মাইন সেট করেন তাঁরা। মাইন সেট করে যখন প্রাণপণে সাঁতরে ফিরছেন, ততক্ষণে ভোর ৬টা। বিকট শব্দে একের পর এক লিম্পেট মাইন বিস্ফোরিত হতে থাকে। আকস্মিক ও ধ্বংসাত্মক এই হামলায় সম্পূর্ণ দিশেহারা হয়ে পড়ে পাকিস্তানি বাহিনী। জলপথে তাদের রদবদল ও রসদ সরবরাহ ব্যবস্থা এক মুহূর্তে ধ্বংস হয়ে যায়। ব্যক্তিজীবনের ঊর্ধ্বে দেশ কথা সাহিত্যিক সেলিনা হোসেন বইটির ভূমিকায় যথার্থই লিখেছেন— “এনামের লেখায় নৌকমান্ডোদের ‘অপারেশন জ্যাকপট’-এর প্রায় আদ্যোপান্ত উঠে এসেছে। প্রথম গদ্য প্রয়াস হিসেবে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও ঐতিহাসিক বিষয়ের কারণে গ্রন্থটি বিপুলভাবে পঠিত হওয়ার দাবি রাখে।” ১৯৫৪ সালের ১ জানুয়ারি ঢাকায় জন্মগ্রহণকারী এই বীর মুক্তিযোদ্ধার পৈতৃক ভিটা নরসিংদী জেলার রায়পুরা উপজেলায়। বাবা বজলুল হক ও মা জাহেদা খাতুন। স্বাধীনতার পর জগন্নাথ কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে তিনি যুক্ত হন চিত্রণ ফিল্ম সোসাইটি, নগর গবেষণা কেন্দ্র এবং বাংলা একাডেমির লোক-ঐতিহ্যবিষয়ক গবেষণা সংস্থায়। বর্তমানে প্রবাসে স্থায়ী হলেও তাঁর হৃদয় পড়ে থাকে প্রিয় জন্মভূমিতে। ‘অপারেশন জ্যাকপট: এক নৌ-কমান্ডোদের অহংকার’ কেবল একজন এনামুল হকের আত্মজীবনী নয়; এটি আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক অমূল্য দলিল, যা নতুন প্রজন্মকে শেখায়—কীভাবে ব্যক্তিগত জীবনের সব মোহ ত্যাগ করে দেশকে সবার ওপরে স্থান দিতে হয়।

অসমাপ্ত আত্মজীবনী অসমাপ্ত জীবনকথা

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ একই সঙ্গে বিস্ময় ও আনন্দ জোগায়। আত্মজীবনীমাত্রই অসমাপ্ত জীবনকথা। তবে...

চাক বাংলা অভিধান ও চাক সংস্কৃতি

বই আলোচনা, গ্রন্থ সমালোচনা, পুস্তক পর্যালোচনা যে নামেই ডাকি না কেন মূলত বইকে পাঠকের সামনে...

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ও তার পদ্মানদীর মাঝি

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় (১৯০৮-১৯৫৬), লেখক নাম এটি। তার প্রকৃত নাম প্রবোধ কুমার বন্দ্যোপাধ্যায়। মধ্যবিত্ত শিক্ষিত একান্নবর্তী...

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

‘অসৎ মানুষের হাতে এআই গেলে ১০০ কোটি মানুষের মৃত্যু হতে পারে’

১

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র / বাংলাদেশে জ্বালানি নিয়ে আসা বিমানকে আকাশসীমায় ঢুকতে দেয়নি পাকিস্তান

২

শহীদ তাজুলের স্মৃতিতে বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তরুণ প্রজন্ম

৩

ফুলেল শ্রদ্ধায় শহীদ মিনারে আখতার হুসেনকে শেষবিদায়

৪

রাশিয়ার পার্লামেন্ট নির্বাচনে এগিয়ে পুতিনের ইউনাইটেড রাশিয়া

৫

জামায়াত এমপি নজরুলের বাসায় উদ্ধারকৃত চিঠিতে মরিয়মের যা লেখা

৬

জামায়াত এমপি নজরুলের বিরুদ্ধে নির্যাতন ও প্ররোচনার মামলা

৭

সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড: কবিতা, গান ও ক্যানভাসে শরণার্থী জীবনের করুণ আখ্যান

৮

যুক্তরাষ্ট্রকে ৭ শর্ত দিল ইরান, না মানলে ‘চূড়ান্ত যুদ্ধ’

৯

নজিরবিহীন জালিয়াতি / বাংলাদেশ ব্যাংকে পদ ছাড়াই ৩৬৫ জনের নিয়োগ ও পদোন্নতি

১০

অপ্রতিম হত্যা: কিশোর গ্যাং, অপরাধ চক্র ও পুলিশের ভূমিকা

১১

আজ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’

১২

‘বারবার মামলা না দিয়ে গুলি করে মেরে ফেলেন’

১৩

আসিফের বিরুদ্ধে ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ, অনুসন্ধানে দুদক

১৪

সিঙ্গাপুরেও মিলল বাড়ি ও ব্যাংক হিসাব / সাবেক ভূমিমন্ত্রী জাবেদের ১০ হাজার কোটি টাকার বিদেশি সম্পদ জব্দ

১৫

​​​​​​​শীতলক্ষ্যায় নিখোঁজ চারজনের মধ্যে ৩ জনের লাশ উদ্ধার

১৬

মোদী-পেজেশকিয়ান বৈঠক: মধ্যপ্রাচ্য সংকটে সংলাপ ও নিরাপদ সমুদ্রপথের তাগিদ

১৭

গুলশানে আ’লীগের মিছিল, গ্রেপ্তার ৩২

১৮

সমকাল কার্যালয়ে সাবেক ব্যুরো প্রধানের লাশ উদ্ধার

১৯

রংপুরে চার খুন: নেপথ্যে স্থানীয় বিএনপি নেতা, গৃহশিক্ষিকা ও পুলিশ কর্মকর্তা

২০