

১৯৭১ সালের ১ মার্চ ছিল বাঙালির দীর্ঘ স্বাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে এক চূড়ান্ত সন্ধিক্ষণ। এদিনই পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক জান্তা প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান এক আকস্মিক ও হঠকারী ঘোষণায় ৩ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠেয় জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেন। এই ঘোষণা ছিল মূলত ১৯৭০-এর নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া দল আওয়ামী লীগ এবং বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার এক গভীর নীল নকশা।
স্থগিতের নেপথ্যে জুলফিকার আলী ভুট্টোর আস্ফালন
ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি থেকেই পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো অধিবেশনে যোগ না দেওয়ার হুমকি দিয়ে আসছিলেন। ১৫ ফেব্রুয়ারি তিনি ঘোষণা করেন, “আওয়ামী লীগ যদি তাদের ৬ দফার ব্যাপারে আপস না করে, তবে আমরা অধিবেশনে বসব না।” ১৯ ফেব্রুয়ারি ইয়াহিয়া ও ভুট্টোর গোপন বৈঠকের পরই মূলত অধিবেশন স্থগিতের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়। ৩ মার্চ অধিবেশনের তারিখ নির্ধারিত থাকলেও ভুট্টো সাফ জানিয়ে দেন, শেখ মুজিব শর্ত না মানলে তিনি ও তার দল অধিবেশনে যোগ দেবেন না।
১ মার্চের সেই কালো দুপুর ও বেতার ভাষণ
দুপুর ১টা ৫ মিনিটে পাকিস্তানের রেডিওতে আকস্মিক এক ঘোষণার মাধ্যমে ইয়াহিয়া খান অধিবেশন স্থগিতের ঘোষণা দেন। ভাষণে তিনি দাবি করেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতার অভাব এবং ভারতের সৃষ্ট উত্তেজনাকর পরিস্থিতির কারণে তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মূলত ভুট্টোর জেদ এবং সেনাবাহিনীর ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখার ইচ্ছাকেই ইয়াহিয়া ‘যুক্তি’ হিসেবে দাঁড় করান।
মুহূর্তেই থমকে যায় জনজীবন: রাজপথে জনস্রোত
বেতারে স্থগিতের ঘোষণা প্রচারের সাথে সাথে ঢাকার রাজপথ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে।
ক্রিকেট মাঠে বিদ্রোহ: ঢাকা স্টেডিয়ামে (বর্তমান বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম) তখন আন্তর্জাতিক একাদশ বনাম বিসিসিপির মধ্যকার ক্রিকেট ম্যাচ চলছিল। ঘোষণা শোনার সাথে সাথে দর্শকরা খেলা বন্ধ করে মাঠ থেকে বেরিয়ে রাজপথে নেমে আসেন।
অচল ঢাকা: মুহূর্তের মধ্যে সব দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। সরকারি ও বেসরকারি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কাজ ফেলে মিছিলে যোগ দেন। ঢাকা পরিণত হয় এক মিছিলের নগরীতে। বন্ধ হয়ে যায় আকাশপথের যোগাযোগও।
হোটেল পূর্বাণী ও বঙ্গবন্ধুর বজ্রকণ্ঠ
সেদিন মতিঝিলের হোটেল পূর্বাণীতে চলছিল আওয়ামী লীগের পার্লামেন্টারি পার্টির বৈঠক। সেখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৬ দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্রের খসড়া তৈরি করছিলেন। বাইরে তখন হাজার হাজার ছাত্র-জনতার স্লোগান— “বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো।”
বৈঠক শেষে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু কঠোর ভাষায় এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানান। তিনি বলেন, “শুধু একটি সংখ্যালঘু দলের (পিপিপি) ইচ্ছার কাছে নতি স্বীকার করে অধিবেশন স্থগিত করা হয়েছে, যা গণতান্ত্রিক রীতির চরম লঙ্ঘন। বাংলার মানুষ এই স্বৈরাচারী সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করেছে।”
আন্দোলনের কর্মসূচি: হরতাল ও ৭ মার্চের ঘোষণা
বঙ্গবন্ধু তাৎক্ষণিকভাবে ২ মার্চ ঢাকায় এবং ৩ মার্চ সারা দেশে দুপুর ২টা পর্যন্ত হরতাল পালনের ডাক দেন। একই সাথে তিনি ঘোষণা করেন, পরবর্তী চূড়ান্ত কর্মসূচি জানানোর জন্য ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে এক বিশাল জনসভা অনুষ্ঠিত হবে। সেই রাতেই তিনি মওলানা ভাসানীসহ অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাদের সাথে আলোচনার উদ্যোগ নেন।
সামরিক জান্তার কঠোর অবস্থান ও নিষেধাজ্ঞার খড়গ
একদিকে বাঙালির স্বাধীনতার স্পৃহা, অন্যদিকে পাকিস্তানি সামরিক শক্তির কঠোর দমননীতি। ১ মার্চ রাতেই লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাহেবজাদা এম এম ইয়াকুব খানকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। গভীর রাতে ১১০ নম্বর সামরিক আইন জারির মাধ্যমে সংবাদপত্রের ওপর কঠোর সেন্সরশিপ আরোপ করা হয়। ঘোষণা করা হয় যে, পাকিস্তানের সংহতি পরিপন্থী কোনো সংবাদ বা ছবি প্রকাশ করলে অপরাধীকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হবে।
১ মার্চের এই ঘটনাপ্রবাহই মূলত প্রমাণ করে দিয়েছিল যে, আলোচনার মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ পাকিস্তানিরা বন্ধ করে দিয়েছে। এই স্থগিতাদেশই ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক অভিযাত্রার শুরু। বাঙালির পিঠ দেয়ালে ঠেকে গিয়েছিল, যার চূড়ান্ত প্রতিফলন ঘটেছিল ৭ মার্চের সেই ঐতিহাসিক ভাষণে এবং পরবর্তীতে ৯ মাসের সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে।
তথ্যসূত্র
দৈনিক ইত্তেফাক (২ মার্চ ১৯৭১)
দৈনিক অমৃতবাজার পত্রিকা (২ মার্চ ১৯৭১)
দ্য পিপল (২ মার্চ ১৯৭১)
সিদ্দিক সালিকের ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’
মন্তব্য করুন