ঢাকা শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬, ১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩
মুক্ত ভাবনামুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

মেয়ে ও তিন নাতি-নাতনিকে নিয়ে পলিথিনের ঘরে থাকেন তফুরা

পঞ্চগড় প্রতিনিধি
প্রকাশ : ১২ মে ২০২৫, ০৪:৩২ পিএম
মেয়ে ও তিন নাতি-নাতনিকে নিয়ে পলিথিনের ঘরে তফুরা

মেয়ে ও তিন নাতি-নাতনিকে নিয়ে খোলা আকাশের নিচে মাঠের মাঝখানে পলিথিনের তৈরি ঘরে বসবাস করছেন বিধবা তফুরা বেগম। পলিথিনের এই ঘরটি মাঠের মাঝখানে হওয়ায় নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন তারা। পলিথিন নিচে থাকার ব্যবস্থা হলেও সেখানে নেই কোনো টিউবওয়েল ও টয়লেট। এসব কাজ সারতে হয় প্রতিবেশীদের বাড়িতে গিয়ে। সব মিলে কখনও খেয়ে আবার কখনও না খেয়েও দিন পার করতে হচ্ছে ৫ সদস্যের এই পরিবারটিকে।

বর্তমানে তিনি পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার ময়দানদিঘী ইউনিয়নের জেমজুট মুসলিমবাগ এলাকার বাসিন্দা। তফুরার স্বামী সৈয়দ আলীর বাড়ি পঞ্চগড় পৌর শহরের তেলিপাড়া এলাকায়। কয়েক বছর আগে তিনি মারা গেছেন। সৈয়দ আলী তফুরাকে বিয়ে করার পর আরও দুটি বিয়ে করেন। এরপর তাদের সংসারে শুরু হয় অশান্তি।

২০০৬ সালে তফুরা তার মেয়েকে নিয়ে চলে আসেন জেমজুট এলাকায়। সেখানে বাড়িভাড়া নিয়ে মেয়েকে নিয়ে থাকতে শুরু করেন। কয়েক বছর পর মেয়ে শরিফা খাতুনকে বিয়ে দেন। সেখানে তার ঘরে এক ছেলে ও এক মেয়ে জন্মগ্রহণ করেন। সেই সংসার বেশিদিন টেকেনি শরিফার। পরে পঞ্চগড়ের সাঁকোয়া এলাকায় আবারও বিয়ে করেন শরিফা। সেই সংসারে তার আরেকটি মেয়ে সন্তান জন্মগ্রহণ করে। সন্তান জন্মগ্রহণ করার কিছুদিন পরে তার ২য় স্বামীও তাকে ছেড়ে চলে যায়। তখন থেকে শরিফা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন।

পরে তফুরা বেগম মানসিক ভারসাম্যহীন মেয়ে ও তিন নাতি নাতনিকে নিয়ে ভাড়া বাসায় থেকে ভিক্ষাবৃত্তি করে সংসার চালান। এদিকে মেয়ে মানসিকভাবে বেশি অসুস্থ হওয়ার কারণে অন্যান্য ভাড়াটিয়াদের কাপড়সহ বিভিন্ন জিনিসপত্র নষ্ট করতে থাকে। এসব ঘটনায় সবাই বিরক্ত হয়ে তাদেরকে ভাড়া বাসা থেকে বের করে দেয়। কোথাও কোনো থাকার জায়গা না থাকায় দানদিঘী ইউনিয়নের জেমজুট মুসলিমবাগ এলাকায় স্থানীয়রা পলিথিন দিয়ে একটি তাবু তৈরি করে দেয়। বর্তমানে সেই তাবুতে তিন মাস ধরে বসবাস করছেন তারা।

তফুরার নাতি নয়ন ইসলাম জানায়, আমার নানি ভিক্ষা করে সংসার চালায়। এই ঘরটা এলাকার লোকজন নিজেরাই টাকা খরচ করে তুলে দিয়েছে। এখানে আমরা ৫ জন বসবাস করি। থাকতে খুব কষ্ট হয়।

তফুরা বেগম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মেয়েকে নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকি। কয়েকমাস ধরে তার মাথায় সমস্যা হওয়ায় অন্য ভাড়াটিয়াদের কাপড়সহ বিভিন্ন জিনিসপত্র নষ্ট করছে। তাই তারা ভাড়া বাড়িতে থাকতে দিচ্ছে না। আমার তো কোনো জমি জায়গা নেই। এলাকার লোকজন স্থানীয় জসিম উদ্দিন নামে একজনের জমিতে পলিথিন দিয়ে আমাকে থাকার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। এখানে কোনো টিউবওয়েল নাই। কষ্ট করে দূর থেকে পানি নিয়ে এসে গোসল করতে হয়। ইউনিয়ন পরিষদ থেকেও আমরা কোনো সহযোগিতাও পাই না। এই ঘরে গরমের সময় প্রচণ্ড গরম করে আর বৃষ্টির সময় ছোট বাচ্চারা খুব ভয় পায়।

