ঢাকা মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ ২০২৬, ১৭ চৈত্র ১৪৩৩
মুক্ত মনমুক্ত চিন্তামুক্তি গাথা

একাত্তরে চিত্র প্রদর্শনী: রং-তুলিতে রণসজ্জা

শিশির কুমার নাথ
প্রকাশ : ০৪ মে ২০২৫, ০৭:৫১ পিএম
গণহত্যা, শিল্পী: প্রাণেশ মণ্ডল

কালি-কলম, তেলরঙ, জলরঙ ও মিশ্র মাধ্যমে আঁকা এসব ছবি যেন পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা ও নির্যাতনের অগ্নিসাক্ষী। কিছু ছবি দৃষ্টিগত ভাবে বিভৎস হলেও সেগুলোয় সত্য ও বাস্তবতাই উপজীব্য। তৎকালীন পত্রপত্রিকায় যে বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলোই বাংলাদেশের শিল্পীরা তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে নিজস্বতা বজায় রেখে রঙ ও রেখায় বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেছিলেন।

১৯৭১

১৯৭১, অনিবার্য রক্তস্নানে ডাক পড়েছিল এ দেশের শিল্পীসমাজের। দেশের নানা জায়গায় শিল্পীরা আক্রান্ত হন, অনেক শিল্পী উদ্বাস্তুতে পরিণত হন। দেশ ছেড়ে পাড়ি জমান কলকাতায়। একে একে সেখানে শিল্পীদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। প্রত্যেকেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করার জন্য ছিলেন দারুণভাবে আগ্রহী। দুঃসহ দহনকালে চিত্রশিল্পীরা হয়ে ওঠেন চিত্রযোদ্ধা। এ সময় কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকায় একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়, বাংলাদেশ থেকে আসা শিল্পীরা যেন কলকাতা আর্ট কলেজের অধ্যক্ষ চিন্তামণি করের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বাংলাদেশে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বর অত্যাচার ও গণহত্যার চিত্র বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরা এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গড়ে তোলার জন্য চিন্তামণি কর ও কামরুল হাসানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের শিল্পীদের আঁকা ছবি নিয়ে একটি প্রদর্শনী আয়োজনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। কলকাতার বাংলাদেশ সহায়ক শিল্পী-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবী সমিতি ও বিভিন্ন শিল্পী সংস্থা উদ্যোক্তা হিসেবে এগিয়ে এলেন। কলকাতা আর্ট কলেজের ক্যান্টিন ও উদ্যোক্তাদের বাসায় শিল্পীদের থাকার ব্যবস্থা করা হলো। শিল্পীদের আঁকার কাজে আর্থিক সহযোগিতা নিয়ে এগিয়ে এসেছিল বিড়লা একাডেমি অব আর্ট অ্যান্ড কালচার, মেসার্স জিসি লাহা প্রাইভেট লিমিটেড, ক্যামলিন প্রাইভেট লিমিটেড, আদভানি প্রাইভেট লিমিটেড, কোরেস প্রাইভেট লিমিটেড ও প্যাপিরাস প্রাইভেট লিমিটেড। প্রথমে কলকাতায়, পরে দিল্লি ও মুম্বাইয়ে এ প্রদর্শনী আয়োজন করা হয়েছিল। কলকাতায় প্রদর্শনীটি বিড়লা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত হয়। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে শুরু হয়ে ১৩ তারিখ পর‌্যন্ত চলে প্রদর্শনীটি। খোলা থাকত সোমবার ছাড়া প্রতিদিন বেলা ৩টা থেকে রাত ৮টা পর‌্যন্ত। প্রদর্শনীর একজন অন্যতম শিল্পী ছিলেন বীরেন সোম। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের তথ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও প্রচার শাখায় নকশাবিদের দায়িত্ব ছিল তার। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে শিল্পীসমাজ গ্রন্থটি তার স্মৃতিচারণমূলক আত্মকথন। গ্রন্থটির সহায়তায় ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের শিল্পীদের আঁকা নিয়ে এ প্রদর্শনী সম্পর্কে জানা যায় সবিস্তারে।

নাইটমেয়ার, শিল্পী: বীরেন সোম

ঐতিহাসিক এ প্রদর্শনীতে ১৭ জন শিল্পীর অংশগ্রহণের কথা থাকলেও প্রদর্শিত হয় ১৬ জনের ৬৬টি চিত্রকর্ম। ক্যাটালগে শিল্পী আবুল বারক আলভীর নাম থাকলেও শেষ পর‌্যন্ত তিনি অংশ নিতে পারেননি। কেননা প্রদর্শনীর আগে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে তিনি ধরা পড়েন এবং নির্মম নির্যাতনের শিকার হন। তবে লোক মারফত তিনি তার আঁকা ছবি পাঠিয়েছিলেন কলকাতা আর্ট কলেজের অধ্যক্ষ চিন্তামণি করের কাছে, কিন্তু তা প্রদর্শনীতে ছিল না। পরবর্তী সময়ে তার আঁকা ছবিগুলো সংগ্রহ করে রাখা হয়।

প্রদর্শনীতে গণহত্যা, নির্যাতন ও বিপুল ধ্বংসযজ্ঞের স্বাক্ষর ফুটে উঠেছিল যাদের রং-তুলিতে তারা হলেন শিল্পী কামরুল হাসান, মুস্তাফা মনোয়ার, দেবদাস চক্রবর্তী, নিতুন কুন্ডু, প্রাণেশ মণ্ডল, নাসির বিশ্বাস, বীরেন সোম, রণজিত নিয়োগী, গোলাম মোহাম্মদ, স্বপন চৌধুরী, কাজী গিয়াসউদ্দিন, চন্দ্রশেখর দে, হাসি চক্রবর্তী, বিজয় সেন, বরুণ মজুমদারসহ ১৭ জন চিত্রশিল্পী। কালি-কলম, তেলরঙ, জলরঙ ও মিশ্র মাধ্যমে আঁকা এসব ছবি যেন পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা ও নির্যাতনের অগ্নিসাক্ষী। কিছু ছবি দৃষ্টিগত ভাবে বিভৎস হলেও সেগুলোয় সত্য ও বাস্তবতাই উপজীব্য। তৎকালীন পত্রপত্রিকায় যে বিবরণ প্রকাশিত হয়েছে, সেগুলোই বাংলাদেশের শিল্পীরা তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে নিজস্বতা বজায় রেখে রঙ ও রেখায় বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেছিলেন।