স্থানীয় বাবুল ইসলাম বলেন, এরা খুব গরিব মানুষ। অনেকদিন ধরে এই এলাকায় আছে। আগে জুটমিলে কাজ করে খাইতো। হঠাৎ করে এই মেয়েটা পাগল হয়ে গেছে। পাগল হয়ে যাওয়ার পর ভাড়াও কেউ রাখে না। পরে আমরা এলাকাবাসী হাট বাজারে টাকা তুলে প্লাস্টিক দিয়ে এই ঘরটি করে দিয়েছি। সরকারের কাছে আমার আকুল আবেদন এদের জন্য যে কোনো জায়গায় হোক ছোটখাটো একটা ঘর যেন করে দেওয়া হয়।

স্থানীয় আসাদুল্লাহ দুলু বলেন, ঝড় বৃষ্টির মধ্যেও তাদেরকে এই ঘরের মধ্যে থাকতে হয়। তাদের কোনো টিউবওয়েল নেই। তারা বাড়ির পাশের স-মিলের টিউবওয়েলের পানি ব্যবহার করে।

ইউপি সদস্য উসমান গণি বলেন, তারা এখনও ইউনিয়ন পরিষদ থেকে কোনো কিছু পাচ্ছেনা। সরকার থেকে যা আসে সেটা আমরা ধাপে ধাপে সবার মাঝে বিতরণ করছি।

ময়দানদিঘী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল জব্বার বলেন, তাদের বিষয়ে আমার জানা নেই। মেম্বার বলতে পারবে। তারা যদি এই ইউনিয়নের বাসিন্দা হয়ে থাকে তাহলে তো সহযোগিতা পাবে। এখনতো কোনো কিছু দিতে হলে জাতীয় পরিচয় পত্র লাগে। জানি না তাদের আছে কীনা?

উপজেলা সমাজসেবা অফিসার তৌকির আহমেদ বলেন, ওই নারী যদি বিধবা হয় এবং তার মেয়ে মানসিক প্রতিবন্ধী হয় সেক্ষেত্রে আবেদন করেলে আমরা ভাতার ব্যবস্থা করে দেব।

এ বিষয়ে বোদা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহরিয়ার নজির বলেন, ময়দানদিঘী ইউনিয়নের অসহায় বিধবা নারী তফুরা বেগমের ব্যাপারে আমরা অবগত আছি। ময়দানদিঘীতে সরকারি কোনো খাস জমি নেই। থাকলে সেখানে তাকে কিছু করে দেওয়া যেত। আশ্রয়নের যে ঘরগুলো ময়দানদিঘীতে আছে সেগুলোও ফাঁকা নেই। ময়দানদিঘী ইউনিয়নের পাশের কোনো ইউনিয়নে ফাঁকা ঘর থাকলে সেখানে তাদের যাওয়ার সুযোগ আছে। আর যদি তিনি সেখানেই থাকতে চান সেক্ষেত্রে কোনো বৃত্তবান ব্যক্তি যদি তাকে জায়গা দেন তাহলে আমরা টিন দিয়ে ঘর করে দিতে পারি।

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

হামে শিশু মৃত্যু ও মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির প্রতিবাদে মানববন্ধন, ১০ দফা দাবি

কক্সবাজারে হামের ভয়াবহ রূপ / ২০ বেডে ৮৭ শিশু

হাইকোর্টের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ / গর্ভের শিশুর লিঙ্গ পরিচয় প্রকাশ করা যাবে না

৩ বিভাগে অতি ভারী বর্ষণের সতর্কতা: সিলেটে জলাবদ্ধতার আশঙ্কা

দ্য প্রাইম মিনিস্টার-এ ফ্যামিলি ম্যান!

পেস ত্রয়ীকে বিশ্রাম দিয়ে তরুণ দল পাঠাচ্ছে অস্ট্রেলিয়া

লক্ষ্য বড় চুক্তি / বাণিজ্য যুদ্ধ ও ইরান উত্তাপের মধ্যেই বেইজিং যাচ্ছেন ট্রাম্প

দেশে হামের প্রকোপ ভয়াবহ / মৃত্যু ছাড়াল ৪০০, একদিনে ঝরল ১১ প্রাণ

১১ মে ১৯৭১: আর্তমানবতার পক্ষে কেনেডির গর্জন ও বিশ্ববিবেকের জাগরণ

মঙ্গল শোভাযাত্রা—বিশ্বমঞ্চে বাঙালির অসাম্প্রদায়িকতার জয়গান

১০

বুননশৈলীর মহাকাব্য—ঐতিহ্যবাহী জামদানি

১১

পদ্মা সেতু: বাংলাদেশের সক্ষমতা ও গৌরবের মহাকাব্য

১২

অবশেষে হামে ধরা খেলেন সওদাগর!

১৩

৩৬০ প্রাণের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল মেঘনা-ফুলদী তীর

১৪

মার্কিন-বাংলাদেশ বাণিজ্যচুক্তি: শর্তের বেড়াজালে সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় স্বার্থের সংকট

১৫

৯ মে ১৯৭১: আন্তর্জাতিক নিষ্ক্রিয়তায় ক্ষোভ ও পাক-হানাদারের নির্মমতা

১৬

সবাই তো এখন মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান!

১৭

ইউনূস সরকারের করা বাণিজ্য চুক্তির আদ্যোপান্ত, পড়ুন পুরো চুক্তিটি

১৮

সবার আগে দেশ, তার আগে আমেরিকা

১৯

বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তির বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টে রিট

২০