প্রদর্শনীতে শিল্পী কামরুল হাসানের ভূমিকা ছিল অগ্রণী। কম্পোজিশন, বাংলাদেশ বিফোর জেনোসাইড, বাংলাদেশ আফটার জেনোসাইড, গণহত্যা এবং ফুল মুন অব এপ্রিল শিরোনামে তার পাঁচটি কাজ ছিল। কম্পোজিশন-এর মধ্য দিয়ে কামরুল হাসান ফুটিয়ে তুলেছেন পাকিস্তানি বাহিনীর ব্যাপক গণহত্যা ও তাণ্ডবলীলা। বাংলাদেশ বিফোর জেনোসাইড শিরোনামের ছবিটি বাংলার প্রাচীন লোকজ পুতুলের ফর্মে আঁকা। বাংলার নারীর শাশ্বত চিরকল্যাণময়ী রূপটি সুনিপুণ ভাবে ফুটে উঠেছে ফুল মুন অব এপ্রিল শিরোনামের ছবিতে। মূর্ত ঘরানার বলিষ্ঠ শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের আটটি কাজ ছিল প্রদর্শনীতে। বর্বর পাকিস্তানি বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ ও ধ্বংসলীলার বাস্তব চিত্র প্রকাশ পেয়েছে তার কাজের মধ্যমে। এ প্রসঙ্গে তার উইম্যান অ্যান্ড বিস্ট, বাংলাদেশ (১'২) উল্লেখযোগ্য। বিমূর্ত ঘরানার শিল্পী দেবদাস চক্রবর্তীর দুটি কাজ ছিল প্রদর্শনীতে। একটি হিউম্যানিটি ক্রুসিফায়েড, অপরটি লিবারেশন আর্মি। পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম বীভৎসতায় মেতে ওঠার চিত্র দেখানো হয়েছে হিউম্যানিটি ক্রুসিফায়েড ছবিতে। কিছু নর-নারীকে নির্যাতন ও হত্যা করে মৃতদেহ গাছের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখার দৃশ্য শিল্পী এঁকেছেন তেলরঙে। শিল্পী নিতুন কুন্ডু আধা বিমূর্ত ধারায় রঙ ও টেক্সচারের প্রাধান্য দিয়ে দ্বিমাত্রিক প্রকাশশৈলীতে এঁকেছেন বাংলাদেশ ৭১ক্রাই ফর হেল্প। গণহত্যা ও নির্যাতনের চিত্র সচেতনভাবে ফুটে উঠেছে প্রাণেশ মণ্ডলের চারটি ছবিতে। বলিষ্ঠ রঙ ও রেখার মাধ্যমে গণহত্যার বর্বরতাকে প্রকাশ করেছেন তিনি। নির্মমতাকে দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছিল নাসির বিশ্বাসের একটি ছবি রেপ। ছবিতে মা হাঁটু গেড়ে বসে তার ধর্ষিত কিশোরীকন্যাকে নিয়ে ক্রন্দন করছেন। দূরে পলায়নপর পাকিস্তানি দুজন সেনাকে দেখা যাচ্ছে। শিল্পী বীরেন সোমের চারটি ছবি ছিল প্রদর্শনীতে। নাইটমেয়ার ছবিটি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ছবিতে একটি ঘোড়ার মুখ ওপরের দিকে ওঠানো, সে যেন চিৎকার করে গণহত্যার প্রতিবাদ জানাচ্ছে। বিশ্ববাসীকে বলছে, এ গণহত্যা বন্ধ করো। নিপিড়ীত মানুষের তীব্র ক্রন্দন ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত করে তুলতে চেয়েছেন ক্রাই ছবিতে। অন্যদিকে স্কেচ দুটিতে ধারণ করতে চেয়েছেন প্রতিবাদী মানুষের আগুনঝরা অভিব্যক্তি। অন্যদের চেয়ে খানিকটা ব্যতিক্রম ছিল স্বপন চৌধুরীর ছবি। পরিণত কম্পোজিশন, মুষ্টিবদ্ধ হাত, ফুল-পাতা, পশু-পাখি, মানুষের মুখ ইত্যাদি ব্যবহার করে রঙ, রেখা ও ড্রয়িংয়ের মাধ্যমে তিনি তার কাজে ভিন্নমাত্রা যোগ করেছিলেন। চন্দ্রশেখর দের চারটি কাজই ছিল পরিণত। ক্রেজি বার্ড দর্শকমনে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। নীলাভ মিষ্টি রঙে আঁকা দুটি পাখির মাধ্যমে শিল্পী বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের বৈষম্য বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। অন্যান্য শিল্পীর মধ্যে রণজিত নিয়োগীর দ্য রাইজিং সান ইজ আওয়ার্স, হাসি চক্রবর্তীর বাংলাদেশ ১,৫, বিজয় সেনের জেনোসাইড, কাজী গিয়াসউদ্দিনের ইভা কুইস ১,৩, গোলাম মুহাম্মদের সান অব লিবারেটেড, বরুণ মজুমদারের বাংলাদেশ এবং অঞ্জন বণিকের বাংলাদেশ ব্লিডিং উল্লেখযোগ্য।

গণহত্যা, শিল্পী: প্রাণেশ মণ্ডল

বাংলাদেশের অগ্নিগর্ভ সময়ে শিল্পীদের আঁকা এ ছবিগুলো জনমনে সাড়া ফেলেছিল। বিপুলসংখ্যক দর্শকের সমাগম হয়েছিল প্রদর্শনীতে। প্রাজ্ঞ ও প্রতিভাবান শিল্পীদের পাশাপাশি নবীন শিল্পীদেরও অংশগ্রহণ ছিল। বিক্ষুব্ধ ও বিস্ফোরিত বাংলাদেশের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার আশ্চর‌্য প্রতিফলন ঘটেছিল চিত্রভাষায়। হাতে রং-তুলি আর বুকে ইস্পাতকঠিন প্রত্যয়। ঐকান্তিক দেশপ্রেমে নিজেদের যুক্ত করেছিলেন এ দেশের শিল্পীসমাজ। দহনকালের কালিকে আঁকা এ ছবিগুলো ইতিহাসের নির্মম সত্যটিকে উন্মোচন করে।

বীরেন সোমের বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে শিল্পীসমাজ (২০১৫) গ্রন্থ অবলম্বনে

অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

৩০ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন ও বিশ্ববিবেকের জাগরণ

ইতিহাসের অবিনশ্বর নক্ষত্র: শহীদ শাফী ইমাম রুমী

২৯ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন ও আত্মাহুতির এক নৃশংস অধ্যায়

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা,আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশ

২৮ মার্চ ১৯৭১: ধ্বংসযজ্ঞের ছাপ আর বাঙালির সুসংগঠিত প্রতিরোধ

২৭ মার্চ ১৯৭১: বিশ্ব জানল, বাংলাদেশ স্বাধীন

২৬ মার্চ ১৯৭১: একটি জাতির রক্তক্ষয়ী সূর্যোদয় ও স্বাধীনতার ঘোষণা

গণহত্যার বিরুদ্ধে শৈল্পিক প্রতিবাদ / ২৫শে মার্চের কালরাত্রি স্মরণে প্রাচ্যনাটের ‘লালযাত্রা’

২৫ মার্চ, ১৯৭১: ইতিহাসের কলঙ্কিত কালরাত ও বিভীষিকাময় গণহত্যা

২৪ মার্চ ১৯৭১: প্রতিরোধের আগুন আর চূড়ান্ত প্রস্তুতির দিন

১০

২৫ মার্চের গণহত্যা স্মরণে ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দাবিতে ‘আলোর মিছিল’

১১

২৫ মার্চ ১৯৭১: গণহত্যার কালরাত্রি ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির লড়াই

১২

জামায়াতকে বিচারের আওতায় আনার দাবি / একাত্তরের গণহত্যা স্বীকৃতির প্রস্তাব মার্কিন কংগ্রেসে

১৩

২৩ মার্চ ১৯৭১: যেদিন পাকিস্তান দিবস হলো প্রতিরোধের নামে

১৪

২২ মার্চ ১৯৭১: আপসহীন সংগ্রামের ঘোষণা এবং ইয়াহিয়ার নতুন চাল

১৫

২১ মার্চ ১৯৭১: নীতির প্রশ্নে আপসহীন বঙ্গবন্ধু এবং ঘনীভূত সামরিক মেঘ

১৬

২০ মার্চ ১৯৭১: টেবিলে আশার আলো, অন্তরালে গণহত্যার নীল নকশা

১৭

১৯ মার্চ ১৯৭১: সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের প্রথম স্ফুলিঙ্গ ও বীরত্বগাঁথা

১৮

১৮ মার্চ ১৯৭১: জান্তার তদন্ত কমিটি প্রত্যাখ্যান ও বঙ্গবন্ধুর ডাক

১৯

১৭ মার্চ ১৯৭১: ‘নরকে বসেও হাসতে পারি’, বঙ্গবন্ধুর বজ্রশপথ

২০